“দাদু, এইখানে একটু সই করে দাওতো”-

কলেজপড়ুয়া আকাশ ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে তার ঠাকুরদা, রুদ্রকান্ত চক্রবর্তীর উদ্দেশ্যে কথাগুলো ছুঁড়ে দিলো।

“কীসের সই রে?” হাতের খবরের কাগজখানি সরিয়ে রেখে প্রশ্ন করলেন রুদ্রকান্ত বাবু।

“ফ্যাসিস্ট সাম্প্রদায়িক সরকার সাতজন রোহিঙ্গাকে মায়ানমারে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। তার বিরুদ্ধে আমরা গণ স্বাক্ষর কর্মসূচী অভিযান শুরু করেছি। তাই তোমারও সই চাই। এইখানে সই করো আর তার তলায় আজকের তারিখটা লিখে দাও, দশই অক্টোবর ,২০১৮”

“কত তারিখ বললি?”

“দশই অক্টোবর…..”

রোহিঙ্গাদের কথা শুনেই যে অস্বস্তিটা মাথা চাড়া দিচ্ছিলো, আজকেই তারিখ শুনেই তা দ্বিগুণ হয়ে গেল। সেইসঙ্গে স্মৃতির দরজা হাট করে খুলে গেলো। 

সেদিনও ছিল দশই অক্টোবর,১৯৪৬। লক্ষ্মীপূজো, তাদের আদিনিবাস, সাতপুরুষের ভিটে, বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালি জেলার মতিয়াপাড়া…

“তুমি আমাদের বাঁচাও আব্দুল”…

পাশের বাড়ির আব্দুল চাচা, ছোটবেলা থেকে যে কিনা তাদের বাড়িতে খেজুরের রস বিক্রি করতে আসতো, তার পায়ের কাছে পড়েছিলেন রাজেন চক্রবর্তী, দশ বছর বয়সী রুদ্রকান্তর বাবা।

“….তুমি আমাদের বাঁচাও আব্দুল, নইলে ওরা আমাকে ,তোমার বৌদি আর ভাইপোকে মেরে ফেলবে। “

পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন রুদ্রকান্তের মা, সূর্যমুখী। ঘটনার অভিঘাত কিছুই না বুঝে ফ্যালফ্যাল করে একবার বাবার দিকে একবার আব্দুল চাচার দিকে চেয়েছিল দশ বছরের ক্ষুদে রুদ্রকান্ত। তখনও সে জানে না, তার আদরের ছোটকাকা , সুদর্শন চক্রবর্তী একটু আগেই জল্লাদদের হাতে খুন হয়ে গ্যাছেন।জল্লাদদের দলের বেশিরভাগ মুখই পরিচিত, সুদর্শনের ছোটবেলার খেলার সাথী। আলাদা করে কে হিন্দু কে মুসলিম কোনোদিনই ভাবেননি তারা। তাই যখন চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে ওরা যখন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ,তখনও সুদর্শন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এগুলো সত্যিই ঘটছে নাকি দুঃস্বপ্ন।

সুদর্শন বাঁচেননি, বাঁচেননি তার দাদা রাজেন ও।তার শত আকুলিবিকুলিতেও লাভ হয়নি।রাজেনের গলায় প্রথম কোপ মেরেছিল সেই আব্দুল ই, ছোটবেলা থেকেই যাকে রুদ্রকান্ত নিজের কাকার মতোই দেখেছিলেন। ছোট্ট রুদ্রকান্তের সামনেই তার বাবাকে কুপিয়ে মারতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি আব্দুল, যাকে সে আদর করে ছোটবাবু বলে ডাকতো। রক্তের ছিটে রুদ্রকান্তের পোশাকেও এসে লেগেছিল ..

জল্লাদদের হাত থেকে প্রায় অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়ে রুদ্রকান্ত আর তার মা সূর্যমুখী ঠাঁই পান উদ্বাস্তু ক্যাম্পে, পরে অনেকের সাথে পালিয়ে ভারতে চলে আসা, সেলাইয়ের কাজ করে সূর্যমুখীর একমাত্র ছেলেকে মানুষ করে তোলা, মেধাবী ছাত্র রুদ্রকান্তর প্রতিষ্ঠা লাভ, গঙ্গা পদ্মা দিয়ে অনেক জল বয়ে গ্যাছে….

কিন্তু আজও দশই  অক্টোবর দিনটা এলেই রুদ্রকান্ত অবচেতনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য। ছোটবেলার পরিচিত আব্দুল চাচার পা ধরে ভিক্ষা চাইছেন বাবা, পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন মা…

আজকের আকাশ, তার নাতি সেই ইতিহাস জানে না।বা জানতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু রুদ্রকান্ত কীভাবে তা ভুলে যেতে পারেন।

দশই অক্টোবর, ১৯৪৬, নোয়াখালি। বাঙালি হিন্দুর জেনোসাইড…

“কী হলো দাদু, সইটা করো।”

স্মৃতি থেকে বর্তমানে ফিরে এলেন রুদ্রকান্ত। সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ, তার নাতি। মুখে বিরক্তির ছাপ, খানিকটা অধৈর্য ।

“তাড়াতাড়ি সই করো। আমাদের একটা পথসভা আছে, গভর্নমেন্টের কমিউনাল এক্টিভিটির বিরুদ্ধে। আমাকে একটু বেরোতে হবে।”

জলের বোতল থেকে গ্লাসে খানিকটা জল ঢেলে ঢকঢক করে খেলেন আজকের ৮২ বছর বয়সী রুদ্রকান্ত। তারপরে মুখ মুছে আজকের কলেজপড়ুয়া নাতির দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বললেন,

“আমি সই করবো না। “

“মানে…?”

“মানে সেটাই যেটা তুমি শুনলে। আমি সই করবো না। তোমার ভালোর জন্যই আমি সই করতে পারবো না।”

স্মৃতি সততই সুখের নয়।

মানবতা জরুরি, কিন্তু একইসঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তাও জরুরি।

– Chayan Mukherjee