মনে করেন কোন হিন্দু সাধু তার ভক্তদের কাছে দাবী করেছেন তিনি অলৌকিক উপায়ে কাবাঘর ভ্রমণ করে সেখানে গঙ্গা স্নান করে এসেছেন এবং ভক্তরা সাধুর কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে পরবর্তীকালে ক্ষমতার জোরে কাবাঘরের পাশে একটা মন্দির বানালো সাধুর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এবং কাবাঘরকে হিন্দুদের জন্যও পবিত্র মনে করে তারাও কাবাঘরের দাবীদার বলে ঘোষণা করল- এটা যেরকম দাবী হবে মুসলমানদের জেরুজালেমকে নিজেদের জন্য পবিত্র এবং ইসলামের সম্পত্তি দাবী করার একইরকম গায়ে মানে না আপনি মোড়ল। বস্তুত জেরুজালেমকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো মুহাম্মদ। ইহুদী কিবলা বা প্রধান কেন্দ্র জেরুজালেমকে দিক নির্ধারণ করে মুহাম্মদ নামাজ চালু হবার অল্প কিছুকাল নামাজ পড়েছিলেন তার অনুসারীদের নিয়ে। বলা অসঙ্গত হবে না যে নামাজ ইহুদী-খ্রিস্টানসহ সাবেয়াই নামের আরেক ধর্ম সম্প্রদায়ের অনুসঙ্গ। সাবেয়াইন সম্প্রদায় নামাজের আগে পানি হাত-মুখ ধুয়ে ওজুও করত। ইসলামে এসব মৌলিক কোন অনুসঙ্গ নয়। ইসলামের কোন কিছুই মৌলিক নয়।

যাই হোক, ইহুদীদের সঙ্গে যখন মুহাম্মদের কোনভাবেই বণিবনা হলো না, কোনভাবেই ইহুদীদের কাছে নিজেকে মুসার ধারাবাহিকতায় নবী হিসেবে স্বীকার করাতে পারলেন না তখন ইহুদীদের সঙ্গে আগের যোগ করা ধর্মীয় নৈকট্য এক এক করে সব ত্যাগ করা শুরু করলেন। যেমন অনুসারীদের বলেছিলেন, ‘ইয়াহুদী ও নাসারারা চুল ও দাড়িতে খেযাব (রঙ) লাগায় না। সুতরাং তোমরা খেযাব লাগিয়ে তাদের বিপরীত কর’ (বুখারী, অধ্যায়ঃ আহাদীছুল আম্বীয়া।)। অথচ শুরুতে মদিনাতে এসে তিনি ইহুদীদের প্রশংসা করতেন। ইহুদীদের চুল রাখার কায়দার প্রশংসা করেছিলেন কুরাইশদের তুলনায়। ইহুদীরা মহরম মাসে রোজা রাখতে বলে তিনি তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী রোজা রাখা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এতখানিই ইহুদী বিদ্বেষ হয়ে গিয়েছিলেন যে তার অনুসারীদে জন্য ইহুদীদের বিপরীত করাই সু্ন্নত হয়ে যায়। এইরকম সময়ই কুরআনে কিবলা পরবর্তনের আয়াত লেখা হয়। ‘আকাশের দিকে তোমার বার বার তাকানোকে আমি অবশ্য লক্ষ করি। সুতরাং তোমাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি যা তুমি পছন্দ করো। অতএব তুমি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরাও’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৪২)।

দেখা যাচ্ছে জেরুজালেম থেকে কাবাঘরের দিকে কিবলা না নিশানা পরিবর্তের কোন যৌক্তিক কারণ আল্লাপাকও জানতেন না। ইহুদীদের থেকে মুহাম্মদ মুখ ফিরিয়ে নেয়া পর পরই সেই ধর্মের কেন্দ্র থেকে সরে এসে তিনি তার পৈত্তিক হিন্দু ধর্মের (পৌত্তলিক অর্থে) প্রধান মন্দির কাবাঘরকে নিশানা করে নেন। এতে সেসময় নবীন ধর্ম হিসেবে ইসলাম বেশ বেকায়দায় পড়ে যায়। অনুসারীদের কেউ কেউ কানাঘুষা করতে থাকে, মুহাম্মদ দেখি যা চায় সেটাই কিছুদিন পর কুরআনে নাযিল হয়ে যায়? কুরআন কি সত্যিই আল্লাহ পাঠায় নাকি মুহাম্মদ নিজে নিজে বানায়? বিষয়টা যাতে বড় আকার ধারণ করতে না পারে তাই তখনো অন্ধবিশ্বস্তদের ‘ঈমান’ ঠিক রাখতে আল্লাহ নতুন আয়াত নাযিল করে ফেলেন,- ‘আর ওদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো, যেন তোমাদের উপর আমি আমার অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করতে পারি, আর যেন তোমরা সঠিক পথ অনুসরণ করতে পারো’ (আল-বাক্বারাহ ১৫০)।

এই হচ্ছে জেরুজালেমের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্কের কাহিনী। এরপরও মুসলমানরা জেরুজালেমকে কিভাবে তাদের জন্য পবিত্র জ্ঞান করতে পারে যা একদিন তারা পরিত্যাগ করে এসেছিলো? ইহুদী ধর্মের এটাই ঈশ্বর নির্ধারিত পবিত্র নগরী। ইহুদীদের দ্বিতীয় কোন তীর্থ নেই। খ্রিস্টানদের কাছে জেরুজালেম পবিত্র কারণ এখানে যীশু জন্মেছিলেন। আর মুহাম্মদ এখানে কোনদিন আসেননি স্বশরীরে, দাবী করেছিলেন তিনি অলৌকিক উপায়ে একটা ডানাঅলা গাধার পিঠে চড়ে (বুরাক) জেরুজালেমে এসে নামাজ পড়েছিলেন। পরবর্তীকালে এই অপ্রমাণিত ইতিহাস বর্হিভূত কেবল বিশ্বাসই যেটার ভিত্তি তাকে সত্য ধরে উমার এখানে একটা মসজিদ বানান। মূলত ইহুদী ধর্মকে নিঃশ্চহৃ করতেই মুসলমানরা তাদের কথিত ‘পবিত্রভূমি’ জেরুজালেম দখল করতে মরিয়া। হাদিসে ইমাম মাহদিকে দিয়ে জেরুজালেম দখল করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। জেরুজালেম তাই মুসলমানদের কাছে তাদের ধর্মীয় রাজনীতি অংশ। ধর্মীয় রাজনীতি, ধর্মীয় রাষ্ট্রে আস্থা নেই। মুসলিম রাষ্ট্র ইহুদী রাষ্ট্র হিন্দু রাষ্ট্র বা কোন নৃতাত্বিক জাতি রাষ্ট্রই মানবজাতিকে খন্ডিত বিকৃত করে। এরকম রাষ্ট্রচিন্তা যুদ্ধ সংঘাত আর ঘৃণার চাষাবাদই বাড়াবে। ইহুদীরা জেরুজালেমে ধর্মের দোহাই দিয়ে, তাওরাতের প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে ধর্মরাষ্ট্র গঠন করলেও আদতে তারা গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ এক রাষ্ট্রই বানিয়েছে। আর ফিলিস্তিনীরা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের কথা বললেও তাদের অন্তরে মধ্যযুগীয় এক ইসলামী শরীয়া রাষ্ট্রই কাজ করছে। ইহুদীদের ধর্মরাষ্ট্র গঠনের বিপদের কথা রবীন্দ্রনাথ জার্মান সফরে গিয়ে এক জার্মান অধ্যাপকের কাছে ব্যক্ত করেছিলেন। এই বিপদ হচ্ছে ইহুদীরা এখন ধর্ম পরিচয়ে বিবেচিত হয়ে রাজনীতিতে পড়ে গেছে। নইলে জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠিত ইজরাইল রাষ্ট্র আদলে রূপে চরিত্রে বসবাসে যে কোন সভ্য গণতান্দ্রিক মানুষই পছন্দ করবে। মধ্যপাচ্যের ইজরাইলের আশেপাশে ইসলামী বা মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যেখানে প্রতিদিন মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় ধর্মীয় আইনে, চিন্তা চেতনায় রাষ্ট্রগুলো যখন মধ্যযুগীয় দুরত্বে পিছিয়ে ইজরাইলে বসবাসকৃত মুসলমানরা তখন গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করে। তবু ইজরাইল ‘ইহুদী রাষ্ট্র’ তকমা পেয়ে বসে আছে। রবীন্দ্রনাথ এই বিপদটা সেই ১৯১৩-১৪ সালেই আন্দাজ করেছিলেন।

শেষ কথা, যদি ধর্মীয় বিচারে মনে করেন ফিলিস্তিনীদেরই জেরুজালেম তাহলে এটি অসত্য বিকৃত। যারা ফিলিস্তিনী সমস্যাকে ইসলাম ধর্মের বাইরে রেখে নিছক স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে দেখতে আগ্রহী (আমাদের বাম ভাইরা) তারাও মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মোকাদ্দেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। বার বার বলেন জেরুজালেম মুসলমানদের কাছে খুব ‘স্পর্শ কাতর’! কেন বলেন? ধর্মীয় ব্যাকগ্রাইন্ড এই ইস্যুতে কাজ করে বলেই তো। তাই যদি থেকে থাকে তাহলে স্পষ্ট কথা, ধর্মীয় দিক কেবল বিবেচনা হলে জেরুজালেমে মুসলমানদের কোন দাবীই খাটে না। বরং দাবী করাটা পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার নামান্তর মাত্র…।