ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের আক্রমনকে শুধুমাত্র রাজ্য দখল ও সমৃদ্ধ সম্পদ হননই যদি একমাত্র উদ্দেশ্য হতো তাহলে মন্দিরের ধনদৌলত লুট করা পর্যন্তই সেটা সীমাবদ্ধ থাকার কথা, মন্দির ভেঙ্গে সেখানে মসজিদ নির্মাণ ভিন্ন অর্থই তৈরি করে। আজকাল কেউ কেউ ভারতবর্ষে হানাদার মুসলিম শাসকদের স্থানীয় রাজ্য দখল, লুন্ঠন, হত্যা আর তাদের দাসে পরিণত করাকে কেবলমাত্র রাজনৈতিকভাবে চিহিৃত করতে চেষ্টা করেন, দাবী করেন এর সঙ্গে ইসলামের রাজনৈতিক দিকটির কোন সম্পর্ক নেই। যদিও এরাই ভারতবর্ষে খুব বেশি মন্দির, মঠ ভাঙ্গার হয়নি বলে দাবী করেন।

এটি স্পষ্টতই ধর্মীয়ভাবে মুসলিম শাসকদের ডিফেন্স করার চেষ্টা। এ ক্ষেত্রে তারা ঐতিহাসিক ইটনকে সাক্ষি মানেন। কিন্তু আলীগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মোহাম্মদ হাবিব তার ‘ গজনির সুলতান মাহমুদ (১৯২৪) বইতে লিখেন, সুলতান মাহমুদ ঘোষণা করেছিলেন, সমস্ত মন্দিরগুলোকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ধ্বংস করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবো (সূত্র:http://indiafacts.org/hindu-temple-destructions-a-myth-richard-eaton/)। সুলতান মাহমুদ কোন বিচ্ছিন্ন মুসলিম শাসক ছিলেন না যিনি একাই এই কর্মগুলো করেছিলেন। বরং সমস্ত বহিরাগত মুসলিম শাসকদের হাতে একই কাজ সাধিত হয়েছিল তীব্র “কাফের” বিদ্বেষ থেকে। আগেই বলে নেই, মুসলিম শাসকদের বংশ পরম্পরায় রাজশক্তি ভারতে জেঁকে বসার কালে, যেসব মুসলিম শাসকদের জন্ম ভারতবর্ষে, তাদের কেউ কেউ উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসন করার উদাহরণ ছিল। তাদের রাজ দরবারে হিন্দুদের উচ্চপদে স্থান দেয়া হতো। একইভাবে হিন্দু রাজাদের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে মুসলিম সেনার স্থানেরও নজির রয়েছে। এগুলো হয়েছিল ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন থিতু হওয়ার কালে ব্যক্তি বিশেষের উদার নীতির কারণে। তাই বলে শুরুর ইতিহাস তো মিথ্যে হয়ে যাবে না। এই রচনার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুসলিম শাসকদের যে লুন্ঠন ও স্থানীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করার যে কায়িকশক্তি প্রদর্শন তার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক সম্পর্ক কতদূর তার সন্ধান করা।

সম্রাট আওরাঙ্গজেব হুকুম দিয়েছিলেন তার রাজ্যের সমস্ত মন্দিরকে ধ্বংস করতে হবে। রাজস্থানের জাদুঘরে সে ঘোষণা সম্বলিত পান্ডুলিপি রক্ষিত রয়েছে। আওরাঙ্গজেব এই রাষ্ট্রীয় আদেশ জারি করেন ৯ এপ্রিল ১৬৬৯ সালে। কুতুব মিনারের Quwwat-ul-Islam mosque- এর শিলালিপিতে বলা হয়েছে, আল্লারতালার সাহায্যে এই দূর্গ দখল করে মহামান্য সুলতান ৫৮৭ সালে এই মসজিদ নির্মান করেন ২৭টি মন্দিরের ধ্বংসাবাস থেকে। এমনকি বাংলাদেশে এক সময় জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল টিপু সুলতান যাকে অল্প বয়েসে আমরা দারুণ উপভোগ করতাম, সেই টিপু দক্ষিণ ভারতে এক হাজারের উপর মন্দির ধ্বংস করেছিলেন! বৃট্রিশ ঐতিহাসিকদের মতে টিপু আট হাজারের উপর মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। আমরা বৃট্রিশ ঐতিহাসিকদের কথা নাই বা বিশ্বাস করলাম, এক হাজারই বা কম কিসের!
Ibn Ferista যিনি ১৫৭০ থেকে ১৬১২ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদের সময়কালে ভারতবর্ষে অবস্থান করেছিলেন তিনি লিখেছেন, সুলতান মাহমুদ ৪০০০ বছর ধরে হিন্দুদের বিশ্বাস করা “জাগ্রত” দেবতার মন্দিরকে লুট করে চুরমার করে দিয়েছিলেন এই কারণে যে, তাদের দেবতা সেটা রক্ষা করতে আসে কিনা! এটি নবী ইব্রাহিম ও নবী মুহাম্মদের পৌত্তলিক ধর্মের প্রতি চ্যালেঞ্জ যা প্রতিটি বিশ্বাসী মুসলমান জন্মগতভাবে পরিবার থেকে পেয়ে থাকে। সুলতান মাহমুদ যে বিপুল পরিমাণ গণিমতের মাল পেয়েছিলেন খোদ আল্লার রসূল মুহাম্মদকে স্বয়ং আল্লাও পাইয়ে দিতে পারেননি! ধ্বংস আর লুন্ঠনে মেতে উঠা আরব, আফগান আর তূর্কি সেনাদের এই যে মচ্ছব এর নেপথ্যে কি ইসলাম ধর্মের কোন সায় ছিল না? প্রতিটি শাসকদের হাত ধরেই সুফিরা এই ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। ভারতবর্ষে কোটি কোটি নারী ধর্ষিতা হয়েছিল এইসব বহিরাগত শাসকদের হাতে। বন্দি হয়ে শিশুসহ এইসব নারীদের যৌনদাসী হিসেবে আরবে বিক্রি করে দেওয়া হতো। আমরা জানি ইসলাম ধর্মে মুসলিম শাসকদের অমুসলিম রাজ্যে দ্বিন কায়েমের জন্য আক্রমনকে বৈধ করা হয়েছে। এই আক্রমণে লব্ধ সম্পদকে ইসলাম নাম দিয়েছে “মাল-ও গণিমত”। এটি একমাত্র নবী মুহাম্মদকেই অনুমতি দেয়া হয়েছে ৩৩ কোটি নবী ও রাসূলের মধ্যে! অর্থ্যাৎ, এর আগে আর কোন নবী যুদ্ধ করতে গিয়ে অন্যের বউ-বাচ্চাকে দাসে পরিণত করেননি। তাদের বিক্রি করে যুদ্ধের অর্থ জোগার করেননি। কুরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে এটি শুধু মুহাম্মদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, অন্য নবীদের এরকম কোন নজির নেই। ইসলামের নবী নিজে ও তার অনুসারীদের দূরদুরান্তে রাজ্য জয়ের জন্য পাঠিয়েছেন। সেখানকার লুন্ঠিত মালামল এনে নিজেদের ভান্ডর পূর্ণ করেছেন। অগুণতি নারীকে যৌন দাসী করে বিক্রি করার কথা খোদ কুরআনই জানাচ্ছে। এদেরকে কুরআন “দক্ষিণ হস্ত” বলে উল্লেখ করে আল্লাহ বলছেন তাদের ভোগ করার জন্য তোমাদের বিয়ে করার প্রয়োজন নেই। ইসলামের প্রধান চার খলিফার সময়কালেও একই ধারা বহাল ছিল। তাদের হাতে দুনিয়ার কোটি কোটি নরনারী দাসের পরিণত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের যে অভিযান, লুন্ঠন ও স্থানীয় কাফেরদের উপর যে জুলুম- তার প্রেরণা ইসলাম ধর্ম। কঠিন জিজিয়ার করের বোঝা বইতে হয়েছিল স্থানীয় ভারতবাসীকে। জিজিয়া যে কুরআনের বিধান সেটা কে না জানে। কুরআন বলেছে, কাফেররা যেন মস্কত নত কর কড়জোড়ে জিজিয়া দিয়ে যায় সেটা মুমিনরা দেখভাল করবে। ভারতে মুসলিম শাসনে জিজিয়ার কর দেয়ার সময় একজন নায়েব থাকতেন যিনি কাফের প্রজার মুখটা হা করতে বলতেন, তখন সেখানে একদলা থুতু ফেলা হতো। তারপর জিজিয়া গ্রহণ করে পাছায় একটা লাথি মারা হতো।
বখতির খিলজির বৌদ্ধদের মঠ ও বিহারগুলোকে ধ্বংসের যে ইতিহাস তা থেকে বুঝা যায় বিধর্মীদের প্রতি খিলজির প্রচন্ড বিদ্বেষ তাকে এতখানি নিষ্ঠুর করে তুলেছিল। নালন্দার মত বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করার মধ্যে মুসলিমদের অনলি কুরআন ছাড়া দুনিয়ার আর সব বই তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় জাতীয় যে মূর্খামি তারই বর্হিপ্রকাশ বলে মনে হয়। এত এত মন্দির ধ্বংস, সে স্থানে মসজিদ নির্মাণ কোন রাজনৈতিক অভিপ্রায় থেকে নয়, ধর্মীয় নিরন্তর বিশ্বাস থেকেই করা হয়েছিল। নইলে সুলতান মাহমুদ মথুরায় এক হাজার ও অন্যত্র দশ হাজার মন্দির ভেঙ্গেছিলেন কেন? মোহাম্মদ ঘুরি, কুতুব উদ্দিন আইবেগ, আলাউদ্দিন শাহ, টিপু সুলতান, আওরাঙ্গজেব ইত্যাদি শাসকদের আমলে মন্দিরকে ভেঙ্গে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল। নির্মাণ হয়েছিল সে স্থলে মসজিদ। সে সময়কার পীর, দরবেশ, সুফি, অলিদের কেউই এসব বিষয়ে কোন বিরুদ্ধাচারণ তো করেননি উল্টো কোন শাসক স্খানীয়দের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলে এইসব পীর-সুফি-দরবেশরা অন্য রাজ্যের মুসলিম শাসককে আমন্ত্রণ জানাতেন জিহাদ করে রাজ্য দখল করতে। এটি ছিল তাদের পক্ষ থেকে কাফেরদের প্রতি সহানুভূতিশীল মুনাফিকের উপর শাস্তি!