বাঙালির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবেঃ (দ্বিতীয় অংশ)
(প্রথম অংশের পর …)

অনেকগুলি তথ্য, ঘটনা ও পরিসংখ্যান এলোমেলোভাবে পেশ করব। পশ্চিমবঙ্গের চারটি বৃহত্তম শহর কলকাতা, হাওড়া, আসানসোল ও শিলিগুড়ি। এই চারটি শহরেই আজ জনজীবন বা দৈনন্দিন চলাফেরা বা কাজকর্ম মারোয়াড়ি ও হিন্দিভাষী মানুষদেরকে বাদ দিয়ে ভাবাই যায় না। এছাড়া দুর্গাপুর, রানিগঞ্জ, রিষড়া, কোন্নাগর, ব্যান্ডেল, নৈহাটি, ব্যারাকপুর, টিটাগড় প্রভৃতি আরও বহু শহরেরই একই পরিস্থিতি। এই শহরগুলির চারিদিকে বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে এগুলির উপরইতো অনেকটা নির্ভরশীল।

পরবর্তী খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আসামের বরাক উপত্যকায় অর্থাৎ কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হিন্দু বাঙালি সংখ্যালঘু হয়ে গেছে। তবুও তারা এখনও নিজেদেরকে বাঙালি বলেই মনে করে। কিন্তু ব্ৰহ্মপুত্ৰ উপত্যকায় অর্থাৎ ধুবড়ী থেকে গুহায়াটী হয়ে তেজপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় যে বাঙালিরা  আছে, যারা বহুবার ভাষাদাঙ্গার শিকার হয়েছে, ভাষা বৈষম্যের শিকার হওয়া যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের অনেকেই ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে তারা আর বাঙালি পরিচয়কে বহন করবে কিনা! তাদের অনেকেরই মনে হচ্ছে যে বাঙালি পরিচয় নিয়ে তারা সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে না। তাই নিজেদের বাঙালি পরিচয় বিসর্জন দিয়ে অসমীয় পরিচয় গ্রহণ করবে কিনা।

তিন, মহারাষ্ট্রে চন্দ্রপুর ও গড়চিরৌলি দুটি জেলায় কয়েক লক্ষ বাঙালি উদ্বাস্তু আছে। তারা এখনও বাংলায় কথা বলে, কিন্তু তাদের সন্তানদের লিখিত বাংলা ভাষা শেখানোর কোন সুযোগ নেই। তাই, সেখানকার বর্তমান প্রজন্মের বাঙালিরা বাংলা লিখতে ও পড়তে পারে না। এই উদ্বাস্তুদের প্রধান দাবি হল বাংলা মাধ্যম স্কুল চালু করা। এই অবস্থায় তারা কতদিন বাংলা ভাষাকে ধরে রাখতে পারবে?

চার, বিহার ও ঝাড়খন্ডে যে বাঙালিরা আছে, তাদের সন্তানরা স্কুলে গিয়ে বা বাড়ির বাইরে নিজেদের নামের পরে পদবী ব্যবহার করে না। অর্থাৎ নিজেদের বাঙালী পরিচয়কে লুকিয়ে রাখতে চায়। কারণ সহজবোধ্য।

এছাড়া বাঙালির বর্তমান নিজস্ব বাসস্থান, যেখানে নির্বাধভাবে সে তার বাঙালি পরিচয় ও অস্তিত্বকে ধরে রাখতে পারবে, সংরক্ষণ ও সংবর্ধন করতে পারবে, সেই জায়গাটা তো ১৯৪৭ সালে দুই-তৃতীয়াংশ সংকুচিত হয়ে আজ এই এক-তৃতীয়াংশ বঙ্গভূমি পশ্চিমবঙ্গেই পরিণত হয়েছে। এইটুকু ভূমির মধ্যেও আবার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বাঙালি সংস্কৃতি পরিত্যাগ করে আরবীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। তাহলে আর বাকি থাকলো কতটা ? আর এই প্রক্রিয়াওতো থেমে নেই। বাঙালি সংস্কৃতির অবক্ষয় বা অবলুপ্তির এই প্রক্রিয়াকে হাওয়া দিয়ে ত্বরান্বিত করে চলেছে আমাদের পবিত্র গণতন্ত্র, অর্থাৎ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি। মমতা ব্যানাজী হিজাব পারেন, কিন্তু জ্যোতি বসু মোল্লাটুপি না পরেই পনেরো লক্ষ মুসলমানকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বসিয়ে দিয়েছিলেন। কেন ? মোল্লাপ্রীতিতে নয়, বাড়তি ভোটব্যাঙ্ক তৈরীর জন্য। আজকে মমতা ব্যনাজী দক্ষিণেশ্বরের পাশেই কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে বসিয়েছেন ওই কটা বাড়তি ভোটের জন্য নয়। পশ্চিমবঙ্গের তিরিশ শতাংশ মুসলিম ভোটের মুখ চেয়ে। গণতন্ত্রের এমনই মহিমা! কিন্তু ভুগতে হবে আমাদেরকেই।

(ক্রমশঃ)
সৌজন্যেঃ স্বদেশ সংহতি সংবাদ। পূজা সংখ্যা; ২০১৭, পৃষ্ঠা – ৬
লেখকঃ শ্রী তপন ঘোষ….