বাংলাদেশ নামক দেশটির ব্যর্থতার একটি মাইলফলক ১৫ আগষ্ট।

১৫ আগস্টের আগে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’ এজেন্ট বঙ্গবন্ধুকে জানিয়েছিলো, বড় রকমের ছক কষা হচ্ছে। লিডারকে হত্যা করা হতে পারে…। বঙ্গবন্ধু বিরক্ত হয়েছিলেন ভারতীয় টিকটিকির উপর। তিনি ভর্ৎসনা করে জনৈক গোয়েন্দাকে বলেছিলেন, তোমরা সব কিছুতে বেশি বুঝ…।

ভারত সম্পর্কে ঐতিহাসিক দুরত্ব, মুসলিম লীগের ভারত ভাগ, এসব বাংলাদেশ রূপকারদের মনস্তত্ব থেকে কখনই দূরীভূত হয়নি। তাজউদ্দিন আহমদ ২৫ মার্চ ঢাকা ছেড়ে ভারতীয় সীমান্তে যাবার পর ভারতীয় কৃর্তপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি সহায়তার আহ্বান জানানোর পরও সর্বদা ভারত থেকে নিজেদের সতর্ক দুরত্ব রাখতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ভারতের কবলে পড়তে চান না…। অথচ ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের সীমান্তে একটি সৈন্যও রাখা হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানকে সুরক্ষিত করতে সমস্ত সৈন্যসামন্ত সেখানে জড়ো করা হয়। ভারত ইচ্ছে করলে ৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে এ্যাটাক করতে পারত। ভারত কখনই বাংলাদেশকে আক্রমন করেনি তবু ‘বাংলাদেশ দখল করার’ জুজু এদেশের প্রতিটি মানুষের মনে…।

বঙ্গবন্ধু আরবদের স্বীকৃতি পেতে মরিয়া ছিলেন। বাংলাদেশ যে পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে বস্তুবাদী নিরশ্ববাদী কোন রাষ্ট্র হয়নি তা প্রমাণ করতে সব রকমের ইসলামিকরণের চেষ্টা তখন করা হয়। এমনকি মাত্র চার বছর আগে বাংলাদেশের উপর জেনোসাইড চালানো পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব স্খাপন করা হয়। ভারত সোভিয়েত বলয় থেকে বেরিয়ে এসে আরব আমেরিকা পাকিস্তান বলয়ে ঘেষার চেষ্টা অতি দ্রুত ১৫ আগস্ট ডেকে এনেছিলো। বঙ্গবন্ধুকে মরতে হয় না আর বাংলাদেশ ৭২ সালের সংবিধান থেকে দূরে সরে আসে না, বাকশাল ডাকতে হয় না যদি দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি আরব আর পাকিস্তানের বন্ধুত্ব পেতে মড়িয়া না হতেন। ‘মুসলিম বিশ্বকে’ খুশি রাখতেনই কি বঙ্গবন্ধু তার নামানুসারে মুজিবনগরে যাননি যেখানে স্বাধীন বাংলার প্রথম রাজধানী করা হয়েছিলো? মুসলিম বিশ্বকে খুশি করতেই কুখ্যাত রাজাকারদের জেল থেকে বের করে এনেছিলেন? রমনা কালি মন্দিরকে সরিয়ে দিয়েছিলেন? ভারতের পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটার রোডের ঐতিহাসিক যে বাড়িটিতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অফিস ছিলো, ভারত সরকার বারবার তাগিদ দিয়েছিলো ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বাড়িটি সংরক্ষণ করতে- কিন্তু বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু সরকার ভ্রুক্ষেপই করেনি সেই মহান স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা করতে। কেন, মুসলিম বিশ্ব গোস্বা হবে বলে?

মুক্তিযুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার প্রমাণপত্র থাকার পরও খন্দকার মুশতাককে দলে রাখা এবং ৭৩ সালে তাকে চুরি করে ভোটে জিতিয়ে আনার কি দরকার ছিলো? যে লোকটি মুক্তিযুদ্ধের সময় গোপনে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার চেষ্টা করেছিলেন তাকে কেন বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠ সহচর বানালেন? কেন ভারতীয় গোয়েন্দাদের বিশ্বাস করলেন না? সাহিত্যিক শহিদুল্লাহ কায়সারের খুনি আল বদর নেতা যার দশ বছরের সাজা হয়েছিলো ট্রাইব্যুনালে সেই খালেক মজুমদারকে মুক্তি দেয়া হয়েছিলো। ডা. আলিম চৌধুরীর খুনি আল বদর নেতা মাওলানা আবদুল মান্নানকে (ইনকিলাব পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা) সাধারণ ক্ষমায় ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় আরো মুক্তি পান কুখ্যাত রাজাকার শর্ষিনার পীর যাকে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা পদক প্রদান করেছিলেন। মুসলিম ব্রাদারহুডকে খুশি করতে এই কুখ্যাত জেনোসাইডকারীদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। বস্তুত পরাজিত শত্রুদের বঙ্গবন্ধু নিজেই শক্তিশালী করে দিয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে। তাজউদ্দিনকে সরিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৫ আগষ্টকে অবধারিত হওয়ার পধ মসৃন করে দিয়েছিলেন। প্রতিটি বাংলাদেশী মুসলমানের হিন্দু ও ভারত বিরোধীতা এক ঐতিহাসিক সত্য। আমার পরিবারের, জাতগোষ্ঠির কথাই ধরি, প্রায় সকলের কাছেই, হিন্দু ও ভারত তাদের কাছে সমার্থক এবং তারা এ দুটোর বিরোধী। এভাবে আপনি আপনার পরিবার জ্ঞাতিগুষ্ঠিদের নিয়ে ভেবে দেখেন- একই রেজাল্টা পাবেন। আমাদের জাতীয় নেতারা এসবের বাইরে ছিলো না। ভারতীয় সৈন্যকে দেশ স্বাধীন হবার পর পরই দেশে ফেরত নেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর মড়িয়া হয়ে কুটনৈতিক তৎপরতা, ইন্দিরা গান্ধিকে চাপ দেয়া ছিলো তার আজন্ম মুসলিম লীগের ভারত ভীতি থেকে উৎসারিত। ভারতীয় সৈন্য যদি ৭৫ সাল পর্যন্ত এদেশে থাকত তাহলে মুজিব হত্যা সম্ভব হত না। পৃথিবীতে সহায়তাকারী সৈন্যবাহিনী দীর্ঘকালীন অবস্থানের নজির থাকার পরও বঙ্গবন্ধু সরকার ভারতীয় মিত্রবাহিনীকে সরিয়ে নিতে তোড়জোর করার ফল হচ্ছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা খালি মাঠে গোল দিয়ে গেছে। যার করুণ পরিণত হচ্ছে স্বাধীনতার স্থপতির সপরিবারের আত্মদান। বাংলাদেশ নামক দেশটির ব্যর্থতার একটি মাইলফলক ১৫ আগষ্ট।

আশ্চর্য ও দু:খজনক হলো বঙ্গবন্ধুর মেয়ে যিনি বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একই রকমভাবে বাংলাদেশের ইসলামিক নেতাদের খুশি করে চলেছেন যারা মূলত মধ্যপাচ্যের এককেটা চর। বর্তমান সরকারের সৌদি বলয়ে ঘেষা, মুসলিম বিশ্বে গ্রহণযোগ্য হবার প্রতি আগ্রহ হুবহু বঙ্গবন্ধু সরকারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। দেশের অবশিষ্ঠ প্রগতিশীলদের শত্রু জ্ঞান করা, ইসলামিক বিশ্বের উপর নির্ভরতা ঘরপোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পেলে তাকে দোষ দেয়া যায় না…।

Susupto Pathok