ভারতের সাথে প্রতিবেশী সম্পর্ক

ভারতের সাথে প্রতিবেশী সম্পর্ক: আমরা কেন ইন্ডিয়াকে ঘৃণা করি?-দুরর্ম

Spread the love

ভারতের সাথে প্রতিবেশী সম্পর্ক: আমরা কেন ইন্ডিয়াকে ঘৃণা করি? এই প্রশ্নের এক কথায় উত্তর করা যায়- যেহেতু আমরা পাকিস্তানকে ভালোবাসি তাই ইন্ডিয়াকে ঘৃণা করি। এই দুটি দেশকে একই সঙ্গে ভালোবাসা এবং ঘৃণা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ডানপন্থিরা ভারত বিরোধীতাকে সাম্প্রদায়িক চেহারা দিতে সব সময়ই তৎপর তাই প্রগতিশীলরা ভারত বিরোধীতা বলতে গেলে করার সুযোগই পান না। অর্থ্যাৎ আমাদের দেশে ভারত বিরোধীতা করার ধর্মনিরপেক্ষ বহু কারণ থাকার পরও কখনই সেটা সে অর্থে ঘটেনি।

ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে লং মার্চ ৭৫ পরবর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিলো দেশে পাকিস্তানের ফেলে আসা দ্বিজাতিতত্ত্বকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের ভারত বিরোধীতা বইয়েছে ‘হিন্দু বিরোধীতায়’। বাংলাদেশের ইসলামিক সেপআপকে জিইয়ে রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব লাগবেই। আর সেটা সবচেয়ে বেশি কার্যকর ‘ভারতের ষড়যন্ত্র’ ফর্মূলা। 

 

উপমহাদেশের ইসলামি আন্দোলনের নিজস্বতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এখানে ইহুদীফোবিয়ার কোন কার্যকারিতার বাস্তবতা নেই। এখানে ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদীদের পরিবর্তে প্রতিনিয়ত হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে চলেছে। মুসলমানরা যাতে ঈমান হারিয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে থাকে তার জন্য হিন্দুদের হাজার রকম জাল পাতা আছে। যেমন হিন্দি সিনেমা, ভারতীয় টিভি, হিন্দু সংস্কৃতি ইত্যাদি। এমনকি হিন্দুয়ানী সাহিত্য মুসলমানদের নিজস্বতা ধ্বংসের জন্য চ্যাটার্জি মুখার্জিরা গভীর ষড়যন্ত্র করে চলেছে। পাকিস্তানের ২৩ বছর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এভাবেই ইন্ডিয়াকে ভয় ঘৃণা অভিশাপ দিয়ে এসেছে। এই পর্বটি ছাড়া কি করে ঐতিহাসিক ভারত বিরোধীতার ব্যাখ্যা পূর্ণ হবে?

দেশভাগের মূল সুরই ছিলো হিন্দুদের জন্য মুসলমানরা পিছিয়ে আছে। তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য চাই আলাদা দেশ। যে দেশে মুসলিমদের হাতে অর্থনীতি রাজনীতি সমাজনীতি থাকবে। দেশভাগ সত্যিকার অর্থে কাগজে কলমে দ্বিজাতিতত্ত্ব মেনে অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু পূর্ববঙ্গে হিন্দুরা থেকে গেলে মুসলমানদের হাতে অর্থনীতি রাজনীতি সমাজনীতি কি করে প্রতিষ্ঠিত হবে?

 

তাই দাঙ্গার প্রয়োজন পড়েছিলো। সাধারণ মানুষকে ভয় পাইয়ে দিতে হবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এভাবেই। এরকমভাবে যখন একটা ‘জাতিসত্ত্বা’ প্রতিষ্ঠা হয় ‘পাকিস্তানী’ নামে তারা কি করে ভারতকে বস্তুনিষ্ঠভাবে গ্রহণ করবে? তার মানে আমাদের সেরকম কোন সুস্থ চর্চাই ছিলো না মানতে হচ্ছে।

তাহলে ভারতের বিরোধীতার কি কোনই যৌক্তিক কারণ নেই? একশো বার আছে! এমন কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্র আছে যাদের মধ্যে সমস্যা নেই? সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর জল বন্টনের মত বিষয়গুলো বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। দুটি রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদরা কি করেন সেই প্রশ্ন না করে সাধারণ জনগণের একই ব্যাপারে ভিন্ন প্রতিক্রিয়াই তুলে ধরা উচিত এই আলোচনায়।

 

ভারতের বিএসএফের গুলিতে খালি বাংলাদেশীরাই মরছে কেন, বাংলাদেশের বিজিবি’র গুলিতে দুই একজন ভারতীয় মরে না কেন? কেন বাংলাদেশীরা ভারতীয় বর্ডার টপকাতে যায় প্রতিনিয়ত যেখানে বিএসএফ গুলি করে মারে? সীমান্তে গরু চোরাকারবারীদের কেন বাংলাদেশের বিজিবি প্রশ্রয় দেয় সেই প্রশ্ন নিশ্চয় উঠে আসে। না হলে যখনই পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পক্ষ থেকে কেন শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারে না?

কিন্তু এগুলোর একটিও সীমান্তে একজন মানুষের মৃত্যুর পক্ষে যুক্তি হতে পারে না। ভারতের সঙ্গে আমাদের সমস্যা আছে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় কেন আমরা ভারতকে ঘৃণা করি? সেগুলো কি এসব ঘটনার কারণে? যদি নিখাদ দেশপ্রেমের জায়গা থেকে প্রতিক্রিয়াগুলো উঠে আসে, কোন রকম সাম্প্রদায়িক জায়গা থেকে নয়, তাহলে প্রশ্ন উঠে সৌদি আরব সরকারীভাবে আমাদের মেয়েদের গৃহকর্মী হিসেবে নিয়ে গিয়ে তাদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করানোর মত কাজ করিয়েও এদেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া সমান হয় না কেন? যে লোকটা ফালানী হত্যার জন্য শোকাহত সে কেন সৌদি ফেরত মৃত মেয়েদের জন্য সৌদি আরবকে ঘৃণা করে না?

 

অর্থ্যাৎ সৌদি আরব ভারত কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের অনেক সমস্যা আছে কিন্তু ভারতেরটাই সবচেয়ে বেশি আগ্রহ জাগে! চীনের সঙ্গে একবার বাংলাদেশ ছোট বড় ১০৮টি চুক্তি করল অথচ কেউ প্রশ্ন তুলল না এর মধ্যে কয়টা গোলামী চুক্তি ছিলো? চায়না পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে গেলেও কেউ চীনের বাজার হওয়ার জন্য আক্ষেপ করে না। এখন কেউ বলতে পারেন, চীন তো মুসলমান না. তাদের সঙ্গে বাংলাদেশীদের এই প্রেমের কারণ কি?

এরকম প্রশ্ন যদিও হাস্যকর কিন্তু একজন নবীনের উপমহাদেশের একশ বছরের ইতিহাস সম্পর্কে কোন ধারণা নাও থাকতে পারে। চীন যে এই অঞ্চলে দ্বিজাতিতত্বের আইসিইউ সেটা জানা থাকা দরকার। তাই কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা উঠিয়ে নিলে ইমরান খান হৈ চৈ করে উঠলেও চীনের উইঘুর মুসলমানদের সম্পর্কে তিনি নাকি কিছুই জানেন না! বাংলাদেশের ডানপন্থি রাজনীতিকে কি কখনোই দেখা গেছে চীনের বিরুদ্ধে কথা বলতে? 

 

বাংলাদেশ না হয় মুসলিম বলে ভারতের বিপক্ষে কিন্তু নেপাল তো ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ তারা কেন ভারতের বিরুদ্ধে? শ্রীলংকা কেন ভারতের বিরুদ্ধে? তারা তো আর মুসলমান না? এটা ভালো প্রশ্ন। শুরুতেই কবুল করা উচিত ভারত তার কোন প্রতিবেশির সঙ্গেই ভালো আচরণ করেনি। যতটুকু দেয়া উচিত ছিলো দেয়নি। কিন্তু নেপালের একটি গ্রাম ৬০ বছর ধরে চীন দখল করে রাখার পরও কেন নেপাল সেটা নিয়ে কথা না বলে হঠাৎ ভারতের কালাপানি দাবী করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে?

কারণ কমিউনিস্ট চীন হচ্ছে সুদি মহাজান। তার ঋণ একবার কেউ নিলে আজীবনের গোলামী মেনে নিতে হয়। শ্রীলংকাকে প্রায় গিলে খেয়েছে তাদের সি পোর্টগুলি দখল নিয়ে। চীন এখানে ভারত বিরোধী একটা শক্তিশালী বলয় তৈরি করবে। এতে দু পক্ষের একটি লাভ এগিয়ে এসে অঘোষিত সমঝোতা হয়েছে। চীনের দরকার ভারতকে পরাজিত করা আর ইসলামিক রাজনীতির দরকার শক্তিশালী ভারত বিরোধীতার দৃশ্যমানতা।

 

আমাদের ফিলিস্তিনি দরদ যেমন ধর্মনিরপেক্ষ নয় তেমন করে ভারত বিরোধীতাও ধর্মনিরপেক্ষ নয়। এটাই লেখার মূল সুর। এবং সাম্প্রদায়িক আবহে এই বিরোধীতা এই অঞ্চলের সেক্যুলার ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করবে বলেই মনে করি। আবারো বলছি ভারতের বিরোধীতা করা যাবে না এমন কথা আমি বলছি না। আমি বলছি এমন বহু দোষ অন্যদের মধ্যে থাকার পরও আমাদের প্রতিক্রিয়া নিরপেক্ষ নয়।

 

লেখক-অরুন্ধতী রায়,ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের লুঙ্গি খুলে দিয়েছিলো।

আইএস জিহাদীরা কি সুরা নিসার ২৪ নং আয়াত বাস্তবায়ন করেছে?

‘হিন্দু’ নোবেল পেয়েছে এরকম লিস্ট করা হলে আমরা এই বঙ্গবাসীরাই নির্ঘাৎ তাকে সাম্প্রদায়িক বলব।

আরো একবার প্রমাণ হলো বাংলার নিজস্ব্ যা তার সবই ‘হিন্দুয়ানী’!