কাঁটাতারের ওপার থেকেঃ ….

এক

সুকোমলবাবু নিয়ম করে রোজ সকালে তিন কিলোমিটার হাঁটেন। ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠে। প্ৰাতঃকৃত্য সেরে বেরিয়ে পড়েন, ফিরতে ফিরতে সাড়ে ছ’টা-সাত’টা বেজে যায়। প্রতিদিনের এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয় না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পালপাড়ার কাঁচা রাস্তা ধরে সোজা গিয়ে ওঠেন বর্ডারের রাস্তায়। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে বিএসএফ ক্যাম্প পর্যন্ত যান, তারপর আবার ফিরে আসেন। ওদিকটাতে লোকবসতি তেমন নেই। সকালের আবহাওয়াও বেশ মনোরম। খোলামেলা পরিবেশে একা একা আপন মনে বেড়িয়ে আসা যায়। পিচ ঢালা সরু রাস্তাটা কাঁটাতারের বেড়া বরাবর সমান্তরাল ভাবে সোজা চলে গেছে। ডিউটিতে আসা বিএসএফ-দের সঙ্গেও ভালো পরিচয় হয়ে গেছে সুকোমলবাবুর। ফেরার সময় রোজ দেখা হয়, ডিউটি শেষ করে ওরা ক্যাম্পে ফিরে যাচ্ছে।

স্থানীয় বিডিও অফিসে কেরানির চাকরি করতেন সুকোমল হাজরা। চার বছর হল রিটায়ার করেছেন। স্ত্রী গত হয়েছেন পনেরো বছর হবে। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। জামাইয়ের চাকরির সূত্রে সে কলকাতায় থাকে। একমাত্র ছেলে সৌরভ একটি স্কুলে পড়ায়। বছরখানিক হল তারও বিয়ে হয়েছে, ছেলেপুলে এখনো হয়নি।

একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন সুকোমলবাবুর। সারাদিন বাড়িতে টুকটাক কাজ করে বিকেলে গিয়ে বসেন ঘোষের চায়ের দোকানে। এছাড়া আর তেমন কোন কাজ নেই। সকালে এই হাঁটাহাটির ব্যাপারটা নতুন যোগ হয়েছে, ডাক্তারের নির্দেশে। ডাক্তার বলেছেন, রোজ সকাল একটু হাঁটাহাটি করতে হবে, নইলে শরীর ঠিক থাকবে না। চাকরি জীবনে সুকোমলবাবুর কোনদিন সকাল ওঠা অভ্যাস ছিল না। বরাবরের ওই বেলা আটটায় ওঠা, তারপর কোনরকমে বাজারটা এনে দিয়ে, স্নান-খাওয়া করে অফিস। প্রথম দিকে উঠতে খুব কষ্ট হত। কিন্তু এখন আগের মত আলস্য ভাবটা আর নেই। চারটে বাজতে ঠিক ঘুম ভেঙে যায়। অভ্যোস হয়ে গেছে। এছাড়া ঘুম ভাঙার অন্য একটা কারণও আছে, সেটা হল মসজিদ থেকে আসা মাইকে আজানের শব্দ। গ্রামে আগে একটা মসজিদ ছিল। এখন দুদিকে আরও দুটো হয়েছে। এই তিনের ডাকে বিছানায় শুয়ে থাকা বড় দায়।

দুই

প্রতিদিনের মত আজও সুকোমলবাবু অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়লেন। শরৎকাল, উত্তরবঙ্গে এই সময় সকালের দিকে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা করে। তাই চাদরখানা তিনি ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। এত ভোরে বাড়ির কেউ ঘুম থেকে ওঠে না। দু-একজন ছাড়া রাস্তাতেও তেমন কেউ নেই। দূরে অনেকগুলো কুকুর ঘেউঘেউ করছে।

বাড়ি থেকে বেরিয়েই একটা সুবাস নাকে এলো। রাস্তার উল্টো দিকের শিউলি গাছ দুটোতে ফুল ফুটেছে, তারই মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। সেদিকে ভালো করে একবার তিনি দেখলেন, গাছের তলাটা ফুলে ঢাকা। যেন কেউ ফুলের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সুকোমলবাবু কয়েকবার বুক ভরে শ্বাস নিলেন, তারপর হাঁটা শুরু করলেন।

হাঁটতে হাঁটতে পালপাড়া ছাড়িয়ে গিয়ে উঠলেন। বর্ডারের রাস্তায়। এদিকটা আরো বেশি শুনশান। কোথাও একটা দুটো পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে মাত্র।

সুকোমলবাবু এবারে জোরে জোরে পা চালাতে লাগলেন। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই একটা বিপত্তি ঘটলো।  পা’টা যেন কিসের উপর পড়ে পিছলে গেল। আমনি আছাড় খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিলেন। পিছন ফিরে দেখেন এক গাদা কাঁচা গোবরের উপর তিনি পা দিয়েছেন। আর তাতেই এই বিপত্তি। শুধু এক জায়গায় নয়, সারা রাস্তা জুড়েই গোবরের ছড়াছড়ি। ভাবলেন, কাল রাতে নিশ্চয় দালালরা ওপারে গোরু চালান করেছে, তা না হলে এতো গোবর কোথা থেকে আসবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সুকোমলবাবু, কোমরে বা পায়ে কোথাও তেমন চোট লাগেনি।

আজ আর বেশিদূর এগোলেন না। একটু গিয়েই ফেরার রাস্তা ধরলেন। এরকম পা বাঁচিয়ে কতক্ষন হাঁটা যায়? বর্ডারের রাস্তা থেকে নেমে আবার পালপাড়ার কাঁচা রাস্তা ধরেই বাড়ি ফিরতে হয়। কিন্তু কিছুদূর এসেই সুকোমলবাবু থমকে দাঁড়ালেন। নন্দনদের বাড়ির পিছনের ফাঁকা জায়গাটায় কিসের যেন একটা জটিলা তৈরী হয়েছে? কোন মহিলার কান্নার আওয়াজও শোনা যাচ্ছে। এত সকালে আবার কার কী হল? কৌতুহলবসত রাস্তা থেকে নেমে ধানখেতের আলপথ ধরে এগিয়ে গেলেন। ততক্ষনে পুব আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। সূর্যদেবের উদয় হল বলে! ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে তিনি ভালো করে দেখার চেষ্টা করলেন। সবই চেনা মুখ। ওরা নিজের মধ্যে কী সব বলাবলি করছে।

আরও এগিয়ে গেলেন সুকোমলবাবু। দেখলেন নন্দনের মা খেতের ধরে বসে কাঁদছে। তিনি ঠিকই অনুমান করেছেন, কাল রাতে দালালরা ওপারে গোরু পাচার করেছে। গোরুরপাল নন্দনের দু-বিঘে ধান পুরো মাড়িয়ে দিয়ে গেছে। এক-একটা গোরুরপাল মানেই হাজার-পনেরোশো গোরু। অতগুলো গোরু কোনো ধানখেতের উপর দিয়ে যাওয়া মানে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। এই সময় ধানগাছগুলি পোয়াতি হয়। কদিন বাদেই ধানের শীষ বেরোবে। আর তার আগে এই সর্বনাশ।

নন্দনের মা গোরুর দালালদের শাপ-শাপান্ত করছে আর কাঁদছে। নন্দন বিমর্ষ মুখে আলের উপর বসে। ওদের সম্বল বলতে এক চিলতে ভিটে, আর কয়েক বিঘে ধানজমি। তাই দিয়েই মা-ছেলের সারা বছরের খোরাক জোটে। নন্দন চাষের সময় চাষ করে, বাকি সময় মজুর খাটে।

নন্দনের আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে সুকোমলবাবুর খুব খারাপ লাগলো। কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। জমির উপর দিয়ে গোরু চালান করে ফসল নষ্ট করাটা এখানে নতুন নয়। প্রশাসনকে অনেকবার জানানো হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। স্থানীয় নেতারাও এসব কথা কানে তোলে না। কারণ, ওরা নিজেরাই এসবের সঙ্গে যুক্ত। পার্টিফান্ড থেকে শুরু করে পার্টি মাস্তানদের পকেটমানি সবই আসে এই কারবার থেকে।

সুকোমলবাবুদের পাড়া থেকে কয়েকশো গজ দূরেই বাংলাদেশ। এদিক থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। মাঝে একটা কাঁটাতারের বেড়া মাত্র। সেটাও সব জায়গা নেই। কাঁটাতারের ওপারে গ্রামের অনেকেরই চাষের জমি আছে। ভোটার কার্ড জমা দিয়ে ওপারে চাষ করতে যেতে হয়, আবার সময়মত ফিরে আসতে হয়। নজরদারির জন্য ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে, বিএসএফ জওয়ানরা মাঝে মাঝে টহল দিয়ে যায়। গরুপাচার, চোরাচালানের জন্য আজকাল একটু কড়াকড়ি বেড়েছে, কিন্তু তা শুধু দিনের বেলাতেই, রাতে গোটা এলাকা চোরাচালানকারীদের মুক্তাঞ্চল। নেতাদের চাপে বিএসএফ-কে তখন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকতে হয়। কয়েক মাস আগেই গোরু পাচার করতে গিয়ে বিএসএফ-র গুলিতে একজন পাচারকারী মারা যায়। পরের দিন ওরাও দুজন জওয়ানকে পিটিয়ে মেরে ফেললো।

সুকোমলবাবু অবশ্য কোনদিনই এসব নিয়ে তেমন মাথা ঘামাননি। চাকরি, নিজের পরিবার নিয়েই জীবনের বেশিরভাগ সময়টা কাটিয়ে দিলেন। আর এখন শরীর স্বাস্থ্যের যা অবস্থা তাতে সকালে হাঁটতে যাওয়া আর সন্ধ্যেরা তাসের আড্ডা ছাড়া বাইরে বেরোনো প্ৰায় বন্ধই করে দিয়েছেন ।

নন্দনদের ওখান থেকে ফিরতে ফিরতে একটু দেরি হয় গেল। বাড়ি এসে তিনি হাতে পায়ে জল দিয়ে একধামা মুড়ি আর গুড় নিয়ে খেতে বসলেন। তখনই বাড়িতে ঢুকলো অতুলের বউ। এবাড়িতে খুব যাতায়াত আছে ওদের। বাড়িতে কলাটা, লাউটা যাই ফলুক,- না দিয়ে খায় না। নিজে এসে দিয়ে যায়। নয়তো মেয়েটার হাতে পাঠিয়ে দেয়।

অতুলের বউ উঠোনে পা দিতেই সুকোমলবাব বললেন– “কি গো বৌমা, আজ তোমার মেয়েকে সকালে শিউলিতলায় দেখলাম না যে, আজ বোধয় ফুল কুড়োতে আসেনি।”

অতুলের বউ উতলা হয়ে বলল- “গিয়েছিলো তো! আমি তো ওকেই খুঁজতে এলাম। সেই কোন ভোরে বেরিয়েছে এখনো বাড়ি ফেরেনি। ভাবলাম তোমাদের বাডিতে আছে তাই ডাকতে এলাম।”

অতুলের বউয়ের কথা শুনে রান্নাঘর থেকে সুকোমলবাবুর বউমা বেরিয়ে এলো, বললো– ” না, আমাদের বাড়িতে তো আসেনি। দেখোগে পাড়ায় কোথাও খেলতে লেগে গেছে।”

এবছরই ক্লাস নাইনে উঠেছে অতুলের মেয়েটা। নাম নয়না। খুব মিশুকে। সুকোমলবাবুর সঙ্গে খুব ভাব তার। দাদু-নাতনীর সম্পর্ক। দুজনের মধ্যে হাসি ঠাট্টাও হয়। এবাড়িতে কোন বাচ্চা না থাকায় সেই জায়গা অনেকটা নিয়েছে নয়না।

অতুলের বউ মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়ে গেলো। সুকোমলবাবুও স্নানের জন্য গায়ে তেল মাখতে বসে গেলেন। তারপর সারাদিন কেটে গেছে। সকালের ঘটনাটা আর মাথায় আসেনি। সন্ধ্যেবেলা সৌরভ স্কুল থেকে ফিরে খবর দিলো অতুলের মেয়েটাকে নাকি খুঁজে পাওয়া যায়নি। সকাল থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে, কোথাও নেই। কথাটা সুকোমলবাবু যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না। সকালে ভেবেছিলেন, ঐটুকু মেয়ে কোথায় আর যাবে, বেলা হলে ঠিক ফিরে আসবে। কিন্তু এখনো পাওয়া যায়নি। শুনে শঙ্কায় ভেতরটা কেঁপে উঠলো। বললেন– “ওরা আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে ভালো করে খোঁজ নিয়েছে তো?”

সৌরভ। বলল- “সব নেওয়া হয়ে গেছে। আমি এখন বেরোচ্ছি, থানায় যেতে হবে একবার। যা দিনকাল পড়েছে তাতে কী থেকে কী হয় কিছুই বলা যায় না। থানায় জানিয়ে রাখা ভালো।”

সৌরভ তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। সুকোমলবাবু ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন সদর দরজায়।

তিন

যখন থেকে শিউলি ফুটতে শুরু করেছে রোজ ভোরে দেখা হয় নয়নার সঙ্গে। সুকোমলবাবু হাঁটতে বেরোন আর নয়না শিউলিতলায় আসে ফুল কুড়োতে। সাজি ভর্তি করে ফুল কুড়িয়ে নিয়ে যায়। সুকোমলবাবু মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করেন– ‘রোজ এত ফুল তুই কার জন্য নিয়ে যাস বলতো?’

নয়নাও তেমনি উত্তর দেয়- “কেন, আমার ঠাকুরের জন্য।”
সুকোমলবাবু বলেন- “কে তোর ঠাকুর, কী নাম শুনি তার?”
দাদুর কথায় নয়না লজ্জা পেয়ে যায়। কপট রাগ দেখিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে।

রাত দশটা বেজে গেল। সৌরভ তখনও বাড়ি ফেরেনি। সুকোমলবাবু অস্থির হয়ে উঠেছেন। অতুলের বউয়ের কথা মনে পড়তেই মনটা আরো ভারী হয়ে গেল, হতভাগী বোধহয় কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। ঘড়ি দেখলেন, রাত এগারোটা। থানায় কী হল, কিছু একটা খবর না পেলে তিনি স্বস্তি পাচ্ছেন না। আজ সকালে নয়নার সঙ্গে শিউলিতলায় দেখা হয়নি। তার মানে আজ এদিকে ও আসেনি। মেয়েটা তাহলে গেলো কোথায়?

রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ সৌরভ। বাড়ি ফিরলো। সুকোমলবাবু ব্যাস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন– “কিরে, পুলিশ কী বলল? কোনো খোঁজ পাওয়া গেল মেয়েটার?”

সৌরভকে খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। সারাদিন স্কুল করার পর রাতে আবার এই থানা পুলিশ। খুব ধকল গেছে। বলল – “একটা ডায়েরি করা হয়েছে, পুলিশ খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। বিএসএফ-কেও জানানো হয়েছে ব্যাপারটা। ওরাও খোঁজ করছে।”

–“পাওয়া যাবে তো মেয়েটাকে?”
–” দেখা যাক কাল সকালে কী হয়।” এই বলে সৌরভ ঘরে চলে গেল।

পরদিন চারটের আগেই ঘুম ভেঙে গেল সুকোমলবাবুর। ভোরের আলো ফোটেনি। চারিদিক তখনো অন্ধকার। একটু আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়লেন। বাইরে আসতেই রাস্তার উল্টোদিকের শিউলি গাছদুটির দিকে চোখ গেল। তলাটা আজও ফুলে ফুলে ভরে আছে। বাতাসে ফুলের গন্ধ। দাঁড়িয়ে পড়লেন সুকোমলবাবু। গত পরশুও মেয়েটার সঙ্গে এখানে দেখা হয়েছিল। তিনি যখন যাচ্ছিলেন নয়না তখন সাজি ভর্তি ফুল নিয়ে রাস্তায় উঠছিল। তিনি হাঁক দিয়ে বলেছিলেন- “কিরে মেয়ে, এত ভোরে ফুল কুড়োতে আসিস তোর ভয় করে না?”

নয়না মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিল- “কেন, আমি তো জানি তুমি এখান দিয়েই যাবে, তাই ভয় করে না।”

সত্যিই তো সুকোমলবাবু রোজ এই সময় এখান দিয়েই যান, আজও যাচ্ছেন। চারিদিকের সবকিছু যেমন থাকার কথা তেমনি আছে, নেই কেবল নয়না। ভিতরটা যেন কুঁকড়ে উঠলো। মনে হচ্ছে নয়না হারিয়ে যায়নি, ওর কিছু হয়নি। কোথাও যেন সে লুকিয়ে আছে, এক্ষুনি হয়তো হাসতে হাসতে এসে বলবে, …. “দাদু, কেমন চমকে দিলাম সবাইকে!”

সুকোমলবাবু হাঁটতে হাঁটতে কখন বিএসএফ ক্যাম্প ছাড়িয়ে চলে এসেছেন। খেয়ালই করেননি। এতদূর সাধারণত তিনি আসেন না। এদিকটায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ এখনো শেষ হয়নি। খোলা বর্ডার। আধ কিলোমিটার বা তারও দূরে দূরে একজন করে বিএসএফ দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কাঁটাতার বরাবর। রাস্তা থেকে বাঁ দিকে নেমে কিছুটা এগিয়ে গেলেই বাংলাদেশের সীমানা। সুকোমলবাবু সেদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। সামনের ধানখেত সবুজ হয়ে আছে। সুকোমলবাবুর মনে নানা ভাবনা ঘুরপাক খেতে লাগলো। সারাবছর ধরে গ্রামের কত মানুষ এখানে চাষ করে। কিন্তু সেই ফসল ঘরে উঠবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা থাকে না। ধান পাকতে শুরু করলেই ওপার থেকে বাংলাদেশীরা এসে রাতের অন্ধকারে কেটে নিয়ে যায়। গোরু পাচারের মত আপদ তো আছেই। কিন্তু তাই বলে গ্রামের কেউ জমি পতিত রাখে না। চাষিরা আশায় আশায় প্রতিবছর চাষ করে। তারপর লুঠ হয়ে যায় ফসল। বছরের পর বছর ধরে চলছে এই পরিহাস।

ফেরার সময় সুকোমলবাবু একবার অতুলদের বাড়িতে ঢুঁ দিলেন। অতুলের বউ দাওয়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছে। কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলে গেছে, সারারাত ঘুমোয়নি। অতুল বাড়িতে নেই, গ্রাম পঞ্চায়েতের কাছে গেছে। সুকোমলবাবুকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো বউটা। সুকোমলবাবু সাস্তুনা দিয়ে বললেন– ‘কেঁদো না, ঠিক পাওয়া যাবে ওকে।”

এই প্ৰবোধাটুকু ছাড়া কি’ই বলবেন। যতক্ষন না একটা সূত্র পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষন তো কিছুই করা যাচ্ছে না|

অতুলদের বাড়ি থেকে তিনি বেরিয়ে এলেন। রাস্তার মোড়ে কয়েকটা ছেলে-ছোকরা নয়নাকে নিয়েই কথা বলছিল। সুকোমলবাবু ওদেরকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।

গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে অতুলকে নিয়ে সকালেই থানায় চলে গেছিল সৌরভ। একটু বেলায় এসে খবর দিলো- “নয়নার এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ কোন হদিশ করতে পারছে না। তবে ওদের অনুমান, নয়না আর এপারে নেই। সম্ভবত কাঁটাতারের ওপার থেকে কেউ ওকে তুলে নিয়ে গেছে।”

খবরটা শুনে বুকে যেন শেল বিঁধল সুকোমলবাবুর। চেয়ারে যেমন বসে ছিলেন তেমনি নিশ্চলভাবে বসে রইলেন।

চার

একবছর হয়ে গেল নয়না নিখোঁজ হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন কেউ কিছু করতে পারেনি। গ্রামের লোকেরাও ধীরে ধীরে ঘটনাটি ভুলে যেতে শুরু করছে। শুধু হতভাগী অতুলের বউটা এখনো রোজ কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়। কোন কোনও দিন বর্ডারের কাছে গিয়ে কাঁটাতারের ওপারে আপলক চোখে তাকিয়ে থাকে। সবাই বলে পাগলী হয়েছে অতুলের বউ। শিউলি গাছদুটিকে দেখলে নয়নার কথা মনে পরে সুকোমলবাবুর। গাছদুটি যেন নয়নার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলে- “নয়না নেই, নয়না নেই। ও হারিয়ে গেছে।”

অনেক রাতে একদিন সৌরভ সুকোমলবাবুর ঘরে এলো। ওর মুখটা কেমন অসহায় মনে হচ্ছিল। ধীর পায়ে বাবার পশে এসে বসল। বলল– “আমাদের আর এখানে থাকা উচিত হবে না বাবা। গ্রামের পরিবেশ পালটে যাচ্ছে। দেবীর থানে পুজোও হচ্ছে না এবার। একে একে সব বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা এখানে কী নিয়ে থাকবো বাবা।”

কষ্টে সৌরভের গলা বুজে আসছে। একটু থেমে ধরা গলায় বলল- “ঘরে যে নতুন অতিথি আসছে তার কথাও তো ভাবতে হবে?”

সুকোমলবাবুর দুচোখ জলে ঝাপসা হয়ে এলো। ফুটে উঠলো ছোটবেলার সেই রাতের স্মৃতি। যে রাতে তারা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সুকোমলবাবুর বয়স তখন বারো বছর। রংপুরের বাড়িতে অনেক রাতে একটি মিটিং থেকে ফিরে ছোটকাকা বলল– “অবস্থা ভালো না । আমরা ইন্ডিয়ায় চইলা যাই।”

সেই রাতেই তারা বেরিয়ে পড়েছিল। তারপর এদেশে এসে আবার নতুন বাড়ি, আবার বাঁচার নতুন স্বপ্ন।

সুকোমলবাবু ছলছল চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন–“ছোটবেলায় একদিন এভাবেই নিজের গ্রাম, নিজের বাড়ি সব ছেড়ে আমরা এদেশে এসেছিলাম। আজ আবার তুই আমায় কোন দেশে নিয়ে যেতে চাস?”

এরপর সৌরভ। আর বেশিদিন সময় নেয়নি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সব বিক্রিবাটা করে শহরে উঠে যাওয়ার পাকা বন্দোবস্ত করে ফেললো। সুকোমলবাবুও নিজের মনকে শক্ত করলেন। দ্বিতীয়বার আপন ভিটে ছাড়ার জন্য।

যাওয়ার দিন ঠিক করাই ছিল। সৌরভ সেদিন একটি গাড়ি ভাড়া করেছে মালপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য। ভোর থেকে সব জিনিসপত্র গাড়িতে তোলা হচ্ছে। এতদিনের সকালে হাঁটার অভ্যাসটা সুকমলবাবুর মাজ্জায় লেগে গিয়েছিল। অনেকদিন পর তার ব্যতিক্রম হল। আজ সকালে হাঁটতে বেরোনোর বদলে তিনি বাড়ির সকলের সাথে চললেন নতুন এক ঠিকানায়। পুব আকাশে সূর্য উঠেছে। হর্ন বাজাতে বাজাতে গাড়িটি অতুলদের বাড়ির সমানে দিয়ে বেরিয়ে গেল। অতুল তখন কচি আমডাল দিয়ে দাঁতন করছিল, দাঁতন করা থামিয়ে দিয়ে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো শহরের দিকে ছুটে চলা সুকোমলবাবুদের সেই গাড়িটির দিকে। আর গাড়ি থেকে সুকোমলবাবু শুনতে পেলেন মেয়ের জন্য পাগলী হওয়া অতুলের বউয়ের সেই বুকফাটা কান্না।

– তবুও’তো অতুলের বউয়ের কান্না কেউ শুনতে পেল, কিন্তু সুকোমলবাবুর’টা …??

লেখকঃ শ্রী বিরাজ নারায়ণ রায়
সঙ্কলনেঃ শ্রী Saunak Roy Chowdhury ….