বিবেকানন্দের চোখে ইসলাম /দেবাশিস লাহা

নবম শ্রেণির শেষভাগে যখন বামপন্থী [নির্দিষ্ট করে বললে নকশালপন্থী রাজনীতি,যাকে অতি বাম বলে চিহ্নিত করা হয়]  রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি, স্বামী বিবেকানন্দ অধ্যয়নের ইচ্ছে তখন থেকেই। মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজ তত্ত্ব তথা অর্থনৈতিক ভিত্তি/ উৎপাদন সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে পড়াশোনা করার সময়ই এদেশের মাটিতে লালিত এই ব্যতিক্রমী মানুষটিকে জানবার বোঝবার আগ্রহ তৈরি হয়, যা একান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে, চারু মজুমদারের দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি যত অনায়াসে পৌঁছতে পারে, বিবেকানন্দ ততটা সহজ নয়। জমি বাড়ি এক্সচেঞ্জ করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে পালিয়ে আসা পিতামহের কাছে কিছু বইয়ের সম্ভার ছিল বটে, কিন্তু তাতে বিবেকানন্দের উপর তেমন কিছু ছিলনা। কারণ জানতে চাইলে সেই পূর্বপুরুষটি বড় অসহায় বোধ করতেন।
তুই যদি জানতি, কত কিছু ফেলে আসতে হয়েছে ! কত বই ছিল আমার ! নিজের জন্য একটা লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু মানুষের প্রাণই যখন রাস্তাঘাটে লাশ হয়ে পড়ে থাকে, সেখানে বইয়ের খবর কে রাখে বলত ?

কথা বাড়াইনি। অগত্যা সেই কমরেড দাদারা।[ তারা অবশ্য পরে রেট পরিবর্তন করে বিবিধ ডিগবাজি খেতে খেতে মালদার হয়ে উঠেছেন, ব্যতিকম বাদ দিয়ে]। কিন্তু তাঁরাও হতাশ করলেন। একজন বললেন ওসব ছাইপাঁশ পড়ে কি হবে ? কাজের বই পড়। আর একজন বললেন উনি তো শ্রেণি সংগ্রামে বিশ্বাস করতেন না, সেই গাঁজাখুরি শ্রেণি সমন্বয়ের গপ্প ঝেড়ে গেছেন। বেদ বেদান্ত, হঠ যোগ, রাজ যোগ, কুমারী পূজা যতসব মধ্যযুগীয় ব্যাপার স্যাপার। আমিই তোকে জিস্ট বলে দিচ্ছি। ওসব বই পত্র পড়ে মগজ নষ্ট না করে সর্বহারার মুক্তি আর মহান নভেম্বর বিপ্লবের উপর বেশ কিছু বই এনেছি সেগুলো পড়। এই বলে তিনি আমার হাতে জন রিড, ক্রিস্টোফার কর্ডয়েল, মাও সে তুং, লিন পিয়াও ইত্যাদি ধরিয়ে দিলেন। আর কি ! এদের সাথেই আমার দিন রাত্তির কাটতে লাগল। এইভাবে চলতে চলতে একদিন লেনিনের Imperialism, the Highest Stage of Capitalism   থেকে এঙ্গেলস-এর Anti-Dühring   পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। তখন আর যাই হোক বাম জমানা, সোভিয়েত জমানার দৌলতে প্রগ্রেস পাবলশার্স-এর বইয়ের রমরমা। এত সস্তায়, এত সুন্দর বাঁধাই, মহার্ঘ কাগজ ! অবাক হতাম। পরে বুঝেছিলাম মগজ ধোলাইয়ের কার্যক্রমে কিভাবে ওরা টাকা ঢালত। যাক সে কথা। শেষ আশ্রয় ছিলেন বাবা। কিন্তু তিনি অত্যন্ত রাশভারী, মিতভাষী ! সমীহ, ভয় দুটোই ছিল।বিনা অনুমতিতে তাঁর সংগ্রহে হাত দিতে দ্বিধা থাকবেই। বিশেষ করে যখন আঠেরোও পেরোইনি। দেখতে দেখতে উচ্চমাধ্যমিক চলে এল।  একদিন বলেই বসলাম।যথারীতি তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। আপিস থেকে ফিরে আলমারি খুললেন একটি বই বার করলেন এবং হাতে ধরিয়ে দিলেন। চোখ বোলাতেই মনটা পাখি হয়ে গেল !  Life of Vivekananda and the Universal Gospel by Romain Rolland ! হ্যাঁ রোমা রলার সেই সুবিখ্যাত রচনা[ ততদিনে ওঁর নাম শুনেছি মাত্র, তেমন কিছু পড়া হয়নি] ইংরেজি বই দেখে অবাক হইনি, কারণ বাবার সংগ্রহে এই ভাষাটির আধিক্য ছিল, যদিও সংস্কৃত, বাংলা বইয়েরও অভাব ছিল না।

হ্যাঁ এক বিদেশী লেখকের হাত ধরেই আমার প্রকৃত বিবেকানন্দ চর্চা শুরু হল। [তার আগে সিলেবাসের টুকিটাকি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে যা পড়েছি]। সে যে কি অনুভব বোঝাতে পারব না। অদ্বৈত আশ্রম প্রকাশিত বইটি শুরুই হচ্ছে এক অনন্য ভূমিকা দিয়ে—Prelude –The Parivrajaka : Call of the earth to the wandering soul !
The great disciple whose task it was to take up the spiritual heritage of Ramkrishna and disseminate the grain of his thought throughout the world, was physically and morally his direct synthesis. ——He was energy personified, action was his message to man.—–He went so far in his aversion to passivity, whose secular yoke weighs on heavily on the patient bovine brow of the east as to say,
“Above all be strong, be manly ! I have respect for even for one who is wicked, so long he is manly and strong: for his strenght will make him some day give up his wickedness or even give up all work for selfish ends and will then eventually bring him into the truth.”
স্বামীজি হলেন সেই মহান শিষ্য যার কাজ ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করা এবং তাঁর ভাবনার আকরটিকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া। শারীরিক এবং নৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন তাঁর [শ্রীরামকৃষ্ণের ] প্রত্যক্ষ সমন্বয় এবং সংশ্লেষ। —তিনি [স্বামীজি] ছিলেন শক্তির প্রতীক, তাঁর বাণী ছিল কর্ম এবং কর্ম। নিষ্ক্রিয়তার প্রতি তাঁর সুতীব্র ঘৃণা তথা বিরাগ, এমন এক মহাপুরুষ যার প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ভারি জোয়ালটি  সহনশীল প্রাচ্যের গরুটির ঘাড়ে বেশ তীব্রভাবেই চেপে বসেছিল।
এই পর্যন্ত [লেখকের পর্যবেক্ষণ] অনুবাদ করে একটু থেমে যাওয়া ভাল।কারণ ভাল করে বুঝে না নিলে পরবর্তী অংশটি অধরা রয়ে যেতে পারে। লেখক রোমা রলা এখানে একটি সুগভীর পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। স্বামীজির চিন্তাভাবনাকে তুলনা করেছেন একটি ভারি জোয়ালের সঙ্গে। যারা গ্রামে বাস করেন, বা কৃষিকার্য সম্পর্কে কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা আছে, তাঁদের নিশ্চয় জোয়ালের অর্থ বোঝানোর দরকার নেই। তবু নগরায়নের যুগে সামান্য আলোকপাত না করলেই নয়। হাল টানার সময় গোরুর কাঁধে একটি কাঠের তৈরি বস্তু চাপিয়ে দেওয়া হয় যার মুখ্য কাজ হল প্রাণিদুটিকে একত্রিত রাখা, পরস্পরের কাছ থেকে যাতে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। এছাড়া নিয়ন্ত্রণ তথা পরিচালনের ক্ষেত্রেও এর অপরিসীম ভূমিকা।একেই জোয়াল বলা হয়। স্বামীজির যুগান্তকারী ভাবনাকে এই ভারি জোয়ালের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রাচ্যের গরু বলতে প্রথাগত নির্বীর্য, পুরুষকারবর্জিত নিরীহ, ক্লীব হিন্দুত্বকেই বোঝানো হয়েছে, এব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। patient bovine –এই  এপিথেট অর্থাৎ বিশেষণটির প্রয়োগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ !বলাই বাহুল্য পেশেন্ট অর্থাৎ ধৈর্যশীল, সহনশীল শব্দটি চূড়ান্ত নেতিবাচকভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। লেখক রোমা রলা কেন এমন একটি পর্যবেক্ষণ রাখলেন তা স্বামীজির উক্তিটি পড়লেই জলের মত সহজ হয়ে যাবে —-“সর্বোপরি শক্তিশালী হও, পুরুষকার অর্জন কর। আমি এমনকি দুষ্ট,দুরাত্মাকেও শ্রদ্ধা করি, যতক্ষণ সে শক্তিশালী এবং পুরুষালি থাকে; কারণ তার শক্তিই একদিন তাকে দুষ্টতা বর্জনে অনুপ্রাণিত করবে, এমনকি সংকীর্ণ স্বার্থ লাভের তাগিদে যে সব কাজ সে এতদিন করে এসেছে, সেই জগত থেকে তাকে ফিরিয়ে এনে সত্যের মাটিতে তাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে।”

হ্যাঁ, ইনিই হলেন বিবেকানন্দ। খোল করতালে হরি বোল হয়ে যাওয়া বাঙালী  তথা জাতপাত বিভাজনের মাধ্যমে নিজেকে হীনবল করে তোলা হিন্দুর যে এতে বদহজম হবে, তা বলাই বাহুল্য। হ্যাঁ আঠেরো ছুঁতে না ছুঁতেই আমি এমন এক মহা যোগীকে আবিষ্কার করে ফেললাম যিনি প্রথম পরকালের সাধনা, আত্মার মোক্ষলাভ, ফুল বেলপাতা, কাঁসর ঘন্টাকে মায়ের ভোগে পাঠিয়ে ইহকালকে শক্তিশালী এবং কর্মময় করে তোলার উপর জোর দিলেন। এই উক্তিটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণিধানযোগ্য বিষয়ের উপর আলোক পাত করা হয়েছে। দুষ্ট কিন্তু শক্তিশালী মানুষও শ্রদ্ধার পাত্র। এই শক্তি কোন শক্তি ? আত্মিক না দৈহিক ? অবশ্যই দৈহিক, কারণ দুষ্ট ব্যক্তির আত্মিক, আধ্যাত্মিক বল বিবেচ্য হয় না।  তিনি স্পষ্টতই শারীরিক তথা পেশী শক্তির কথা বলছেন যার অভাবে বাঙালী তথা ভারতীয় হিন্দুরা বার বার পরাজিত হয়েছে, এখনও হয়ে চলেছে। বিষয়টি কি বোধগম্য হল ? নিছক পেশী শক্তি নয়। আর একটি শক্তির কথাও তিনি বার বার বলেছেন। সেটি হল একতার শক্তি। যেটি না থাকলে বিচ্ছিন্ন পেশী শক্তি রণাঙ্গনেও কোনো কাজে আসেনা। আর এই কারণেই তাঁকে বার বার উচ্চারণ করতে হয়েছে—“ হে ভারত, ভুলিও না-নীচজাতি, মূর্খ,দরিদ্র,অজ্ঞ,মুচি,মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।
হে বীর সাহস অবলম্বন কর,সদর্পে বল-আমি ভারতবাসী,ভারতবাসী আমার ভাই।
বল-মূর্খ ভারতবাসী,দরিদ্র ভারতবাসী,ব্রাহ্মন ভারতবাসী,চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই।
সদর্পে ডাকিয়া বল,ভারতবাসী আমার ভাই,ভারতবাসী আমার প্রান,ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর,ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা,আমার যৌবনের উপবন,আমার বার্ধক্যের বারানসী।
বল ভাই- ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ।
ভারতের কল্যান, আমার কল্যান।“

কেন এই আহ্বান ? কেন এই সাহসী হয়ে ওঠার আবেদন ? কেন এই শরীর গঠন তথা দৈহিক শক্তির বিকাশের আহ্বান ? ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য ? নাকি অলিমপিকে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে যাতে ভারত বেশ কিছু স্বর্ণ এবং রৌপ্য পদক অর্জন করতে পারে ? কেনই বা তিনি বললেন না হিন্দু ভারতবাসী, মুসলিম ভারতবাসী, খৃষ্টান ভারতবাসী, শিয়া ভারতবাসী , সুন্নি ভারতবাসী ? কারণ তিনি তথাকথিত ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ছিলেন। কারণ তিনি জানতেন হিন্দুত্ব অর্থ কোনো সংকীর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম[ইংরেজিতে যাকে রিলিজন বলে] নয়। হিন্দুত্ব একটি বহতা নদী।একটি সংস্কৃতি, আইডেনটিটি। সে কাউকে ফেরায় না। ব্রাত্য করেনা।এভাবেই সে কয়েক হাজার বছর টিকে আছে। তবে তার বিবেকানন্দের দরকার হয়ে পড়ল কেন ? সবই যদি ঠিকঠাক চলছিল। না, সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল না। অজস্র কুসংস্কার, কুপ্রথা, জাতপাতের প্রভাবে হিন্দুত্ব ক্রমশ দুর্বল ও বিপন্ন হয়ে পড়ছিল। প্রথমে ইসলামি শাসনের নির্মম আঘাত, তারপর ব্রিটিশ শাসন। এই দুই ভিন্ন ধর্ম তথা সংস্কৃতির যাতাকলে পিষ্ট হয়ে হিন্দুরা ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়ছিল। ধর্মান্তরের সংখ্যা বেড়েই চলেছিল। হিন্দুরা বিশেষত বাঙ্গালীরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে রাতারাতি ইউরোপিয়ান বাবু বনে গিয়ে নিজের শেকড়টিকেই অস্বীকার করা শুরু করেছিল।এমতাবস্থায় নিছক আত্মার মুক্তির সাধনা, ফুল বেলপাতা কোনো কাজে আসবে না। প্রতিরোধ এবং প্রত্যাঘাত অত্যন্ত জরুরী। তাই তিনি ধর্মপরায়ণ কিন্তু দুর্বল মানুষের চেয়ে ধর্মহীন, নীতিহীন দুষ্টকে শ্রদ্ধার পাত্র বলে মনে করেছিলেন। কিঞ্চিৎ বুদ্ধি থাকলেই এর হেতুটি বুঝে নেওয়া যায়।এখানেই অন্যান্য সাধুবাবা, যোগী, মহারাজ, তান্ত্রিক ইত্যাদির সঙ্গে বিবেকানন্দের মূলগত ফারাক। ধ্যান, যোগ, তন্ত্র, মন্ত্র, ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞান দিয়েছেন, লিখেছেন, সাধনা করেছেন,এমন মানুষের অভাব এদেশে ছিল না, এখনও নেই। যার অভাব ছিল, তিনি এলেন, দেখলেন, চলেও গেলেন। কিন্তু যেমনটি চেয়েছিলেন তেমন করে জয় করতে পারলেন না।     

এই জন্যই কি স্বামীজি এমন এক হিন্দুত্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন যার মস্তিষ্ক হবে বেদ বেদান্ত, উপনিষদ আর দেহটি হবে ইসলাম ? হ্যাঁ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রোমা রলার বইটিতে স্বামীজির জীবন এবং বানী সম্পর্কিত বহু অমূল্য তথ্য থাকলেও মহম্মদ, ইসলাম তথা কোরআন সম্পর্কে তেমন কিছু সুসংবদ্ধ তথ্য পাইনি। সেখানে মূলত হিন্দু সংস্কৃতি তথা যাপনের বেশ কিছু নেতিবাচক দিক, কুসংস্কার, স্বামীজির ইউরোপ ভ্রমণ, শিকাগো বক্তৃতা, বিশ্ববীক্ষা ইত্যাদির উপরই জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে তার ব্যক্তিত্বের বিবিধ দিক এবং বৈশিষ্ট। বিবেকানন্দের কোরআন তথা ইসলাম ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হই অনেক পরে। যখন সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে কেবল অধ্যয়নে ব্যাপৃত হলাম। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ পর্বে। চমকে উঠেছিলাম বললে কম বলা হবে। মানুষটির প্রতি অনুরাগ আরও বেড়ে গিয়েছিল। এমন নির্মোহ বিশ্লেষণ আর বস্তুনিষ্ঠ বিচারশক্তির প্রয়োগ কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল। দেখে নেওয়া যাক তিনি এব্যাপারে কি কি পর্যবেক্ষণ রেখেছেন।
প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক ইসলাম তথা হজরত মহম্মদ সম্পর্কে তাঁর ইতিবাচক পর্যবেক্ষণগুলি কেমন। স্বামীজি অন্ধ ছিলেন না। একদেশদর্শী তো কখনই নয়। তাই নির্মোহ হতে তাঁর কোনো অসুবিধা হয়নি। এ রাজ্যে মানুষের মন পেতে এবং আবার ঘুরে দাঁড়াতে বাম্পন্থীরা বিবেকানন্দকে [অনিচ্ছা সত্ত্বেও] হাতিয়ার করতে চাইছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু সভা আলোচনা ইত্যাদি সম্পন্নও হয়েছে। তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা স্বামীজীর এই সব “ইতিবাচক” দৃষ্টিভঙ্গিকে খণ্ডিত আকারে তুলে ধরে ফায়দা তোলার মতলবে আছে। তারা তাঁদের মনের মত একটি “সেকুলার স্বামীজি” ডিজাইন করা শুরু করে দিয়েছেন। তাই এই পর্যবেক্ষণগুলি সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। বিশেষ করে আধুনিক সময়ের নিরিখে। নইলে কেবল বিভ্রান্তিই ছড়াবে না, অনেকেই ঘোলা জলে মাছ ধরবেন।
1.Mohammed by his life showed that amongst Mohammedans there should be perfect equality and brotherhood. There was no question of race, caste, creed, colour, or sex. The Sultan of Turkey may buy a Negro from the mart of Africa, and bring him in chains to Turkey; but should he become a Mohammedan and have sufficient merit and abilities, he might even marry the daughter of the Sultan. Compare this with the way in which the Negroes and the American Indians are treated in this country! And what do Hindus do? If one of your missionaries chance to touch the food of an orthodox person, he would throw it away. Notwithstanding our grand philosophy, you note our weakness in practice; but there You see the greatness of the Mohammedan beyond other races, showing itself in equality, perfect equality regardless of race or colour [ The Complete Works of Swami Vivekananda by Swami Vivekananda Volume 4, Lectures and Discourses]          
“মোহম্মদের তাঁর জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেছেন মুসলমানদের মধ্যে একটি চরম ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সাম্য থাকা উচিত। জাত, গোত্র,  বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে কোনো বৈষম্যে এই ধর্মে নেই। তুর্কির সুলতান আফ্রিকার বাজার থেকে একটি নিগ্রো কৃতদাস কিনে আনতে পারেন। কিন্তু সেও যদি মুসলমান হয়ে যায় এবং যোগ্যতা ও গুণের অধিকারী হয়, সে সুলতানের কন্যাকেও বিবাহ করার অধিকার পাবে। এবার এদেশে বসবাসকারী নিগ্রো বা অ্যামেরিকান ইণ্ডিয়ানদের পরিস্থিতির সঙ্গে এর তুলনা করে দেখুন।[এটি স্বামীজির একটি বক্তব্যের অংশ, যেটি ক্যালিফোর্ণিয়ার শেক্সপীয়র ক্লাবে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে প্রদান করেন,  আমেরিকানদের উদ্দেশ্য করেই এটি বলা] আর হিন্দুরা কি করে ? যদি আপনাদের দেশের কোন মিশনারি পাদ্রী কোনো গোঁড়া হিন্দুর খাদ্য স্পর্শ করে ফেলে, সে নিশ্চিতভাবেই সেটি ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আমাদের [হিন্দুদের] একটি মহান দর্শন থাকা সত্ত্বেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই দুর্বলতাকে অস্বীকার করা যায় না। আর দেখুন মোহম্মদের মহত্ত্ব ! বর্ণ, জাত পাত সব কিছুর উর্ধ্বে এক চরম সাম্য ! আছে এমন কোন ধর্ম ?”

হ্যাঁ স্বামীজি উল্লিখিত ইসলামিক সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বের কথাটি আমিও “বামপন্থা বনাম ইসলাম” শীর্ষক আলোচনাটিতে রেখেছি। অনেক পাঠক বন্ধুই সেটি পড়েছেন। এবার আর একটি পর্যবেক্ষণ দেখে নিই।
2. Mohammed— the Messenger of equality. You ask, “What good can there be in his religion?” If there was no good, how could it live? The good alone lives, that alone survives. [ Part of the same lecture later compiled in The Complete Works of Swami Vivekananda by Swami Vivekananda Volume 4, Lectures and Discourses]
মোহম্মদ হলেন সাম্যের বার্তাবাহক। এবার আপনি জিজ্ঞাসা করুন—তাঁর ধর্মে কি এমন ভাল জিনিষ আছে ? আমি উত্তর দেব –যদি ভাল কিছু না থাকে তবে এতদিন টিকে আছে কেন ? কেবলমাত্র উত্তমই বেঁচে থাকতে পারে, টিকে থাকতে পারে।

3. For our own motherland a junction of the two great systems, Hinduism and Islam — Vedanta brain and Islam body — is the only hope. I see in my mind’s eye the future perfect India rising out of this chaos and strife, glorious and invincible , with Vedanta brain and Islam body. I see in my mind’s eye the future perfect India rising out of this chaos and strife, glorious and invincible , with Vedanta brain and Islam body. (Written to Mohammed Sarfaraz Husain of Naini Tal, later compiled in The Complete Works of Swami Vivekananda by Swami Vivekananda Volume 6, epistles, second series]
আমাদের মাতৃভূমি দুটি মহান ব্যবস্থার মিলনক্ষেত্র—হিন্দুত্ব এবং ইসলাম। একমাত্র আশা যদি এর মস্তিষ্কটি বেদান্ত হয়ে ওঠে দেহটি ইসলাম।আমি মানস চক্ষে দেখি এই বিশৃঙ্খলা এবং সংঘাতে থেকেই একদিন আদর্শ ভারতের জন্ম হবে, গৌরবময় এবং অপরাজিত; যার মস্তিষ্কটি হবে বেদান্ত আর দেহটি হবে ইসলাম।

4. I am firmly persuaded that without the help of practical Islam, theories of Vedantism, however fine and wonderful they may be, are entirely valueless to the vast mass of mankind.

[Written to Mohammed Sarfaraz Husain of Naini Tal, later compiled in The Complete Works of Swami Vivekananda by Swami Vivekananda Volume 6, epistles, second series]

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বস্তুনিষ্ঠ ইসলামের সাহায্য ছাড়া বেদান্তের তত্ত্ব সমূহ যতই সুচারু এবং চমকপ্রদ হোক, বৃহৎ জনসমষ্টির কাছে সম্পূর্ণভাবে মূল্যহীন।

5. This Vedantic spirit of religious liberality has very much affected Mohammedanism. Mohammedanism in India is quite a different thing from that in any other country. It is only when Mohammedans come from other countries and preach to their co-religionists in India about living with men who are not of their faith that a Mohammedan mob is aroused and fights. [The Complete Works of Swami Vivekananda by Swami Vivekananda Volume 5]

বেদান্ত আশ্রিত ধর্মীয় স্বাধীনতার বোধ ইসলামকেও যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে। ভারতের ইসলাম অন্যান্য দেশের ইসলামের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একমাত্র যখন অন্য দেশ থেকে মুসলমানরা এদেশে আসে এবং তাদের ধর্ম বিশ্বাস এখানকার মুসলিমদের মধ্যে প্রচার করে, তখনই উন্মত্ত মুসলমান জনতার উত্থান ঘটে এবং তারা হানাহানি শুরু করে দেয়।
স্বামীজির এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরে বিশদ আলোচনায় আসছি। তার আগে দেখে নেওয়া যাক ইসলাম সম্পর্কে তাঁর নেতিবাচক পর্যবেক্ষণগুলি কেমন ছিল।
1. Now, the Muslims are the crudest in this respect, and the most sectarian. Their watch-word is: there is one God (Allah), and Mohammed is His Prophet. Everything beyond that not only is bad, but must be destroyed forthwith, at a moment’s notice, everyman or woman who does not exactly believe in that must be killed; everything that does not belong to this worship must be immediately broken; every book that teaches anything else must be burnt. From the Pacific to the Atlantic, for five hundred years blood ran all over the world. That is Mohammedanism (Islam)!”

[The speech delivered at the Shakespeare club of Pasadena, California, USA, on February 3, 1900, Part of the same lecture later compiled in The Complete Works of Swami Vivekananda Volume 4].
এই ক্ষেত্রে মুসলমানেরা সর্বাপেক্ষা অমার্জিত প্রকৃতির এবং ভয়ানকভাবে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। তাদের একটিই বিশ্বাস একটিই প্রতীতি—বিশ্বে একজন মাত্র ঈশ্বর [আল্লা] আছেন এবং মোহম্মদ তাঁর একমাত্র প্রফেট। এর বাইরে যা কিছু আছে তা কেবল মন্দই নয়, সেসব যত শীঘ্র সম্ভব ধ্বংস করে ফেলতে হবে। প্রতিটি পুরুষ অথবা নারী যারা এতে বিশ্বাস রাখে না, তাদের অবশ্যই হত্যা করতে হবে। যেসব বস্তু এই ধর্ম বিশ্বাসে কাজে লাগে না সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে ফেলতে হবে। যে সমস্ত পুস্তকে এর বাইরে অন্য কোনো জ্ঞান আছে, সেসব অবশ্যই পুড়িয়ে ফেলতে হবে। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে অ্যাটলান্টিক মহাসাগর— পাঁচশ বছর ধরে সমগ্র বিশ্বে যা রক্ত ঝরিয়েছে, তা-ই ইসলাম।
2.“One religion may ordain something very hideous. For instance, the Mohammedan (Islam) religion allows Mohammedans to kill all who are not of their religion. It is clearly stated in the Koran, “Kill the infidels if they do not become Mohammedans.” They must be put to fire and sword. Now if we tell a Mohammedan that this is wrong, he will naturally ask, “How do you know that? How do you know it is not good? My book says it is.”
[The speech, given in London on 17th November, 1896]
একটি ধর্ম তার অনুগামীদের চরম বর্বোরোচিত নির্দেশও দিতে পারে।উদাহরনস্বরূপ—ইসলাম সমস্ত অনুগামীদের অনুমতি দেয় ভিন্ন ধর্মের সকল মানুষকে তারা হত্যা করতে পারে। কোরআনে পরিষ্কার বলা আছে –সেই বিধর্মীকে হত্যা করো, যারা ইসলাম গ্রহণে অনিচ্ছুক হবে। তাদেরকে আগুন এবং তরবারি দিয়েই শাস্তি দিতে হবে। এবার যদি আমরা কোনো মুসলমানকে বলি যে এটি অন্যায়, সে স্বভাবতই প্রশ্ন করে বসবে—আপনি কিভাবে জানলেন অন্যায় ? কিভাবে বলতে পারেন এটি উত্তম কার্য নয় ? আমার গ্রন্থে এটি বলা আছে।
3. “In this line the Mohammedans were the best off; every step forward was made with the word the Koran in the one hand and the sword in the other” Take the Koran, or you must die; there is no alternative”. [The speech, delivered in the Universalist Church, Pasadena, California, USA, on 28th January, 1890]
এব্যাপারে মহমেডানরা সব চেয়ে সেরা—প্রতিটি পদক্ষেপ মানেই এক হাতে কোরআন আর এক হাতে তরবারি—গ্রহণ কর অথবা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। আর কোন বিকল্প নেই।

4.“The more selfish a man, the more immoral he is. And also with that race which is bound down to itself has been the most cruel and the most wicked in the whole world. There has not been a religion that has clung to this dualism more than that founded by the Prophet of Arabia (Mohammed), and there has not been a religion (Islam) which has shed so much blood and been so cruel to other men. In the Koran there is the doctrine that a man, who does not believe these teachings, should be killed; it is mercy to kill him! And the surest way to get to heaven, where there are beautiful ‘houries’ and all sort of sense-enjoyments, is by killing these unbelievers. Think of the bloodshed there has been in consequence of such beliefs (Islam)!”
[The speech delivered by Swami Vivekananda in London on 18th Nov.1896].
“মানুষ যত স্বার্থপর, তত নীতিহীন। আর যদি কোন জাতি/ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি সঞ্চারিত হয়, তারা সবচেয়ে নির্মম এবং পাশবিক হয়ে ওঠে।এ বিশ্বে একটিও ধর্ম নেই যা মোহম্মদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মটির মত এই দ্বৈত সত্তাটি ধরে রেখেছে[স্বার্থপরতা এবং নীতিহীনতা] অন্য মানুষের প্রতি এমন নিষ্ঠুর হয়েছে,  এত পৃথিবীতে এত রক্তপাতের কারণ হয়েছে। কোরআনে পরিষ্কার উল্লেখ আছে যারা এই ধর্মে বিশ্বাস করবে না, তাদের হত্যা করা উচিত। তাদের হত্যা করা পরম দয়ার কাজ। এবং এভাবেই নিশ্চিত স্বগে যাওয়া যাবে এবং সুন্দরী হুরি সহ সমস্ত আনন্দ উপভোগ করা যাবে। অবিশ্বাসীদের হত্যা করার মাধ্যমেই এই মহান লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। ভেবে দেখুন ইসলামে বিশ্বাস করার ফলশ্রুতি হিসেবে এ বিশ্বে কত রক্তপাত ঘটেছে।” 
5.“Every man going out of the Hindu pale is not only a man less, but an enemy the more.” 

একজন হিন্দু যখন হিন্দুত্ব থেকে বেরিয়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ [এখানে মূলত ইসলামকেই বোঝানো হয়েছে] করে, তাতে কেবল একজন হিন্দু কমেই যায় না। আর একজন শত্রু বাড়ে। [প্রবুদ্ধ ভারত নামক পত্রিকার সম্পাদককে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের অংশ]

অবাক হচ্ছেন ? আমিও হয়েছিলাম। বিবেকানন্দকে পড়তে পড়তে আমার যে সব বিষয়ে খটকা লেগেছিল, তার মধ্যে এটি অন্যতম। [একই বক্তৃতায় / আলোচনায় ইসলামের চরম প্রশস্তি, আবার তারপরই নিদারুণ নিন্দা।] আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বিবেকানন্দের মত একজন আধুনিক মননের মানুষ কেন বলে বসলেন হে ভারত ভুলিও না সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী তোমার নারীজাতির আদর্শ ? ঢাক ঢোল পিটিয়ে কুমারী পূজাই বা করতে গেলেন কেন ? তবে গভীরে প্রবেশ করার পর এ দুটি বিষয় নিয়ে আর কোন বিভ্রান্তি নেই।   

একই সাথে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ, প্রশংসা এবং নিন্দা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই মহা পুরুষটি কতটা নিরপেক্ষ এবং নির্মোহ ছিলেন। ইসলামের ভাল দিকগুলি তাঁর নজর এড়িয়ে যায়নি। ইতিবাচক শ্রেণিবিভাগের অন্তর্ভূক্ত প্রথম পর্যবেক্ষণটি লক্ষ করুন। ইসলামের একটি অনন্য এবং মহান বৈশিষ্ট—সাম্য, ভ্রাতৃত্ব যা আমি আগেই একটি প্রবন্ধে আলোচনা করেছি। স্বামীজি চেয়েছিলেন এই গুণটি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও সঞ্চারিত হোক। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রি্য বৈশ্য শুদ্র, ইত্যাদি জাতপাত এবং অস্পৃশ্যতা দূরে সরিয়ে রেখে একটি আধুনিক হিন্দুত্বের আবির্ভাব ঘটুক। আর তাই আশু সংস্কারের প্রয়োজন। ইসলাম থেকে এই সাম্যের শিক্ষাটি গ্রহণ করা অত্যন্ত আবশ্যক। নইলে হিন্দুত্ব বিপন্ন হবে। সেই আভাস তিনি পেয়েছিলেন। সামুহিক সাম্যের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ পেশীশক্তির মিলন—এটিই ইসলামের ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে ইসলামে কি আদৌ এই সাম্য আছে ? একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা কি সেটি নির্দ্বিধায় বলতে পারি? স্বামীজির ইতিবাচক পর্যবেক্ষণগুলি মূলত ইসলামের আকর গ্রন্থগুলি পাঠ করার ফলশ্রুতি। বর্তমান তথ্য বিপ্লবের যুগে, যখন ইন্টারনেট, ইউ টিউব থেকে শুরু করে মত বিনিময় এবং পর্যবেক্ষণ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে, স্বামীজীর এই ইতিবাচক পর্যবেক্ষণগুলিও সময়ের আবর্তে আর তেমন প্রাসঙ্গিক নেই। মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, অমানুষিক রক্তপাত দেখে যেতে পারেন নি।
ইরাক ইরাণ [ শিয়া সুন্নির যুদ্ধ] যুদ্ধ, আইসিস-এর ভ্রাতৃঘাতী হত্যালীলা, পাকিস্তানে একটির পর একটি শিয়া মসজিদে সুন্নি সন্ত্রাসবাদের হামলা, ইয়েমেনের মাটিতে সৌদি আরবের বিমান হানা, ওয়াহাবি, আহমেদিয়া, সুফি, সালাফি, মোহাজিরদের কুৎসিত বৈষম্য এবং পারস্পরিক ঘৃণা— যা তথ্য বিপ্লবের আবহে আমরা সবাই কম বেশি ওয়াকিবহাল, স্বামীজীর সময় এসব ঘটেওনি, আর ঘটলেও জানার সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে। তখন কোরআন হাদিসের পাঠ ছাড়া আর কোনো মাধ্যম ছিল না। তত্ত্ব এবং বাস্তব অবস্থার মধ্যে আসমান জমিন ফারাক, যা ইসলামি সাম্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য, তা তিনি সেভাবে দেখে যেতে পারেন নি।
এক থেকে তিন মোটামুটি একই বিষয়ের উপর আলোকপাত। তাই চার এবং পাঁচ নম্বর পর্যবেক্ষণে আসি। বেদান্তের সঙ্গে ইসলামের একটি সার্থক সমন্বয়। এই স্বপ্নটি তিনি আমরণ দেখেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বেদ বেদান্ত যখন মূলত তাত্ত্বিক তথা দার্শনিক অনুসন্ধান, আত্মজিজ্ঞাসা ইসলাম সেখানে একটি যাপন রীতি, দৈনন্দিন জীবন—জন্ম থেকে মৃত্যু প্রতিটি মুহূর্ত এবং কাজকে নির্দিষ্ট অনুশাসনে বেঁধে রাখার অভূতপূর্ব আয়োজন। একজন মুসলমান কি খাবেন বা খাবেন না, ঘুমোবেন,কিভাবে মল মূত্র ত্যাগ করবেন, এমনকি যৌন সম্পর্ক চলাকালীন কি কি করবেন বা বা করবেন না সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট অনুশাসন আছে যা এই ধর্মটিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হয়েছে। তাই বেদান্তের মস্তিষ্ক আর ইসলামের শরীর এই দুইয়ের সমন্বয়ে একটি সার্থক ভারতীয়তার জন্ম হবে এমন আশা করেছিলেন।একটি ভেতর অর্থাৎ মনন নিয়ন্ত্রণ করবে, আর একটি বাহ্যিক অনুশাসন, একটা, শারীরিক শক্তির বিকাশে সহায়ক হবে। পঞ্চম পর্যবেক্ষণটির মাধ্যমে এই আশাটির কারণও জানিয়ে দিয়েছিলেন—ভারতীয় মুসলমানেরা অন্য দেশের মুসলমানের চেয়ে আলাদা। তাদের মধ্যেও হিন্দু সংস্কৃতি তথা বেদ বেদান্তের প্রভাব পড়েছে, মুক্ত চিন্তার প্রভাব পড়েছে। তাই বাইরের মুসলমানেরা না খেপালে তারা উন্মত্ত হয়ে ওঠেন না। স্বামীজির এই পর্যবেক্ষণটি নিঃসন্দেহে সঠিক। হিন্দুত্বের সংস্পর্শে থাকা ভারতীয় মুসলমানেরা মধ্য এশিয়ার আরব সংস্কৃতি থেকে অনেকটাই ভিন্ন এবং বিচ্ছিন্ন। তাই এই উপমহাদেশের মুসলমানেরা সঙ্গীত চর্চা করেন, চলচ্চিত্র করেন, অভিনয় করেন, হিন্দু আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও করেন। যা গোঁড়া ইসলামে হারাম বলে বিবেচিত। এই উদারতার ফলশ্রুতি হিসেবেই সুফিবাদের জন্ম। বিবেকানন্দ এই সুফিদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এও বলেছেন তাঁদের সাথে হিন্দুদের তেমন কোনো ফারাক নেই। তাঁরাও গোমাংস ভক্ষণ করেন না। স্বামীজির এই পর্যবেক্ষণটিও এখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে। তাঁর সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের উত্তেজিত করতে হলে বাইরের মুসলমানদের দরকার পড়ত। কিন্তু এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে সুদূর মধ্য এশিয়া থেকেও ঘরে বসে এই উত্তেজনার বাণী পৌঁছে দেওয়া যায়। শারীরিকভাবে উপস্থিত হওয়ার দরকার পড়ে না। ইউরোপে উগ্র ইসলামের হানা এবং শরণার্থী সমস্যা ইত্যাদি তিনি দেখে যেতে পারেন নি। উপলব্ধি করতে পারেন নি তথ্য প্রযুক্তির আবহে ইসলামিক গোঁড়ামো তথা হিংস্রতা কতটা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই তাঁর নেতিবাচক পর্যবেক্ষণগুলিই ক্রমশ আরও বেশি করে সত্য হয়ে উঠছে। সংঘাত বাড়ছে, বাড়ছে হিংস্রতা। কেবল ভারতেই নয়। সমগ্র বিশ্বে। লণ্ডন থেকে ফ্রান্স, স্পেন থেকে বেলজিয়াম, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। আধুনিক মননের সঙ্গে সংঘাত।
স্বামীজি অনুভব করেছিলেন ইসলাম তথা মুসলমানকে বাদ দিয়ে তাঁর মাতৃভূমিকে আর কল্পনা করা যাবে না। ইসলামকে বাদ দিয়ে বা ধ্বংস করে নয়, আত্তীকরণ করেই এই দেশকে উঠে দাঁড়াতে হবে। নৈনিতাল বাসী মহম্মদ সরফরাজ হোসেনকে তিনি বার বার এই কথাটিই বলে গেছেন। ইসলাম ধর্মের অনেক মানুষের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত আলোচনা, কথোপথন হত। অনেকের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল। ইসলাম ধর্মের অনেক মানুষ তাঁকে চিঠি লিখতেন, প্রশ্ন করতেন। তিনি যত্ন করে তাঁদের উত্তর দিতেন। সরফরাজ হোসেনকে লেখা সেই গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটির একটি অংশ তুলে দিচ্ছি– 
We want to lead mankind to the place where there is neither the Vedas, nor the Bible, nor the Koran; yet this has to be done by harmonising the Vedas, the Bible and the Koran. Mankind ought to be taught that religions are but the varied expressions of THE RELIGION, which is Oneness, so that each may choose that path that suits him best.   
প্রিয়,মানবজাতিকে এমন একটি ভুবনে নিয়ে যেতে চাই যেখানে কোনো বেদ, বাইবেল, কোরআন কিছুই থাকবে না। আর এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে বেদ, বাইবেল এবং কোরআনের একটি সার্থক সমন্বয়ের মাধ্যমে। মানুষকে শেখাতে হবে সব ধর্মগুলি আসলে সেই “মহান ধর্মটির” ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ যা কেবন একেশ্বরবাদকেই নির্দেশ করে , যাতে প্রতিটি মানুষ তাঁর  পক্ষে উপযুক্ত পথটি নির্বাচন করতে পারে।
সর্বাধুনিক মনন এবং চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এমন একজন মানুষ তবে কেন সীতা সাবিত্রীর আদর্শের কথা বললেন ? কেন বললেন কুমারী পূজার কথা ? বিপন্নতা এবং অসহায়তা। সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের স্বপ্নটি লালন করলেও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ইসলাম এত সহজে হাত বাড়িয়ে দেবে না। তাই হিন্দুকেও ঐক্যবদ্ধ এবং সবল হতে হবে। আর অনুশাসন ছাড়া কখনও একাত্মবোধ আসেনা। আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা তথা মনন মানুষকে যেমন অগ্রগামী করে, তেমনই একা এবং বিচ্ছিন্ন করে। আধুনিকতার অন্যতম ফলশ্রুতিই হল alienation. কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের শক্তি হল unification ! ইউরোপ ভ্রমণকালে এটি আমি নিজের চোখেই দেখেছি। যে মহৎ কাজই হোক আধুনিক, নাস্তিক মানুষ কখনও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনা, জমায়েত তো দূরের কথা। অটল বিশ্বাস যার উপর ভিত্তি করে সহস্র সহস্র মানুষ একত্রিত হতে পারে, তা কোনো আধুনিক মানুষের মধ্যে থাকতে পারেনা। কারণ সে অভ্রান্ত কোনো ধর্মীয় বোধে বিশ্বাসই রাখেনা। এই বিচ্ছিন্নতার সংকট ইউরোপিয়ানদের আর একটি নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।তবে উপায় ? হ্যাঁ একটিমাত্র পথ আছে। হিন্দুত্বকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের রূপ দেওয়া। নির্দিষ্ট অনুশাসনের বেড়িতে হিন্দু ধর্মের মানুষগুলিকে বেঁধে ফেলা। কিভাবে ? কেন সীতা সাবিত্রীর আদর্শকে বাঁচিয়ে তোলা, কুমারী পূজা করা বেদ উপনিষদকে ভিত্তি করে একটি ঐক্যবদ্ধ হিন্দু সমাজের প্রতিষ্ঠা করা। কি বললেন ? পিছিয়ে যাওয়া ? আলবৎ তাই। পিছিয়েই তো যেতে হবে। বিবেকানন্দের মত আধুনিক মননের মানুষটিকেও কেন পিছিয়ে যেতে হয় বোঝেন না ? এমন একটি ধর্মীয় অনুশাসনের নাম বলুন তো যা অগ্রগতিকে সূচিত করে ? পারবেন না। কারণ ধর্মীয় অনুশাসন মানেই পশ্চাদগামিতা। হিন্দুত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের রূপ দিতে গেলে এটি ছাড়া পথ ছিল না। আর যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সূচনায় হয় নারীকে আবদ্ধ করে। তাই আবার সীতা সাবিত্রীর অবতারণা ! কি বললেন ? এতটা এগিয়ে এসে আবার পিছিয়ে যাব? এই প্রশ্ন স্বামীজিকেও নিশ্চয় ভাবিয়েছিল। কিন্তু উপায় কি ? পিছিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের মোকাবিলা পিছিয়ে গিয়েই করতে হয়। আমি আপনি তো কোন ছাড়, আলোকপ্রাপ্ত ইউরোপও এখন পিছিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে ! অনুশাসন ছাড়া আইডেন্টিটি তৈরি হয়না। চরম আগ্রাসী একটি আডেন্টিটির বিরুদ্ধে টিকে থাকতে হলে পাল্টা একটি আইডেন্টিটি চাই। আধুনিক মনন দিয়ে যে পশ্চাদগামী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা অসম্ভব।  কতটা বিপন্নতা থেকে স্বামীজিকে এই “হাস্যকর” আদর্শের পুনরুচ্চারণ করতে হয়েছিল, আমি তো বেশ অনুভব করতে পারি। একদিকে অগ্রগতি অপরদিকে অস্তিত্ব—যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হলে এমন “হাস্যকর” বানীর জন্ম দেওয়া ছাড়া উপায় কি !
আর তাই পঞ্চম পর্যবেক্ষণটির জন্ম হয়। ধর্মান্তর নিয়ে তাঁর অসহায়তা। হিন্দুর মুসলমান হয়ে যাওয়া অর্থ আর একটি শ্ত্রুর জন্ম হওয়া।

কিন্তু বড় আগে চলে গেলেন। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে। হিন্দুত্বকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর স্বপ্নটি তাঁর অপূর্ণই রয়ে গেল। শেষ আশাটিও নির্মুল হল। তবু বিবেকানন্দকে অনেকেই ভয় পান। সেটিই স্বাভাবিক। তাঁর সম্যক আলোচনা তাই ব্রাত্য। সুবিধাবাদী সেকুলারদের হৃদকম্পন সৃষ্টি করার জন্য এই মানুষটিই যথেষ্ট।
কিন্তু স্বামীজির উত্তরাধিকার ? হাসালেন মাইরি। যান বেলুড় মঠকে জিজ্ঞাসা করুন। রবি ঠাকুরের মত তিনিও এখন ছবি। ফুল বেলপাতা দিয়ে নিয়মিত পূজা করা হয়। প্রিয় চার্মিনারের প্যাকেটও থাকে শুনেছি।
“উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত—
জেগে ওঠার আহ্বান ! নিজের প্রাপ্য বুঝে নেওয়ার আহ্বান ! কোন প্রাপ্য ? নিজের প্রাপ্য, হারিয়ে যাওয়া অধিকার, আত্মপরিচয়। আত্মবলে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান। এই আহ্বান কেবল হিন্দুদের উদ্দেশ্যে ছিল না। হরিপদ এবং  সরফরাজ দুজনকেই তিনি বারংবার ডাক দিয়ে গেছেন।

কেউই জাগেনি। তার কোন সম্ভাবনাও দেখিনা। অর্থ আর পরমার্থের  ভাবনায় আবিষ্ট হয়ে একজন ইহলোকটিকেই জলাঞ্জলি দিতে বসেছে, পরলোকের প্রাপ্তির লোভে আর একজন ইহলোকটিকেই ক্রমশ “মজবুত” করে চলেছে।

ভক্ষিত হওয়ার পূর্বে কতিপয় মণ্ডুকই সর্পের অস্তিত্ব টের পায়। তাতে কোনো লাভ হয়না। যন্ত্রণাই বাড়ে।