বঙ্গীয় 'মুসলিম রাজনীতির' ফলাফল।

Spread the love

বঙ্গীয় ‘মুসলিম রাজনীতির’ ফলাফল
…………………………..
এ কে ফজুলল হককে বলা হয় ‘শেরে-এ বাংলা’। ৪৭ সালের দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে নতুনভাবে উদ্ভূত বাঙালী মুসলিম মধ্যবিত্তের প্রভাবশালী কাগজের নাম হয়েছিলো ‘ইত্তেফাক’ ‘দৈনিক আজাদ’। ফজলুল হকের নামের সঙ্গে ‘বাংলার বাঘ’ উপাধিই তো মানানসই হতো। মানছি এই উপাধি তিনি লাভ করেছিলেন উর্দুভাষী লখনৌবাসীর কাছ থেকে। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে লখনৌতে গিয়ে তিনি উর্দুতে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে লখনৌবাসীর মনজয় করেছিলেন। এরপর থেকে তার নাম হয়ে যায় বাংলার বাঘ বা ‘শেরে-এ বাংলা’। আশ্চর্য যে বাঙালীদের মধ্যে জন্ম নেয়া এতবড় একজন নেতার সঙ্গে উর্দু উপাধীটিই টিকে রইল, আমরা আজো তাকে বলি ‘শেরে-এ বাংলা’। পূর্ব বাংলার বাঙালীদের আনন্দবাজার যুগান্তরের সঙ্গে ভিন্ন কন্ঠস্বর কেন ‘ইত্তেফাক’ ‘আজাদ’ নামের অবাংলা শব্দে বাজবে? মোহাম্মদ আলী জিন্নার উপাধি ‘কায়েদে আজম’ যার অর্থ মহান নেতা। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী লেখক-সাহিত্যিকরা কায়েদে আজম উপাধিতে ধন্য ধন্য করে কবিতা ছড়ায় ভরিয়ে ফেলেছিলেন। এদের অন্তত অর্ধেক বাংলাদেশ হবার পর শেখ মুজিবকে নিয়ে কবিতা লিখেছে জাতির পিতা ‘বঙ্গবন্ধু’ ইত্যাদি সব গর্ব করে। কায়েদে আজম থেকে রাতারাতি বঙ্গবন্ধু ভক্তির আদর্শগত তফাত ছিলো না। ৬৫-৬৬ সালে ‘কায়েদে আজমে’ আস্থাশীল কেউ মাত্র ছয় বছরের মধ্যে কি করে পাকিস্তানের জিন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন? এটা তো সম্ভব না।

এতক্ষণে নিশ্চয় ভাবছেন কি বলতে চাইছি? বাঙালী মধ্যবিত্তের বিকাশের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতা ছিলো। হিন্দুদের সঙ্গে সাতন্ত্রতা করতে গিয়ে তার ভাষা ঝুকে পরেছিলো উর্দু-আরবী প্রভাবে। যদিও তারা বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করে প্রাণ দিয়েছে আর তা ছাপা হয়েছে তাদেরই প্রকাশিত ‘ইত্তেফাক’ ‘আজাদ’ কাগজে। পাকিস্তানে আজাদ পত্রিকা বের হবার আগে ১৯৩৬ সালে কোলকাতাতে আজাদ বের করেন মাওলানা আকরাম খাঁ। তার পূর্বপুরুষ পিরালী ব্রাহ্মণ এবং বাঙালী ছিলেন। কিন্তু আকরামদের পারিবারিক ভাষা হয়ে উঠে উর্দু। আকরাম নিজেও বিশ্বাস করতেন তার পূর্বপুরুষ আরব থেকে এসেছিলেন! কাজেই তার কাগজের নাম তো ‘আজাদ’ হবেই…।

এই মানুষগুলো সত্যিকার অর্থেই মুসলমানের মঙ্গল কামনা করতেন। মুসলমানকে ভালোবাসতেন। ফজলুল হক মুসলমানদের নেতা ছিলেন। গরীব অত্যাচারিত বঞ্চিত মুসলমানদের প্রাণের মানুষ ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইতে আছে গ্রামে মিটিং করতে গিয়ে মুজিব দেখেছেন মানুষ ফজলুল হকের কোন নিন্দা শুনতে চান না। তাদের সাফ কথা, আর সবার কথা কন সমস্যা নাই, ফজলুল হকের কোন সমালোচনা সহ্য করা হবে না…। ফজলুল হক মারা যাবার পর রেডিও পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ বেতার) তাদের সব অনুষ্ঠান বাতিল করে সারাদিন কুরআন তেলাওয়াত প্রচার করেছিলো। ফজলুল হক বাংলার দরিদ্র কৃষকদের জমিদার মহাজনদের অত্যাচর থেকে বাঁচাতে গঠন করেছিলেন ঋণ সালিশি বোর্ড। লড়াইটা ছিলো শোষকের বিরুদ্ধে শাসিতের হয়ে। সেটাই হয়ে উঠে হিন্দু-মুসলমান ইস্যু। কারণ জামিদারদের বেশির ভাগই ছিলেন ধর্মে হিন্দু। দেশভাগ হবার পর সেই জমিদার মহাজনরা শ্রেণী ঠিকই বহাল থাকল। তফাত শুধু তাদের ধর্মে। হিন্দুরা বিতাড়িত হল। শূন্যস্থান পূরণ করে নিলো মুসলমান ‘জমিদার মহাজন’ শ্রেণী। হিন্দু জমিদারের হাতে তো গরীব হিন্দু কৃষকও নির্যাতিত ছিলো। মুঘল আমলে যেমন হিন্দুর পাশাপাশি গরীব মুসলমানও খাজনার নিপীড়নে নিষ্পৃষিত ছিলো। ফজলুল হক অবিভক্ত ভারতবর্ষে ‘থিলাফত আন্দোলনে’ যোগ দিয়েছিলেন। তিনি একা নন, পরবর্তীকালের পূর্ব পাকিস্তানের সব বড় বাঙালী মুসলমান নেতাই যোগ দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান তার মধ্যে অন্যতম। খিলাফত আন্দোলন এতটাই উদ্ভট যে তাকে কোন রকম যুক্তি রাজনীতি দিয়ে গ্রহণযোগ্যতা দেয়া যায় না। মুসলমানদের খিলাফত তখন তুরস্ক পর্যন্ত এসে শেষ চিহৃ হয়ে ঝুলেছিলো। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক জাতি চেতনার খিলাফত শাসন এবং তার শেষ খলিফাকে নিজেদের খলিফা (শাসক) ঘোষণা দিয়ে অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলমানরা আন্দোলন শুরু করে। পরাধীন ভারতবর্ষে তুরস্কের এক মধ্যযুগীয় ভোগী বাদশাহর জন্য ভারতের মুসলমানরা রাস্তা নেমেছেন তাদের নেতা ঘোষণা করে। এতখানি পরজীবী পরদেশী আত্মপরিচয় বহন করা খিলাফত আন্দোলনই মুসলমান শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে ডেকে এনেছিলো ফান্ডামেন্টালিজম বা কঠর ধর্মবাদ। ফজলুল হকদের খিলাফতবাদই উপমহাদেশের ধর্মীয় রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছিলো। তাদের ‘শেরে-এ বাংলা’ ‘আজাদ’ ‘ইত্তেফাক’ প্রভৃতি তথাকথিত মুসলমানের ভাষার অলংকারই মৌলবাদকে প্রমোট করেছে। মুসলিম জাতীয়তাবাদই জিহাদ খিলাফতকে জায়গা করে দিয়েছে। তাই আজকের বাংলাদেশ, পাকিস্তান তথা মুসলিম প্রধান অঞ্চলগুলোর ফান্ডামেন্টালিজমে জনগণের আসক্তি তাদের তথাকথিত প্রগতিশীল নেতাদের মুসলমানিত্বের খেসারত…।