মেহের আফরোজ শাওন হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী এই পরিচয়ের বাইরে তার নিজস্ব পরিচয়ই যথেষ্ট একজন অভিনেত্রী ও গাইকা হিসেবে। সম্প্রতি শরিয়ত বয়াতীর গ্রেফতার হওয়ার প্রেক্ষিতে তার ফেইসবুক পোস্ট আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একজন মুসলমান সারাজীবন তার সংগীত সাধনা, শিল্প চর্চা, ভাস্কর্য নির্মাণ, আঁকাআঁকি নিয়ে কি পরিমাণ দ্বিখণ্ডিত, শঠতা,  ভন্ডামী, দ্বিচারিতা, আত্মপ্রতারণার আশ্রয় নেন শাওনের পোস্ট ছিলো তার সরল স্বীকারোক্তি। তার পোস্টটি নিচে তুলে দিলাম –

‘অনেক কিছুতে নিয়মিত না হলেও পরম করুনাময় আল্লাহর অস্তিত্বে, আশ্বাসে এবং বিচারে মনে প্রাণে বিশ্বাস করি কিন্তু আমি যে গান শুনি! গান গাই!! গান ভালোবাসি!!!…এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি! খোদা তোমার মেহেরবানী।’— এ গান যে আমার বড্ড প্রিয়… এ গান কি বিশ্বাসীদের জন্য হারাম! তবে কি আমি ভুল!!!…আর ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’— এযে রবি ঠাকুরের গান!!! প্রিয় বললে কি আমার অন্যায় হবে! জানিনা …হে পরম করুনাময় আল্লাহ— তবে তোমার রিমান্ডেই আমাকে নেয়া হোক। এই মানবজাতির রিমান্ডে আমার যে বড্ড ভয়…’

শেষ বিচারে বিশ্বাস করলে অচিরে ওমরাহ করতে দেখতে পারি শাওনকে। বিশ্বাসী হিসেবে শাওনের ওমরাহ নিয়ে দ্বিধা না থাকলেও শিল্পী হিসেবে গান নিয়ে তার যে দ্বিধা আছে তার লেখায় স্পষ্ট। তিনি গান গাওয়ার জন্য আল্লার রিমান্ড চান। মানে আল্লা শাস্তি দিবে এটা তিনি মেনে নিয়েছেন। মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাস তাদের মধ্যে শিল্পী সত্তা আসতে দেয় না। শিল্পী মানে গায়ক নায়ক গাইকা নায়িকা নৃত্য করা ছবি আঁকা নয়,  শিল্পী মানে শিল্পের সাধক। বহু সফল গাইয়ে আঁকিয়ে মঞ্চ ফিল্ম কাঁপানো মানুষ সারাজীবনে তাই শিল্পী হতে পারে না। শিল্পকে পাপ মনে করা মানুষ বড়জোর ভালো মুসলমান হতে পারে শিল্পী নয়।

ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ বলতেন বাবা বিশ্বনাথের চরণে বসে আমি সাঁনাই বাজাই। বাজনাকে তিনি পাপ মনে করতেন না। কিংবা ইসলামে বাদ্যযন্ত্র জায়েজ বিশ্বাস করে নিজের বাজনাকে দায়মুক্তি দিতেন তাও না। উনার পূর্বপুরুষ বিশ্বনাথ মন্দিরে সাঁনাই বাজাতেন। বিসমিল্লাহ খাঁর শিল্পী ধর্ম কতজন মুসলমান বাদক মেনে নিবে? মরার পর দোযগের চ্যালা কাঠ হতে হবে। বাজনা বাজানো দুটো হাতে আগুনের শিকল পরানো হবে। এগুলো বিশ্বাস করেও বাজনা বাজানো যায়। কিন্তু সারাজীবন ইলিয়াস কাঞ্চন শাবানার মত নিজের সঙ্গে আত্মপ্রতারণা করে যেতে হয়। অভিনয়কে হারাম বললেও অভিনয়ের হারাম টাকা দিয়ে বাকী জীবন সচ্ছল আরাম আয়েশ নিশ্চিত হলে তাকে হারাম মনে হয় না।

মক্কা বিজয়ের পর নবী মুহাম্মদের সাধারণ ক্ষমা থেকে যে দশজন মানুষ আওতামুক্ত ছিলো তাদের দুইজন ছিলো গাইকা। তাদের হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। শাওনের রবীন্দ্র প্রেম পরকালের আল্লার রিমান্ডের ভয়ে থরথর কম্পমান। এই না হলে মুসলমানের মন!

আমরা যখন ভারতের শিল্পী লেখক গায়ক নায়ক গাইকা নায়িকার প্রগতিশীলতার পক্ষাবলম্বনের সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলিম শিল্পীদের নিরবতার তুলনা করে হতাশা প্রকাশ করি তখন তাদের মুসলিম দ্বিধান্বিত মনের কথা স্মরণ করব। আশা করি তখন আর হতাশ লাগবে না!