কাশ্মীরের হযরত বাল মসজিদ (ও চুলের মাজার) অনেকের কাছেই পরিচিত। রাসুলুল্লাহ (সা:) এর একটি চুল সংরক্ষিত রয়েছে – এই দাবির ভিত্তিতেই এই মসজিদের প্রসার। ১৯৬৩ সালে চুলটি হারিয়ে যাওয়ার খবর রটে। প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সিবিআই প্রধানকে সেদিন রাতেই কাশ্মীর পাঠান। গঠিত তদন্ত কমিটি কারও একজনের চুল নিয়ে হযরতের চুল পাওয়া গেছে বলে ঘোষণা দেয়। শান্ত হয় কাশ্মীর।

বাস্তবতার সঙ্গে যুক্তিহীন আবেগের পার্থক্য বোঝাতে উদাহরণটি দিয়েছি। অনেকদিন থেকে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে লিখবো বলে ভাবছিলাম। কোনো সন্দেহ নেই যে ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষ কাশ্মীর আন্দোলনের পক্ষে। আমার ধারণা আবেগ ও পক্ষপাত না করে নীতি, যুক্তি ও বিবেকের ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করলে (হয়তো) অনেকেরই কাশ্মীর সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যেতে পারে। কয়েকটি উল্লেখ করছি:

১.  কাশ্মীর এমন একটি রাজ্য যেখানে সবকিছুতে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের। কাশ্মীরের অনেক এলাকা থেকে বিদ্যুৎ বিল আদায় করতে পারে না কেন্দ্রীয় সরকার। এটি পৃথিবীর একমাত্র রাজ্য যারা দেশের সংবিধানের ধারা না মানার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন; সেই ধারাটি হচ্ছে ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি না মানার ধারা।  এখানকার নেতারা রাজ্যে শরীয়া আইন চালুর কথা বলেন, কিন্তু দিল্লি পৌঁছে ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যান। বিদেশে অনুষ্ঠিত ভারতের অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাইলেও রাজ্যে জয় হিন্দ স্লোগান দেয়ার ইতিহাস নেই।

২. মুসলিমদের বিরুদ্ধে এথনিক ক্লিনজিং এর অভিযোগে যেসব ঘটনা উপস্থাপন করা হয়, তন্মধ্যে নির্মম ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে ১৯৯০ সালের হিন্দু উচ্ছেদ। কাশ্মীর থেকে সাড়ে তিন থেকে ৬ লাখ হিন্দু উৎখাত, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। মসজিদে ঘোষণা দেয়া হয় – পুরুষ রাখবো না, শুধু যুবতীদের রেখে দিবো। এমন বর্বরতা ও নৃশংসতার উদাহরণ বোধহয় বিশ্বে খুব বেশি নেই।  উৎখাত হওয়া মানুষদের বড় একটি অংশ কখনো ট্রেনের স্লিপার দেখেনি, হাইওয়ে দেখেনি, তীব্র শীত ও তুষারপাতে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে গেছে তারা। একজন মানুষ এগিয়ে আসে নি, একজন নেতা সমবেদনা জানায় নি, কোনো তদন্ত হয় নি, কেউ অভিযুক্ত নন। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

৩. ভারত ভাগের পর কাশ্মীরের নাগরিকত্ব আইনের ধারা হয়েছে, ১৯৪৪ সালের পরে আসা কেউ নাগরিক হতে পারবে না, জমি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না। এর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় পালিয়ে আসা হিন্দুদের স্থান না দেয়া। কিন্তু যুদ্ধ-ফেরত বিপুল সংখ্যক আফগান যোদ্ধা কাশ্মীরের নাগরিক হয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

৪. কাশ্মীরে সাত লাখ দলিত বাস করে। আইন অনুসারে তারা মেথর চাপরাশির চাকরি করতে পারবে, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ভোগ করতে পারবে, কিন্তু নাগরিক হতে পারবে না, জমি কিনতে পারবে না। তাদের সন্তানদের দুই প্রজন্ম উচ্চ শিক্ষিত হয়েও রাজ্যে পদস্থ কোনো চাকরির যোগ্য হয় নি। অথচ এই কাশ্মীরে বিদেশি বিনিয়োগে পাঁচ তারকা হোটেল ও নাইট ক্লাব হয়েছে।

৫.  রোহিঙ্গাদের পর এবার কাশ্মীরের জঙ্গিদের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তারা জানেন না যে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ প্রাপ্ত রাজ্য হচ্ছে কাশ্মীর।

এমন আরও বিষয় উল্লেখ করা যায়। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে যারা কাশ্মীর নিয়ে উচ্চকণ্ঠ তারা কি জানেন তারা কি চান? রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদে দিল্লিতে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছিল। সমাবেশ শেষে ফেরার পথে আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা বিশালাকারের দেবমুর্তিকে শায়েস্তা করে আসেন। এই আবেগময় মানুষদের বলে লাভ নেই আমি জানি। তবু জানতে ইচ্ছা করে –

আপনি চান কাশ্মীর আলাদা দেশ হবে – বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা চান?
পাকিস্তান কি স্বাধীনতার জন্য কাশ্মীরের অধিকৃত অংশ ছেড়ে দিবে? অবশ্যই না।
তাহলে ভারতীয় অংশ স্বাধীন হবে? এই দাবি কি কাশ্মীরের সিংহভাগের? কাবুলিওয়ালা ছাড়া কাশ্মীরের একজন নেতা কি ভারত থেকে আলাদা হতে চায়? কাশ্মীরে যে বিক্ষোভ দেখি তা মাত্র পাঁচটি জেলার চিত্র। কাশ্মীরীদের আর্টিকেল ৩২৫ নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে ভারত থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার মানসিকতা এখনো সিংহভাগের নেই।

কাশ্মীর সমস্যার মূলে রয়েছে আইএসআইয়ের অনুসারী কিছু জঙ্গি সংগঠন, আফগানি ও জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের শক্তিশালী অপপ্রচারের শাখা রয়েছে যা ভারত সহ সারাবিশ্বে তৎপরতা চালাচ্ছে। কাশ্মীরের প্রতিটি সেক্টরে জামায়াত ঢুকে গেছে। এ কারণেই কাশ্মীরে জামায়াতকে ব্যান করা হয়েছে। আমার কাছে অবাক লেগেছে যে, ভোট ব্যাংকের জন্য প্রথমবারের মত ভারতে জাতীয় ইস্যুতে বিভক্তি দেখা গেল! ভারতের অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিদের অনেকেও বিভ্রান্ত!

সবকিছুতেই জামায়াত শিবির খোঁজা নিয়ে যারা কটাক্ষ করেন তারা মওদুদীবাদ সম্পর্কে অবগত নয় বলেই ধারণা করি। কাশ্মীর এর বড় উদাহরণ। আর বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্যও এই জামায়াত শিবিরই সবচেয়ে বড় হুমকি, যদিও তা সবাই উপলব্ধি করেন কিনা আমি সন্দিহান!

কার্টেসি
Abdullah Harun Jewel