বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান: বিজ্ঞানের নাম অপবিজ্ঞানের সাম্যবাদী চর্চার এক আখ্যান। অপবিজ্ঞান এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিজ্ঞানের অপব্যবহারের কারণে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বা কত মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এই মৃত্যুমিছিলের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী তথাকথিত এক জীববিজ্ঞানী (!!) এবং স্ট্যালিনের কাছের মানুষ ট্রোফিন লিসেঙ্কো। এই লোকটিকে নিয়ে আজকের লেখা।

লিসেঙ্কোর মতো প্রচুর মানুষ তাদের অন্ধ ভাবধারা আর মিথ্যার বেসাতি নিয়ে অনেক কুকীর্তি করেছে তবে অনেক কিছুই সামনে আসে নি বা আমাদের মানে বঙ্গবাসীর কাছে পরিচিত না ।আজকের লেখায় কারোর মার্কসনুভুতি বা স্ট্যালিনানুভুতিতে যদি আঘাত লাগে তবে যুক্তি দিয়ে বলবেন ,আমার ভুল হলে আমি নিজেকে সংশোধন করবো। অকারণে বিপ্ল্ব করতে চাইলে আমি অসহায়,তথ্যসূত্র ছাড়া কোনো মতামত গ্রাহ্য করা যাবে না।

যাইহোক , আবার পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আবার বলছি  লিসেঙ্কো নামের স্বঘোষিত বিজ্ঞানী  এবং স্ট্যালিন এর স্নেহধন্য মানুষটি লক্ষ লক্ষ মানুষের অনাহারে মৃত্যুর জন্য দায়ী।  কাল্পনিক কিছু মিথ্যা গবেষণা এবং কোনো সমালোচনাকে  বিচার না করে এই কাজ করেছে এই ভন্ড লোকটি।

অপবিজ্ঞান
অপবিজ্ঞান

একমাত্র সার্বিক যুদ্ধ এবং গণহত্যার ঘটনা ছাড়া এই ধরনের মানুষের মৃত্যুর কোনো উদাহরণ পৃথিবীতে বোধহয় আর নেই। আজ এর প্রকৃত চরিত্র আর কাজের রূপ তুলে ধরবো। ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে এক গরিব পরিবারে জন্ম নেওয়া লিসেঙ্কো ছিল কমিউনিজম এর সমর্থক,তাতে কোনো অসুবিধে ছিল না কিন্তু  বিজ্ঞান আর তার কমিউনিজম এর ধারণার যে ক্ষেত্রে সংঘাত এসেছে সেখানেই সে নিজের ভাবধারাকে প্রাধান্য দিয়েছে ,নস্যাৎ করেছে বিজ্ঞানের তত্বকে।

এই কাজেই সে নিজের আখের গুছিয়েছে লাখে লাখে মানুষের মৃতদেহের সিড়ি বানিয়ে উপরে উঠে । গরিব কৃষকের সন্তান লিসেঙ্কো ১৮৯৮ সালে জন্মগ্রহন করেন।  ১৩ বছর পর্যন্ত নিরক্ষর এই মানুষটির পরবর্তীতে উল্কার বেগে উত্থান হয় জীববিজ্ঞানী হিসেবে। রুশ বিপ্লবের পুরো সদ্ব্যবহার করে নিজের কর্তৃত্ব পেয়ে যান বেশ কয়েকটি কৃষি বিদ্যালয়ে। এই জায়গাগুলোতে তিনি নিজের মতো করে পরীক্ষানিরীক্ষা করা শুরু করেন মটরবীজের উপর।

তার গবেষণার বিষয় ছিল তৎকালীন সেভিয়েত মুলুকের বরফ অঞ্চল গুলোতে  এই ধরণের বীজের থেকে ফসল উৎপাদনের উপর। মূলত কল্পিত কিছু গবেষণার মিথ্যার বুনন করেন এবং কল্পিত তথ্যের আধার তৈরী করে।পুরোনো আমলের পাঁচকড়ি দে বলে একজন  লেখকের একটি মজার লাইন ছিল,”কোথা হইতে কি হইয়া গেল “,তারপরেই গল্পের নায়ক বিপদমুক্ত।ঠিক এইরকম ভাবেই মিথ্যা কিছু তথ্য সাজিয়ে এই মহান বিজ্ঞানী পেয়ে গেল রাষ্ট্রের পুরস্কার। তথ্যসূত্র

অবশেষে এই মহান কমরেড সেভিয়েত ইউনিয়নের কৃষি অধিকর্তা পদে বসে ১৯৩০ সালে। কথা হলো কেন এর উপর এতো নিন্দাবাক্য ? এর কারন হলো লোকটি জেনেটিক্স বা জিনতত্ব কে সম্পুর্ন অস্বীকার করেন। বস্তুত ১৯১০ থেকে ১৯২০ এই দুই দশকে এই নতুন তত্ব যখন তার শাখা প্রশাখা বিস্তার করছে,সেই সময় এর উপর খড়গ হস্ত হয়েছে এই লিসেঙ্কো। জেনেটিক্স এর উপর প্রথম নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয় ১৯৩৩ সালে, সূত্র

ঠিক সেই সময় যখন জিনতত্ব প্রাণী আর উদ্ভিদের বিবিধ শ্রেনীর বংশানুক্রমিক জিনগত বৈশিষ্ট্য মানুষ চিহ্নিত করছে,সেই তখনি এই সাধারণ এক জীবতত্বর মানুষ জিনকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে ! তিনি এই গোটা বিষয়কে প্রতিক্রিয়াশীল এবং পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের ফসল বলে নস্যাৎ করেন। তার মতে জিন বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। এবার ভাবুন !তথ্যসূত্র : 

এই প্রসঙ্গে জেসপার বেকার এর লেখা ‘হাঙরি গোস্টস  (Hungry Ghosts) এ বলছেন,লুসেঙ্কো উদ্ভিদ এবং প্রাণীর বৃদ্ধি থেকে সব কিছুই পরিবেশের কারণে হয় বলে দাবি করেছেন। আরো দাবি করেছেন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারলে যে কোনো জীবকুল অপরিসীম উৎপাদন সক্ষম হয়ে ওঠে।

কঠিন লাগছে বুঝতে ? আরো সহজ করে বললে তার ধারণা ছিল আপনি কাশ্মীরের আপেল বর্ধমানের মাঠে করতে পারবেন তার পদ্ধতি অনুযায়ী যদি কাজ করেন।এই মহান সাম্যবাদী কৃষি তথা জীববিজ্ঞানী তত্কালীন সেভিয়েত কৃষকদের ‘শিক্ষিত’ করতে লেগে পরেন।

এই কাজের এক নমুনা হলো বরফ জলে বীজ রেখে ওই বীজকে ঠান্ডার সম্যক শিক্ষা দেওয়া,তার উর্বর মাথার আইডিয়া ছিল এতে পরবর্তী পর্যায়ে গাছের বীজ এই আবহওয়ার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেবে এবং সব সমস্যার সমাধান।

খালি ভাবুন কি সাংঘাতিক ভাবনা !মানে ধরুন একটি কুকুরের লেজ আপনি কেটে দিলেন এবং আশা করলেন এরপর থেকে পরবর্তী কুকুরের বাচ্চাগুলোর আর লেজ হবে না ! এই ভাবনা সাম্যবাদী, তাই ঠেকানোর কোনো উপায় ছিল না ফলে তিনি সাইবেরিয়াতে কমলা লেবু চাষ এর প্রকল্প শুরু করেন।তিনি এই প্রতিশ্রুতি ও দিয়েছিলেন যে গোটা দেশের বরফ আচ্ছাদিত বা অনুর্বর অঞ্চলে খামার দিয়ে ভরিয়ে দেবেন। সূত্র

ঠিক এই ধরনের কোনো কাজ বা স্বপ্ন লুফে নিলেন স্ট্যালিন।এই আইডিয়ার উপর ভিত্তি করে এক সর্বনাশা কাজ শুরু হলো, গোটা তত্কালীন সেভিয়েত ইউনিয়নের লাখে লাখে মানুষকে বাধ্য করা হলো ‘যৌথ কৃষি প্রকল্পে অংশ নিতে।রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এই সব খামারগুলো যথারীতি বিফল হলো,তৈরী হলো দুর্ভিক্ষের অবস্থা কারন ফসল উত্পাদন হলো না এই লোকটির ধারণা অনুযায়ী,হওয়ার কথা ও না।ভাবছেন,একতরফা লোকটার নাম বদনাম করছি ?

বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান
বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান

উহু,একদম না ! এই লোকটি কৃষকদের আদেশ দিয়েছিল এক একটি ফসলকে মানে একই ধরনের গাছগুলোকে কাছাকাছি লাগাতে কারন ? একই শ্রেনীর  জীব /উদ্ভিদ এর মধ্যে ‘শ্রেণী দ্বন্ধ ‘ হয় না  ..ভাবুন কি মারাত্বক ভাবনা ! আরো বাধ্য করেছিলেন কৃষকদের কোনো সার বা কীটনাশক ব্যবহার না করতে।

অতপর এই মহান কাজের ফলে গোটা দেশে সেই সময়ে ৭০ লক্ষ মানুষ অনাহারে /দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিল। এই ঘটনা হয়েছিল ১৯৩২/৩৩ এ তবে তাতে কি ? বিপ্লবের পথে ঐরকম কয়েক কোটি ও কিছু তফাত করে না,তাই স্ট্যালিন তার পথ থেকে সরে নি। এর চার বছর পরেও বহুগুন বৃদ্ধি করে লুসেঙ্কোর পথে বহু আবাদি জমিকে একই কাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এর ফলে উৎপাদিত ফসল এর পরিমান আরো কমে যায়। আরো দুঃখের হলো তৎকালীন সেভিয়েত এর দোসর চীন এই লুসেঙ্কোর পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে যায়। যার ফলে ১৯৫০ এর সময়ে একই ভাবে দুর্ভিক্ষের  কবলে পরে। চিনে মারা যায় লাখে লাখে লোক।কিন্তু তাতে কি আসে যায় ? মাথার উপর মহান নেতার হাত আছে তাই সাত খুন মাফ হয় ,এই জন্য সেই সময়ে সব বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে লুসেঙ্কোর ছবি শোভা পেতে থাকে।

যেখানেই তিনি বক্তৃতা দিতেন সেখানেই আগে একটি নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যান্ড তার প্রশস্তি গান আগে গাইতো তারপরে তার ভাষণ। কি বলছেন ? ব্যক্তিপূজা ? চোপ ! সাম্যবাদ চলিতেছে !! তথ্যসূত্র  ,তবে ধার করে পড়তে হবে অথবা কিনে। কয়েকটি পাতা পড়তে পারেন মিলিয়ে দেখার জন্য। 

সেভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে অবশ্য তার এই মিথ্যার কারবার ধরা পরে গিয়েছিল কিন্তু তাতে তার কিছুই এসে যায় নি কারন তার মতে জিনতত্ব বা এই ধরণের বিষয় ছিল স্বৈরতন্ত্রের দালালি এবং এই বিজ্ঞানীরা হলো বুর্জুয়াদের দালাল। পশ্চিমা সমালোচনা কে নিজের দেশে ঢাকা দিতে বিরুদ্ধমত কে একদম সাম্যবাদের কায়দায় দমন করেছিলেন এই লোকটি।

বিরোধিতা করা অজস্র মানুষকে লেবার ক্যাম্পে স্থানান্তর বা গুম করে দেওয়া তার কাছে কোনো বড় ব্যাপার ছিল না। এরমধ্যে প্রখ্যাত উদ্ভিদ বিজ্ঞানী নিকোলাই ভাভিলভ কে এই ভাবে জেলের ভেতরে অনাহারে মারা হয় এই লোকটির নির্দেশে। তথ্যসূত্র

দুঃখের কথা হলো অজস্র প্রতিভাবান বিজ্ঞানী বিশেষত জীনতত্বের উপর কাজ করা মানুষ ছিলেন ১৯৩০ এর আগে যাদের গায়েব করে বা কাজ বন্ধ করে এই লোকটির কারণে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়। সূত্র

লুসেঙ্কোর পুনরুত্থান অথবা অপবিজ্ঞানের পুন্প্রবেশ :

স্ট্যালিনের মৃত্যুর পরে ধীরে ধীরে এই লোকটির প্রভাব প্রতিপত্তি কমতে থাকে। যদিও ক্রুশ্চেভ এর স্নেহধন্য ছিল এই লোকটি তবে ক্রমশ যা হয়,মিথ্যা প্রকাশ পেতে থাকে।এরফলে ১৯৬৪ তে সেভিয়েত জীববিজ্ঞান অধিকর্তার পদ থেকে অব্যাহতি এবং ১৯৭৬ এ নিঃশব্দে মৃত্যু।

গর্বাচেভ এর সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠানে যদিও এর ছবি ঝুলতো তবে ১৯৯০ পরবর্তী সময় ওই ছবি বিলুপ্ত হয় ,দেশ অব্যাহতি পায় এই লোকটির ছায়া থেকে। না ,ভুল বললাম,আবার কিছু অপবিজ্ঞান এর চর্চা শুরু হয়েছে তার কারন মার্কিন বিরোধিতা আরো একটি কারণ হলো এপিজেনেটিক্স এর উদ্ভব।

কি বলছে এই বিষয় ? বলছে কোনো সুপ্ত বৈশিষ্ট পরবর্তী কয়েকটি প্রজন্মের পরেও জেগে ওঠে। মানে ধরুন কোনো বিশেষ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুন্ আয়ত্ব করা কোনো জীবের পরবর্তী একটি প্রজন্মে দেখা দিল। এক্ষেত্রে ওই লুসেঙ্কোর মতবাদ এর কিছু অংশ সত্য হয়ে যায়। অতয়েব পুনরায় তার জয়গান ! সূত্র

দুঃখের কথা হলো এই কীর্তিমানের গুণগ্রাহীরা মূল জিনিসটি এড়িয়ে যায় অথবা বলে না তা হলো লুসেঙ্কো জিনকে অস্বীকার করেছিল। আরো বলে না যে এই জিনগত বৈশিষ্ট খুব কম মাত্রায় দেখা যায়। আর দেখা গেলেও এইরকম কোনো স্থিরতা নেই যে পরবর্তী প্রজন্মে ওই গুণাবলী দেখা যাবেই আর গেলেও ওটা স্থায়ী হবে। অর্থাৎ কোনো ভাবেই লুসেঙ্কোর কোনো ধারণার সাথে ওটা মেলে না !

আমি কি পাশ্চাত্যের গুন্ গান গাইতে চাইছি ? মোটেই না ! কারন এই লোকটির অদ্ভুত কাজের মতোই আমেরিকার ৪০ শতাংশ মানুষ বিবর্তনের তত্বকে নস্যাৎ করে ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছে এই ধারণা নিয়ে চলে। (তথ্যসূত্র : ৬০ শতাংশ রিপাবলিকান সেনেটর ধারণা করে এই আজকের প্রকৃতি দূষণ,

বৈশ্বিক তাপমাত্রার বৃদ্ধি ইত্যাদি কোনো ঐশ্বরিক কারবারের কারণে হয় (তথ্যসূত্র 🙂 এছাড়া ব্যঙ্গ করে জেনেটিক্স বা বিবর্তনের গবেষণাকে ,তখন শঙ্কা বেড়ে যায়। একটাই আশা যে অন্তত অনেকের ঘৃণিত ওই পশ্চিমের দেশগুলোতে গনতন্ত্র আছে ,বিরোধী মতবাদকে গায়েব করে দেওয়া হয় না ।

লিউশেঙ্কো আজ আস্তাকুড়ে তবে তার অপবিজ্ঞান মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে দেশে দেশে। আসুন সতর্ক হই। কেন তবে কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদের সমর্থকদের উপর এই অভিযোগ ? কারন আপনারাই তো বলেন বিজ্ঞান নাকি আপনাদের পথের পাথেয় ? তা হলে এতো মানুষের অনাহারে মৃত্যুর জন্য ,এই অপবিজ্ঞান চর্চার জন্য আবার কোনো ঐতিহাসিক ভুলের স্বীকার করবেন কি কমরেড ? মনে হয় না কারন আপনারা বিবর্তনের নিয়ম নিজেরাই মানেন না তাই যোগ্যতম হিসেবে হয়তো টিকে  থাকবেন না।

তথ্যসূত্র লেখার ফাঁকে ফাঁকে দিয়েছি তবু আরো কিছু বাড়তি দিলাম। বলে না ,অধিকন্তু ন দোষায়

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Trofim_Lysenko
২.https://www.forbes.com/sites/peterferrara/2013/04/28/the-disgraceful-episode-of-lysenkoism-brings-us-global-warming-theory/#5c1589127ac8
৩.http://hplusmagazine.com/2013/05/22/trofim-lysenko-soviet-ideology-and-pseudo-science/
৪. https://en.wikipedia.org/wiki/Soviet_famine_of_1932%E2%80%9333
৫. https://www.britannica.com/topic/Famine-of-1932

লেখক-অভিরুপ বন্দ্যোপাধ্যায়- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো পড়ুন….