ভুলে গেছি সেই বিপ্লবী যতীন দাস-কে যাঁর সংকল্পের দৃঢ়তার সামনে শহীদ ভগৎ সিংকেও স্নান লাগেঃ…..

১৯২৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তেষট্টি দিন অনশনের পর বিপ্লবী বীর যতীন দাস লাহোর জেলে শহিদের মৃত্যুবরণ করেন। এ মৃত্যু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা যা সেদিন পরাধীন ভারতবর্ষে এক নতুন জাগরণ এনেছিল। পাঞ্জাবকেশরী লালা লাজপৎ রায়কে লাহোরের রাজপথে একটি স্বদেশী মিছিল পরিচালনাকালে মেসার্স স্কট ও জে. পি. স্যান্ডার্সের নেতৃত্বে এক পুলিশ বাহিনী এমন প্রহার করে যে, তার ফলে তাঁর শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়। ভারতবর্ষের বিপ্লবীরা এ ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার দায়িত্ব নিজেদের স্কন্ধে তুলে নেন ও ১৭ ডিসেম্বর ১৯২৮ সালে বিপ্লবীদের গুলিতে জে. পি. স্যান্ডার্স নিহত হন।

লাহোরের সব রাস্তা পোস্টারে ছেয়ে যায়- পরে ঘোষিত হয়- “Beware of Bureaucracy. The killing of J. P. Sanders was only to Avenge the murder of Lala Lajpat Rai… We are sorry that we had to shed human-blood on the altar of revolution which will end all exploitation of man in the hands of man.”

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লী অ্যাসেম্বলিতে ১৯২৯ সালে ৬ জুন যখন বিঠলভাই প্যাটেলের Speakership-এ সভা চলছে এবং Public Safety Bill, Trade Dispute Bill, Simon Commission এবং লালা লাজপৎ রায়ের শোচনীয় মৃত্যু নিয়ে সারা দেশ বিক্ষুব্ধ; সেদিন তা প্রকাশের ভাষা দিয়েছিল বিপ্লবী ভগৎ সিং ও বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত ওই অ্যাসেম্বলি হলে একটি উন্মুক্ত স্থানে কোনো মানুষকে হত্যা না করে সজোরে একটি বোমা নিক্ষেপ করে- তারই শব্দ ইংরেজ সরকারকে সচকিত করে। বোমা নিক্ষেপের ঘটনা একই দলের কাজ- এই অনুমানের উপর ভিত্তি করে একটি ষড়যন্ত্রের মামলা সরকারি পরিকল্পনায় সংঘটিত হয়, যার নাম দেওয়া হয়। ‘লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা’।

সেই মামলায় ১৯২৯ সালের ১৪ জুন সকালে কলকাতায় টাউনসেন্ড রোড ও হাজরা রোডের মোড়ে দোতালায় একটি ঘর থেকে যতীন দাসকে গ্রেপ্তার করে লাহোরে পাঠানো হয় এবং ১০ জুলাই পুলিশ স্যান্ডার্সকে হত্যার অপরাধে ও ইংরেজ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে লাহোরে ষড়যন্ত্র মামলা খাড়া করে, যাতে পাঞ্জাবের ভগৎ সিং, সুকদেব, রাজগুরু, বাংলার বীর সন্তান যতীন দাস প্রমুখ ১৭ জনকে আসামী করা হয়। যতীন দাসের সেই মামলা চলাকালীন জেলখানায় রাজনৈতিক বন্দীর মর্যাদা দাবি করে আমৃত্যু অনশন, সরকারি মহলেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
দেশের নেতৃবৃন্দের অনুরোধও উপেক্ষা করে আদর্শ অনুযায়ী উদ্দেশ্যসিদ্ধ করবার একটা মৃত্যুঞ্জয়ী বিপ্লবী চরিত্র যতীন দাসের সেই সময়কার সংকটমুহুর্তকালীন কথাবার্তায় যা প্রকাশ পায় সেই বিবরণ দেওয়া হলঃ

১৬ আগস্ট তারিখের ঘোষণায় পাঞ্জাব গভর্নমেন্ট যে জেল এনকোয়ারি কমিশন গঠন করলেন তার মধ্যে রইলেন পাঞ্জাবের জেলাসমূহের প্রধান পরিদর্শক (সভাপতি) আফজল হক মোহনলাল, হরবক্স সিং, মহীন্দ্ৰ সিং, দৌলতরাম মালিয়া, চৌধুরী জাফরুল্লা, মহম্মদ হায়াৎ খাঁ ও কুরেশী আলি, পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রসচিব অগিলভি হলেন সেক্রেটারি।

ডা. গোপীচাঁদ ভাগব জেল পরিদর্শনে এসেছিলেন। যতীন দাসের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট খইরুদ্দিন যেভাবে লিপিবদ্ধ করছেন তা উদ্ধৃত হল –

ডা. গোপীচাঁদ : সুপ্ৰভাত মিস্টার দাস!
মিঃ দাস : সুপ্ৰভাত (গলার স্বর অতি মৃদু)
ডা. গোপীচাঁদ : আপনি জল ও ওষুধপত্র কিছু খাচ্ছেন না কেন ?
মিঃ দাস : আমি মরতে চাই।
ডা. গোপীচাঁদ : কেন ?
মিঃ দাস : কারণ আমার দেশ, কারণ আমি রাজনৈতিক বন্দীদের মর্যাদা তুলে ধরতে চাই।

২১.৮.২৯ তারিখে ডা. গোপীচাঁদের সঙ্গে পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডনও এসেছিলেন দাসকে দেখতে।

পুরুষোত্তম দাস : আপনি আজ কেমন আছেন মিস্টার দাস ?
মিঃ দাস : খুব ভালো আছি।
পুরুষোত্তম দাস : আপনার তো বেঁচে থাকা দরকার।
মিঃ দাস : বেঁচে আছি তো!
পুরুষোত্তম দাস : কোনো ওষুধ বা পুষ্টিকর কিছু না নিয়ে কেমন করে বেঁচে থাকবেন ?
মিঃ দাস : আমার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে।

ডা. গোপীচাঁদ : একটু ওষুধ অন্তত খান। আপনার এই অনশনের ফল দেখবার জন্যে আরও দুসপ্তাহ আপনাকে বাঁচতে হবে। তারপর যদি দেখেন, আপনার দাবি পূর্ণ হয় নি, তখন যা খুশি করবেন।
মিঃ দাস : এই গভর্নমেন্টকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না।

পুরুষোত্তম : আমার মনে হয়। ডা. গোপীচাঁদ ঠিক কথাই বলেছেন। অন্তত আরও দুসপ্তাহ বেঁচে থাকবার জন্যে আপনার কিছু ওষুধ খাওয়া দরকার।
মিঃ দাস : না। ওষুধ খাওয়া মানে এই নির্যাতনের মেয়াদ বৃদ্ধি মাত্র।

ভগৎ সিং : এর আগের বারে আপনি আমার অনুরোধ রেখেছিলেন।
মিঃ দাস : হাঁ। কিন্তু আপনি আবার এসেছেন কেন ? এবারে আর আপনার কথা শুনতে রাজি নই। আপনি যান।

পুরুষোত্তম ও ডা. গোপীচাঁদ (একসঙ্গে) : ভগৎ সিং তো নিজে আসেননি। আমরাই তাঁকে নিয়ে এসেছি।
মিঃ দাস: ভগৎ সিং, আপনি আমার বুক ভেঙে দিয়েছেন।

ভগৎ সিং : আমি এদের অনুরোধেই এসেছি। কিন্তু আপনাকে অনুরোধ করি আপনি আর পনেরোটা দিন বেঁচে থাকবার চেষ্টা করুন। আমাদের দাবি যদি না মেনে নেয়, তখন আমরা মরতে পারি।
মিঃ দাস : আপনাকে গায়ের জোরে খাওয়ালো কী করে ?
ভগৎ সিং : আমি যতক্ষণ পেরেছি, প্রতিরোধ করেছি। আমার অনুরোধ, আপনি রোজ একপোয়া করে দুধ খান।

৩০ আগস্ট যতীন্দ্রনাথকে দেখতে এলেন ডা. গোপীচাঁদ, পন্ডিত শান্তনম, সর্দার শার্দুল সিং কবিশের ও ভগৎ সিং-এর পিতা সর্দার বিষণ সিং।

ডা. গোপীচাঁদ : মিস্টার দাস, কেমন আছেন?
– (উত্তর নেই)।
ডা. গোপীচাঁদ : আপনি তো কথা রাখলেন না। আপনি বলেছিলেন যে, এই কটা দিন বেঁচে থাকবেন। কিন্তু এভাবে কি সম্ভব ?
-(তবুও কোনো উত্তর এলো না।)
ডা. গোপীচাঁদ: কেন ওষুধ খাচ্ছেন না বলুন তো ?
-(কোনো উত্তর এলো না এবারেও)।
ডা. গোপীচাঁদ : আপনার মৃত্যু হলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। একমাত্র একজন ছাড়া কমিটির আর সকলে সবগুলি দাবি মেনে নিয়েছেন। আপনি যদি চান, আমি তাদের এখানে আনতে পারি। আপনি আপনার কথা রাখুন।

যতীন দাসের কাছ থেকে তবুও কোনো উত্তর এলো না।

পন্ডিত শান্তনম বললেন: মিস্টার দাস, আমরা জানি – মৃত্যু আপনার কাছে কিছুই না। আপনাকে আদর্শচ্যুত করবার কোনো অধিকার আমাদের নেই। আমরা বলছি না, যে আপনি অনশন ভঙ্গ করুন। ওষুধ খেয়ে ক’দিন বেশি বাঁচবার মানে যন্ত্রণা বৃদ্ধি। কিন্তু তবু আমাদের জন্যে, জেল কমিটির অনুমোদনের ফল কী হয় শুধু সেইটুকু দেখবার জন্যে আপনাকে আরও কদিন বাঁচতে বলছি।

দাস, জিতেন সান্যালের মুখের দিকে তাকালেন। সান্যাল নিচু হয়ে দাসের মুখের কাছে কান পাতলেন। এখন সামান্য নড়ল ঠোঁট।
সান্যাল জানালেন অন্যদের – বলছেন, না।

ডা. গোপীচাঁদ : কিন্তু আপনি কথা রাখছেন না। বলেছিলেন, দুসপ্তাহ বেঁচে থাকবেন। এখনো তো চোদ্দ দিন হয় নি!

সান্যালের কানে কানে ফিসফিস করে বললেন দাস, ৪ সেপ্টেম্বর চোদ্দ দিন পূর্ণ হবে। আমি বেঁচে থাকব।

ডা.
আমাদের অনুরোধ। এই ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নিচের চিঠি থেকে পরিষ্কার বোঝা যাবে। চিঠিটি লিখেছিলেন পাঞ্জাব গভর্নমেন্টের সেক্রেটারি সি. এম. জি. অগিলভি স্বরাষ্ট্রসচিব মার্সনের কাছে। ওই নােটে এটা পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে যে যতীন্দ্রনাথ দুমাস অনশনে থেকে মৃত্যুমুখী হওয়া সত্ত্বেও গভর্নমেন্ট তাকে মুক্তি দিতে ভয় পাচ্ছেন। জেল এনকোয়ারি কমিটির অনুরোধ সত্ত্বেও যতীন্দ্রনাথকে মুক্তি দেওয়া হল না। মৃত্যু পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে। যতীন্দ্রনাথ বলেছিলেনআমি মরতে চাই। বিপ্লবীর কাছে দেশ একমাত্র সত্য, জীবন ও মৃত্যু তার ‘পায়ের ভৃত্য”। দেশের জন্যে রাজনৈতিক বন্দীদের
গোপীচাঁদ, পণ্ডিত শান্তনম, সর্দার শার্দুল সিং একসঙ্গে অনুরোধ করতে লাগলেন দাসকে- জেলা কমিশন আসবে আপনার সামনে। আপনাকে যে কথা বলতে হবে। বমি বন্ধ করার জন্য একটু ওষুধ আর চিনির জল খেতে হবে।
দাস তখন বললেন-শিব শৰ্মা, সান্যাল আর ঘোষ কী বলেন?
তারা তিনজনেই ব্যগ্র হয়ে বললেন- আমরাও তাই বলি।
দাস রাজি হলেন ওষুধ দিয়ে সামান্য একটু সোডার জল খেতে।

ভগৎ সিং-এর পিতা সর্দার বিষণ সিং নিঃশব্দে শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি কোনো কথাই বললেন না। জেল এনকোয়ারি কমিটির সভ্যরা লাহোর সেন্ট্রাল জেলে এসে বন্দীদের সঙ্গে দেখা করলেন। দীর্ঘ আলোচনার পরে তাঁরা কথা দিলেন যে, লাহোর-বন্দীদের সমস্ত দাবীই তাঁরা সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করবেন। তাঁরা আরো বললেন যে, যতীন দাসের বিনাশর্তে মুক্তির ব্যবস্থাও তাঁরা করবেন।

জেল কমিটি তাদের রিপোর্টে একবারও বলেন নি যে যতীন্দ্রনাথকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হোক। তাদের অনুরোধ ছিল – গভর্নমেন্ট অবিলম্বে তাঁর মুক্তির আদেশ দিন।

এই ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যতিক্রম হবার কারণ নিচের চিঠি থেকে পরিষ্কার বোঝ যাবে। চিঠিটি লিখেছিলেন পাঞ্জাব গভর্নমেন্টের সেক্রেটারি সি.এম.জি. অগিলভি স্বরাষ্ট্রসচিব মার্সনের কাছে। এই নোটে এটা পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে যে যতীন্দ্রনাথ দু’মাস অনশনে থেকে মৃত্যুমুখী হওয়া সত্ত্বেও যতীন্দ্রনাথকে মুক্তি দেওয়া হল না।

মৃত্যু পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে। যতীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, – আমি মরতে চাই।
বিপ্লবীর কাছে দেশ একমাত্র সত্য, জীবন ও মৃত্যু তাঁর ‘পায়ের ভৃত্য’। দেশের জন্য রাজনৈতিক বন্দীদের মর্যাদার জন্যে মৃত্যুকে বরণ করতে চাইলেন আত্মঘাতী পুরুষ। মৃত্যু তাঁর শিয়রে এসে দাঁড়াল।

বিপ্লবী নায়ক শ্ৰীভূপেন রক্ষিত রায় তার বই ‘সবার অলক্ষ্যে’তে লিখেছেন – বাংলা তথা ভারতের বিপ্লবযুগের প্রধান অবদান হল ‘মার্টারডম’ বা আত্মদানের শিক্ষা। ‘ভাবনাহীন চিত্তে’ জীবন ও মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্যরূপে গ্রহণ করবার তত্ত্ব পরিস্ফুট হয়েছে অজস্ৰ বিপ্লবী শহিদের আত্মোৎসর্গে শতসহস্ৰ বিপ্লবী-কর্মীর দুর্জয় কর্মকাণ্ডে, বিপ্লবীর সাহস, মৃত্যুভয়হীনতা, কর্মনিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা ও বৃহৎ-এর পানে সমুন্নত দৃষ্টিই জাতির বেঁচে থাকার সঞ্চয়। বিপ্লবের ইতিহাস মিউজিয়ামে যত্ন করে তুলে রাখার বস্তু নয়, ইহা জীবনপথে নিত্য কাজে লাগাবার সম্পদ।

বিপ্লব জাতিকে নেতিবাদ শেখায় না, সে যা দেয় তা ‘ডিরেক্ট’ ও ‘পজিটিভ’। বিপ্লবী শুধু ধ্বংসের বার্তা শোনান না। তাঁর কণ্ঠে একই সঙ্গে ধ্বনিত হয় ধ্বংস ও সৃষ্টির আহ্বান। তাঁর বাণী তাই চিরন্তন। সে-বাণী লালন করতে হয় সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে সর্বক্ষণ।

( প্রথম ছবিতে বিপ্লবী যতীন দাস, যার নামে আজকের একটি মেট্রো স্টেশনের নাম – “যতীন দাস পার্ক”, দ্বিতীয় ছবিটি তাঁর নশ্বর দেহের, যাতে কাঁধ লাগিয়েছিলেন নেতাজী সুভাষ স্বয়ং…।।)

সৌজন্যেঃ স্বদেশ সংহতি সংবাদ। পূজা সংখ্যা ২০১৭; পৃষ্ঠা-৯