চোখের সামনে নেহরুর ভারত থেকে দেশটা নরেন্দ্র মোদীর ভারত হয়ে গেলঃ –
( জ্বালা ধরল আনন্দবাজারের পিছনে, …) 

[  সবার পড়া উচিৎ। … জানা উচিৎ, ..  তীব্র হিন্দু বিদ্বেষী আনন্দ বাজার পত্রিকার প্রকৃত মুসলমান চরিত্র’টি । … অবিলম্বে বয়কট করা উচিৎ … এমন একটি নোংরা সংবাদ মাধ্যমকে ..!!] 

এক দিকে উন্নয়ন, অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষতা— এই উভমুখী আধুনিকতা চরিত্রে ভারতীয় নয় কোনও মতেই। কিন্তু, নেহরুর মৃত্যুর পরও পঞ্চাশ বছর ভারতীয় রাষ্ট্র এই আধুনিকতার অভিজ্ঞান বজায় রেখে চলেছিল।
( লিখেছেনঃ অমিতাভ গুপ্ত )

স্বাধীন ভারতে যে মুসলমানরা থেকে গেলেন, এই দেশের প্রতি আনুগত্য প্রমাণের দায় তাঁদেরই।’ কথাটি যিনি বলেছিলেন, নর্মদা বাঁধের তীরে তাঁর প্রায় ৬০০ ফুট লম্বা মূর্তি তৈরি করছেন নরেন্দ্র মোদী। ২০১৪ সালের আগে অবধি মুসলমানদের সেই দায় নিতে হয়নি— অন্তত রাষ্ট্র তাঁদের কাছে তেমন দাবি করেনি। জওহরলাল নেহরুর ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে সংখ্যালঘুদের সেই দায় থেকে রক্ষা করে গিয়েছে। সর্দার পটেল যে সময় মুসলমানদের আনুগত্যের প্রমাণ দাবি করার কথা বলেছিলেন, ঠিক সেই সময়ই নেহরু বলেছিলেন, ‘সংখ্যালঘুদের প্রতি শুধু সমদর্শী হলেই চলবে না, তাঁরা যাতে সেটা অনুভব করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাও সরকারেরই দায়িত্ব।’ অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দাবি ওঠার পর বলেছিলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যা করতে পারে, সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে তা পারে না— তারা সংখ্যালঘু বলেই পারে না।’

যে সময় নেহরু সংখ্যালঘুদের প্রতি বিশেষ যত্নের কথা বলছেন, ঠিক তখন ভারত দাঁড়িয়ে ছিল এক বিচিত্র সন্ধিক্ষণে। পূর্ব-পশ্চিমে রক্তক্ষয়ী বাঁটোয়ারা পেরিয়ে যে দেশ তৈরি হল, তার ভূগোল র‌্যাডক্লিফের ছুরির ডগায় তৈরি। কিন্তু, শুধু ভূগোলই তো দেশ তৈরি করে না। তার জন্য গুজরাতের সঙ্গে অসমকে, পঞ্জাবের সঙ্গে তামিলনাড়ুকে কোনও একটা বিশেষ— একক— সুতোয় বাঁধতে হয়, একটা একক পরিচিতি তৈরি করতে হয়। ইতিহাসের এই মুহূর্তটায় সেই ভারতের সেই একক পরিচয়ের মধ্যে হিন্দুত্ব ঢুকে পড়তে পারত অবলীলায়।

ইতিহাসের আলোচনা কাউন্টারফ্যাকচুয়ালকে এড়িয়ে চলে— কী হলে কী ঘটতে পারত, সেই চর্চা তার স্বভাববিরুদ্ধ। খবরের কাগজের লেখায় সেই দায় নেই। অএতব, ভাবা যেতেই পারে, সর্দার পটেলের নরম হিন্দুত্ববাদের পথে যদি হাঁটতেন নেহরু, কী হত? ঘরে-বাইরে অনেক বাধা অনায়াসেই এড়িয়ে যেতে পারতেন তিনি। যে উন্নয়নের পথে ভারতকে চালাতে চেয়েছিলেন, তাতে হয়তো আরও বেশি সমর্থন পেতেন। পাকিস্তানের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ‘হিন্দুস্তান’ নির্মাণের প্রকল্পটি নেহরু নিলে হয়তো কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের পায়ের তলার জমিও কেড়ে নিতে পারতেন তিনি। শুধু যদি তাঁর হাত ধরে ভারতীয় রাষ্ট্রের পরিচয়ে হিন্দুত্ব ঢুকে পড়ত।

সেই ঢুকে পড়ার চেহারা আমরা আজ বিলক্ষণ জানি। গুজরাতের দলিতরা জানেন, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে হিন্দুত্ব ঢুকে পড়লে ‘গোহত্যার অপরাধে’ কী ভাবে প্রহৃত হতে হয় গৌরক্ষা বাহিনীর লেঠেলদের হাতে। তারও আগে, দাদরিতে মহম্মদ আখলাক গণপিটুনিতে মারা গিয়ে, তামিলনাড়ুতে পেরুমল মুরুগান নিজের লেখকসত্তার মৃত্যু ঘোষণা করে, কর্নাটকে এম এম কালবুর্গি বুকে বুলেট নিয়ে নিহত হয়ে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কানহাইয়া কুমার হাজতে দিন কাটিয়ে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষায় কথা বলতে আরম্ভ করলে কী হয়, কী হতে পারে। আক্রান্ত চার্চগুলো জানে, মুখে কালি মাখিয়ে দেওয়া সুধীন্দ্র কুলকার্নি জানেন, মুম্বইতে গান গাইতে না পারা গুলাম আলি জানেন, রাষ্ট্রীয় পরিচিতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বিদায় নিলে দেশটার চেহারা ঠিক কেমন হতে পারে।

চোখের সামনে ভারত বদলে গেল। নেহরুর ভারত থেকে দেশটা নরেন্দ্র মোদীর ভারত হয়ে গেলঃ

ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে নেহরুর সামনে ভারতের সংজ্ঞা তৈরি করার কথা বলছিলাম। নেহরুরও একটা অভিন্ন সুতোর প্রয়োজন ছিল, গোটা দেশকে গেঁথে ফেলার জন্য। তাঁর রেটোরিকে— রাজনৈতিক বয়ানে— সেই সুতো ছিল উন্নয়ন। আধুনিকতা যাকে ‘উন্নয়ন’ বলে চিহ্নিত করে, সেই উন্নয়ন। আর, তার উল্টো পিঠে ছিল তাঁর অন্য কর্মসূচি— ধর্মনিরপেক্ষতা। বস্তুত, ধর্মহীনতা। রাষ্ট্রের পরিসরে কোথাও ধর্মকে সূচ্যগ্র জমিটুকু না ছাড়া। তাঁর বয়ানে উন্নয়ন যতখানি ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতা ততখানি নয়। কিন্তু, কর্মসূচিতে সম্ভবত অনুপাতটা উল্টো ছিল।

এক দিকে উন্নয়ন, আর অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষতা— এই উভমুখী আধুনিকতা চরিত্রে ভারতীয় নয় কোনও মতেই। নেহরু নিজেও তো শিক্ষায়, মননে ভারতীয় ছিলেন না। কিন্তু, কী আশ্চর্য, ১৯৬৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পরও পঞ্চাশ বছর ভারতীয় রাষ্ট্র এই আধুনিকতার অভিজ্ঞান বজায় রেখে চলল। যিনিই প্রধানমন্ত্রী হোন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, ভারতে নেহরু যুগের উত্তরাধিকার বজায় ছিল।

অটলবিহারী বাজপায়ীর আমলেও। ২০০২ সালে গুজরাতে গণহত্যা হয়েছিল, বাজপায়ী রাজধর্মের কথা বললেও নরেন্দ্র মোদীকে বরখাস্ত করতে পারেননি, সবই ঠিক— কিন্তু, সেই দাঙ্গা, অথবা ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়া, ভারতে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গণ্য হয়নি। যেমন, ২০১৫ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে পেরুমল মুরুগনের হেনস্থা হওয়া, প্রশাসন, রাজনীতি অথবা সমাজের তাঁর পাশে দাঁড়াতে অস্বীকার করা যেমন ‘স্বাভাবিক’ বোধ হয়, ২০০৬ সালে মকবুল ফিদা হুসেনের ভারত ছাড়তে বাধ্য হওয়া ততখানি ‘স্বাভাবিক’ ছিল না।

স্বাভাবিকতার বোধ বেমালুম বদলে গেল? নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেন, আর দেশের একশো পঁচিশ কোটি মানুষ রাতারাতি ধর্মনিরপেক্ষ থেকে তীব্র সাম্প্রদায়িক হয়ে গেলেন? বাবরি মসজিদ সাক্ষী, দেশের সব প্রান্ত থেকে— পশ্চিমবঙ্গ থেকেও— রাজ্যের নাম লেখা ইঁট পৌঁছেছিল অযোধ্যায়, রাম মন্দির তৈরি করার জন্য। তখন নরেন্দ্র মোদী গুজরাতের এক সামান্য সঙ্ঘসেবক। ভারতীয় হিন্দুরা নরেন্দ্র মোদীর কারণে সাম্প্রদায়িক হননি, সাম্প্রদায়িকতা তাঁদের মধ্যে ছিলই। শুধু, ২০১৪ সালের মে মাসে নরেন্দ্র মোদী যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, তখন তাঁরা দেখলেন, এক বিপুল গণহত্যার দায় মাথায় নিয়েও প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায়। ২০১৪ সালের মে মাসেই ভারত জানল, সাম্প্রদায়িক হওয়ার মধ্যে আর লজ্জা নেই। এই ভারত আর নেহরুর নয়। এই ভারত, অতঃপর, মোদীর।

নেহরুর রেটোরিকে যেমন উন্নয়ন ছিল, মোদীরও বিলক্ষণ আছে। নেহরুর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা থাকলে মোদীর মেক ইন ইন্ডিয়া আছে। নেহরু নদীবাঁধকে আধুনিক ভারতের মন্দির হিসেবে দেখলে মোদীও স্মার্ট সিটি-র কথা বলেছেন। ফারাক রেটোরিকে নয়, ফারাক আজেন্ডায়— কর্মসূচিতে। কোন ভারতকে তাঁরা উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে চান, ফারাক সেই ভাবনায়। নেহরু যে ভারতকে উন্নয়নের সুতোয় বাঁধতে চেয়েছিলেন, তাকে ধর্মনিরপেক্ষ হতেই হত। মোদীর ভারত হিন্দু জাতীয়তাবাদের, যেখানে ‘ভারতমাতা’ আরাধ্যা, গো-মাতাও। সেখানে ভারতীয়ত্বের সঙ্গে হিন্দুত্বের সংযোগ অচ্ছেদ্য। নেহরু দেশের সংজ্ঞায় ধর্মকে তিলমাত্র জায়গা দেননি, আর মোদী দেশের ধারণাটিকেই মুড়ে দিয়েছেন গৈরিক পতাকায়।

আজীবন সঙ্ঘের পাঠশালার ছাত্রের পক্ষে নেহরুর আধুনিকতার মাপ বোঝা কার্যত অসম্ভব। নরেন্দ্র মোদীও পারেননি। চেষ্টাও করেননি। সঙ্ঘ যে ভাবে ভারতকে ভেবেছে, গোলওয়ালকর তাঁর ‘উই অ্যান্ড আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’-এ ভারতের যে ছবি এঁকেছেন, নরেন্দ্র মোদীর মনেও সেই ভারতেরই অধিষ্ঠান। সেই ছবিতে ভারতীয় মানে হিন্দু, বা অন্তত হিন্দুর আধিপত্য মেনে নেওয়া সংখ্যালঘু। হিন্দুত্বের আধিপত্যকে প্রশ্ন করা মানে, অথবা হিন্দু ভারতের চোখে যা না-হক, তার পক্ষে কথা বলা মানেই ভারত নামক রাষ্ট্রের বিরোধিতা। কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদরা যে অঙ্কে ভারত-বিদ্বেষী।
হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার এই চেষ্টা অবশ্য সহজে চোখে পড়ে। যা প্রায়শ চোখ এড়িয়ে যায়, তা হল, এই হিন্দুত্ববাদকেই ‘স্বাভাবিক’ করে তোলার চেষ্টা। মাসখানেক আগে মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফডণবীস একটা প্রশ্ন করেছিলেন— ‘ভারতে থাকলে ‘ভারতমাতার জয়’ বলতে আপত্তি কোথায়?’ আপত্তি ঠিক কোথায়, ভেঙে বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়। আদৌ কারও নামে জয়ধ্বনি দেব কেন, এই প্রশ্ন তুললেও বলতে হয় অনেক কিছু। তত কথা বলার সময় প্রশ্নকর্তারা দেন না। তার আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, যারা ভারতমাতার জয় বলতে পারে না, তারা নিতান্ত দেশদ্রোহী— যেন ভারতমাতার জয়ধ্বনি করাটাই ভারতীয়দের ‘স্বাভাবিক’ কাজ। দেশ জিনিসটা যে ভারতমাতার চেয়ে মাপে বড়, সে কথা বলার আর অবকাশই থাকে না।

বলতেই পারেন, এর কোনও কথাই নরেন্দ্র মোদীর নয়। কোনও কথা যোগী আদিত্যনাথের, কোনও কথা গিরিরাজ কিশোরের, কোনওটা স্মৃতি ইরানি, কোনওটা রাজনাথ সিংহ আর কোনওটা দিলীপ ঘোষের। তার দায় নরেন্দ্র মোদী নেবেন কেন? একটা বহু পুরনো ছবির কথা মনে করিয়ে দিই। ১৯৪৭ সালের অগস্ট-সেপ্টম্বর। দিল্লি ভরে উঠেছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুতে, হাওয়ায় ভাসছে অজস্র হাড় হিম করা নৃশংসতার গল্প। এক দিন, নেহরুর বাসভবনের কাছেই, কয়েক জন মুসলমানকে ধরে ফেলল এক দল হিন্দু। হয়তো মেরেই ফেলত, কিন্তু তার আগেই খবর পেয়ে ছুটে এলেন জওহরলাল। তাড়া করলেন সেই হিন্দুদের। তারা পালাল। এই আখ্যানের পাশে দাদরি হত্যাকাণ্ডের পর মোদীর নিস্পৃহ নীরবতার কথা স্মরণ করুন। কেন মোদীকে দায় নিতেই হবে, বোঝা যাবে।

নেহরুর ভারতের মৃত্যুতে কেন আমাদের সবার শোকাহত হওয়া উচিত, সেটা বুঝতেও যেমন সমস্যা নেই।

http://www.anandabazar.com/editorial/from-nehru-to-modi-india-s-reformation-1.439002