#জাত্যাভিমান

এমিলি আজ বক্তৃতা দেবে । এই কথা ভেবে সে রোমাঞ্চিত হচ্ছে।  কৃষ্ণমোহন আয়োজন করেছেন ।সে বলবে নারীদের পড়াশোনা করার কথা ।

বিধবা বক্তৃতা দেবে ।এমিলি বাল্য বিধবা ছিল।যতই ছোটখাটো সমাবেশ হোক না কেন ,কলকাতায় হুলুস্থুলুস পড়ে গেল ।

বিদ্যাসাগর মশাই জেনেছেন কিন্তু তিনি আসবেন না । কারণ বিদ্যাসাগর আধুনিক এবং  হিন্দু ধর্মকে সমর্থন করেন। ধর্মান্তর কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না । রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন কে তিনি অপছন্দ করেন । কৃষ্ণ মোহন কে এ বিষয়ে কেবলমাত্র একজন পোস্টম্যান সাহায্য করেছে। সে গিয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বাড়িতে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিয়েছে।

গণ্যমান্য ব্যক্তিরা কেউ এলেন না । এল কিছু অল্প বয়সী মেয়ে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই বাল্যবিধবা।এমিলি ওদের দেখে ভাবল শুকনো বক্তৃতা দিয়ে কিছু হবে না। বরং সে আলাপ শুরু করলো ।
এমিলি মিষ্টি করে জিজ্ঞাসা করল “তোমার নাম কি বোন ? “

কদমছাঁট চুলের মেয়েটি খুব ম্লান মুখে বলল , সরমা। দুর্বল মেয়েটি ভাল করে খাবার জোটে না

এমিলি জিজ্ঞেস করল , “বিধবাদের আচার তুমি পালন কর?”
সরমা বললো , “হ্যা করি।।”

এমিলি জিজ্ঞেস করল, “সেসব বিধবা আচার পালন  করতে তোমার ভালো লাগে !”

সরমা বলল,” না ভালো লাগে না ।”

এর মধ্যে এমিলি রাজা রাধাকান্ত দেব এর পালিত কন্যা টিকে খুঁজলো।
কোথাও পেল না । কোথাও নেই সে ।রাজা তাকে আসতে দেননি।

এমিলি জিজ্ঞেস করল, ” তুমি বিয়ে করতে চাও?”

সরমা উত্তর দিল ,”না ।”

এমিলি জিজ্ঞেস করল “কেন ? তোমার ধর্মের ভয় ?”

সরমা উত্তর দিল ” আমার কোন ধর্মের ভয় নেই ।আমি পুরুষ কে ঘৃণা করি। আমি স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই ।”

এমিলি বলল , “আমরা যদি একটি আশ্রম বানাই খুব কাজ করতে হবে কিন্তু তোমায়।”

সরমা গম্ভীর ভাবে বলল, ” আমার কাজ করতে কোন আপত্তি নেই ।

এমিলি তখন অন্যান্যদের বলল , “তোমরা করবে তো ?”

প্রায় সকলে সমস্বরে বলে উঠল ,
“সব কাজ করবো, স্বাধীনভাবে বাঁচবো ,কিন্তু হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করব না । খেরেস্টান হবো না।”

“হিন্দু ধর্মে থেকে তোমরা কি করতে পারবে ?কিছু কি করতে পারবে? এছাড়া তোমাদের যাবতীয় খরচা চার্চ করবে।”

সকলে সংশয় দীর্ণ হয়ে যাচ্ছে ।

এত কষ্ট ,এত পিরন ,এর মধ্যেও ধর্ম যেন তাদের একমাত্র রক্ষাকবচ ।

কৃষ্ণমোহন বললেন, ”  তোমাদের মধ্যে বামুন কেউ আছে?”

সরমা বলল” না আমরা সবাই অব্রাহ্মণ ।”
কৃষ্ণমোহন বললেন, ” তবে তোমাদের দ্বিধা কেন? চলে এসো ।এমনিতেই আমাদের সভায় এসেছ বলে সংসার তোমাদের ফেরত নেবে না ।”

তখন সবাই তেড়ে উঠলো। কেউ কেউ মারতেও গেল ।

এমিলি আকুল হয়েও বলল , “তোমরা সব  জেনে এসেছো …..এখানে লেখাপড়া শিখবে। বিয়ে করতে চাইলে নতুন ধর্মে কোন বাধা নেই ।সব মানুষের এখানে সমান অধিকার ।প্রভুর কাছে নিচু জাত বলতে কেউ নেই ।”

সরমা বলল , “তবে আমরা খ্রিস্টান ও হব না। শুদ্ধ হবো না ।কারণ আমরা হিন্দু। আমরা জন্মগত শুদ্ধ ।”

খানিকটা অবাক হয়ে গেল এমিলি। কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না …..অনেকক্ষণ পর কৃষ্ণ মোহন বললো, ” আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি তোমাদের খ্রিস্টান হতে হবে না ।তোমাদের শুদ্ধ হতে হবে না। তোমরা  হিন্দু থেকে নতুনভাবে করে জীবন শুরু করবে।”

তথ্যঃ

ধর্মান্তর :অভিজিৎ চৌধুরী