আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার

আফগানিস্তান: আমেরিকা চিরকাল আফগানদের পাহারা দিবে কেন?

Spread the love

আফগানিস্তান: আমেরিকা চিরকাল আফগানদের পাহারা দিবে কেন? আমেরিকা কি আফগানদের বিপদে ফেলে চলে গেছে? 8 ই মে আফগানিস্তানের একটি স্কুলের বাইরে বোমা বিস্ফোরণের পরেও মেয়েদের মনে কোনও ভয় নেই। তিনি স্কুল ছেড়ে যেতে চান না এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান।রাজধানী কাবুলের একটি বিদ্যালয়ের কাছে বোমা বিস্ফোরণে ফারজানা আসগরীর ১৫ বছরের ছোট বোন নিহত হয়েছেন। ফারজানা তার ছোট বোনের কবরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

উভয় বোন একই স্কুলে পড়াশোনা করত। সৈয়দ উল শাহাদা বিদ্যালয়ের কাছে বিস্ফোরণে ৮০ জন নিহত ও ১৬০জন আহত হয়েছিল। মেয়েদের স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিস্ফোরণ ঘটে। তবুও শিক্ষার্থী, পরিবার এবং শিক্ষক যারা থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের সাথে কথা বলেছিলেন তারা সকলেই শিক্ষার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেছেন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশে তালিবানদের শাসনামলে মেয়েদের স্কুলে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। ফারজানা তার তিন বোনকে নিয়ে একই স্কুলে পড়াশোনা করতেন,  স্কুলটি আবার চালু হলে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ সংকল্পবদ্ধদের মধ্যে তিনি ছিলেন। সে বলে, “আমি আবার যাব, অন্য কোনও আক্রমণ হলেও আমি যাব।” ১৮ বছর বয়সী ফারজানা বলেন, “আমি হতাশ হওয়ার কেউ নই। আমাদের জ্ঞান এবং শিক্ষা অর্জনে ভয় করা উচিত নয়।”

মেয়েরা শিক্ষার জন্য মরিয়া: ফারজানার বাবা মোহাম্মদ হুসেন (৫৩) বলেছেন তিনি ভয় পেয়েছেন তবে মেয়েদের ঘরে রাখবেন না। তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত কঠিন। “আমার সাত কন্যা রয়েছে এবং আমি প্রত্যেকেই শিক্ষিত করতে চাই,”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য অনেক পশ্চিমা দেশ আফগানিস্তানে বিদেশী সেনাবাহিনীর উপস্থিতির পরে মেয়েদের পড়াশুনাকে অন্যতম বড় সাফল্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে বিদেশি বাহিনী দেশ থেকে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার কারনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। বিদেশী সেনা প্রত্যাহারের কারণে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সাফল্য অর্জন হয়েছে তা হুমকির মুখে পড়েছে। 

সাধারণ আফগানদের চিন্তা

সাধারণ আফগানরা মার্কিন-ন্যাটো বাহিনীর ‘দখলদারী’ ‘পশ্চিমা পুতুল সরকারের’ শাসনে থাকতে চাইছিলো। বিশ বছর আগে তালেবান শাসনের অবসান হওয়ার পর ইউরোপ আমেরিকা ইরানসহ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হয়ে থাকা আফগান আধুনিক মননের মানুষরা আফগানিস্থানে ফিরে আসে। এই বিশ বছরে আফগানিস্থানের পথের ধারে কোন ক্যাফের সামনে দিয়ে যেতে যেতে গরম কফি আর গানের শব্দ ভেসে আসত শুনত পথচারীরা। গানের তালে তালে আড্ডা ও হাসির রোল উঠত রেস্টুরেন্টগুলিতে।

আফগানিস্থানের এই শিক্ষিত ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি এখন তালেবান উত্থানে ফের দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তারা বলছে তালেবান শাসিত আফগানিস্থান একটা জেলখানা! বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শাইমা রেজায়ী (২২) আরব নিউজকে বলেন, ‘তালেবানদের ফিরে আসার মানে হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সমাপ্তি।’ তালেবানদের হামলায় গত ১৫ দিনে ৬ হাজার পরিবার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।

মাহনুশ আমিরি নামের বিশ্ববিদ্যালয় আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যদি তালেবানরা আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তরুণ আফগানরা দেশ ছেড়ে চলে যাবে।’ ইরানে শরণার্থী থাকা মিনা রেজায়ী (৩২) আরব নিউজকে বলেন, ‘শরণার্থী জীবনের দুঃখ আমি বুঝি। যদি এ দেশ আমাদের জন্যে জেলখানা হয়ে যায়, তাহলে এখান থেকে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’

প্রশ্ন হলো, আমেরিকা কি আফগানদের বিপদে ফেলে চলে গেছে? বিশ বছর তো অনেক সময়। এই সময়কালের মধ্যে আফগানিস্থানে কেন সেক্যুলারিজমের একটি শক্তিশালী অবস্থান দেয়া গেলো না? আমেরিকা কি চিরকাল আফগানদের পাহারা দিবে কেন? কেন আফগান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারল না? কেন এই বিশ বছরে আফগানিস্থানে মাদ্রাসার সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হলো না? মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাই কেন উপড়ে ফেলা হলো না? গোটা আফগানিস্থানকে মাদ্রাসার ছাত্রদের হাতেই পতন ঘটেছিলো। তাহলে তালেবান পতনের পর কেন মাদ্রাসা শিক্ষাকে বহাল রাখা হয়েছিলো?
আসলে বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে জীবন ও শ্রেণীর সঙ্গে আফগানদের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। বাংলাদেশের ঢাকার রমনার বটমূলের বর্ষবরণ, ছায়ানট, উদিচি’র মত সংস্কৃতিক আন্দোলন যেমন ঢাকার অভিজাত ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ছাড়া দেশের বিশাল দরিদ্র অশিক্ষিত শ্রেণীর বাইরে রয়ে গেছে আফগান সমাজেও বিপুল বিশাল দরিদ্র অশিক্ষিত সমাজ এই ক্যাফেতে গরম রুটি কাবাব কফি ও রক গান শোনা আফগানদের থেকে আলাদা থেকে গেছে।
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের আগে আফগান শহুরে জীবনে একজন বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণীর পোশাক পরিচ্ছেদ ও তার স্বাধীন চলাফেরা দেখে আজকের আফগান সমাজের তুলনা করলে অবাস্তব কাল্পনিক বলে মনে হবে। শহুরে এই আফগানরা বাদে বড় একটা অংশ ছিলো ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় নেতাদের অধিনে। গ্রামাঞ্চলে একজন মাদ্রাসার সুপারই ছিলেন গ্রাম মোড়ল। দরিদ্র ও ধনীদের মধ্যে ছিলো বিশাল ফারাক।
দুরত্ব ছিলো চলাফেরায়। এক দেশে দুটি ভিন্ন জাতি যেন। ফলে আফগান সমাজে ধীরে ধীরে শিক্ষিত আধুনিক শ্রেণী দরিদ্র আফগানদের কাছে বিদেশীদের দালাল, চর ইত্যাদি হিসেবে গোণ্য হত। তালেবান উত্থান সম্ভব হয়েছিলো তাদের বিপুল জনসমর্থনের কারণে। সাধারণ দরিদ্র আফগানরাই ছিলো তাদের সমর্থক। মার্কিন-ন্যাটো শাসিত আফগানিস্থানে নারী ফুটবল দলের সদস্য ও তার পরিবারকে সাধারণ আফগানরাই একঘরে রেখেছিলো এবং শারীরিকভাবে হুমকি দিয়ে জীবননাশের শংকা তৈরি করেছিলো।
মেয়েদের ফুটবল মাঠে ঢুকে মারধোর করেছিলো সাধারণ গ্রামবাসীরাই। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বিভিন্ন মাদ্রাসার ‘বড় হুজুরের’ মাইকে একটি ঘোষণাতেই তান্ডব বয়ে যায়। অথচ ঢাকাতে নজরুল একাডেমি, বুলবুল একাডেমি, উদিচি, ছায়ানটে চান্স পাওয়াই কঠিন, এত ভীড় ভর্তি ফর্ম কিনতে, তখন আপনার কাছে হঠাত মনে হতে পারে এরকম সংস্কৃতিক পরিমন্ডল যে দেশে আছে সে দেশে তালেবান উত্থানের ভয় দেখানোটা সুষুপ্ত পাঠকের একটা প্রপাগন্ডা…!
বিশ বছরে আফগানরা তাদের দেশটাকে তালেবান উত্থানের বিরুদ্ধে তৈরি করতে পারেনি সেটা তাদের অযোগ্যতা। সেটি নিয়ে ভাবার চাইতে বাংলাদেশের ৮৭,১৯১টি গ্রামের কথাই চিন্তা করা উচিত। সেখানে বৈশাখী মেলার প্রশাসন থেকে বন্ধ করে দিয়ে ওয়াজের আসর বসানো হয়। সেখানে বাউলদের আসরে ১৪৪ ধারা জারি করে কিন্তু মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে তাফসিরুল কুরআন বহাল তবিয়তে চলে।
এই যে গ্রামীণ সংস্কৃতিটি তালেবানদের (তালেবান অর্থ মাদ্রাসার ছাত্র) হাতে লুন্ঠিত হতে দেয়া হলো, এর ফলে বিশ বছর পর উদিচি, ছায়ানটের শিক্ষার্থীরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শরণার্থী হয়ে আসে পাশের সেক্যুলার দেশে আশ্রয় নিলে আমি অন্তত অবাক হব না। কেননা আমার জীবনেই আমি দেখলাম এদেশে মুক্তচিন্তা ধর্মহীনতার কথা বলেই পাশ্ববর্তী ভারত নেপাল শ্রীলংকাতে শরণার্থী হলো নাস্তিকরা। তাই আমাদের কাছে বাংলাদেশের বিপদ যতখানি বাস্তব ততখানি হয়ত আপনার কাছে নয়। কিন্তু অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
লেখক-#সুষুপ্তপাঠক
#susuptopathok
আর পড়ুন…..