আসামে বাঙালি হিন্দুর এই সংকট থেকে আমরা যেন এই কঠিন শিক্ষা নিতে পারি যে, আর আপোষ নয়।

Spread the love
আসামে এন আর সি (NRC) নিয়ে ঘমাসান চলছে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি দরকারি কথা মনে রাখতে হবে।
১) NRC র পৃষ্ঠভূমি আশির দশকের আসাম ছাত্র আন্দোলন।
২) NRC র সূত্রপাত ১৯৮৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও আসামের ছাত্র সংগঠন আসু (AASU) র মধ্যে স্বাক্ষরিত আসাম চুক্তি (Assam Accord) । 


৩) বর্তমান বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ সঠিক বলেছেন যে, রাজীব গান্ধী স্বাক্ষরিত আসাম চুক্তির আত্মা এই NRC।
৪) এই NRC র দ্বারা যারই সুবিধা বা অসুবিধা হোক না কেন, যে কোন রাষ্ট্রের জন্য এটা একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও যুক্তিসঙ্গত কাজ।
৫) কারণ, দেশের একটা সঠিক ও সুনির্দিষ্ট নাগরিক তালিকা থাকবে না? কে দেশের বৈধ নাগরিক আর কে নয় এটা খুঁজে বের করে তালিকাভুক্ত করা কি আবশ্যকীয় কাজ নয় ? এই দেশ কি ধর্মশালা ?
৬) ৮০-র দশকের আসামের ছাত্রদের ধন্যবাদ দেওয়া উচিত যে এই প্রয়োজনীয় কাজটার প্রতি তাঁরা দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে সেই ছাত্র আন্দোলনের নেতারা যখনই ওই আন্দোলনের গুড উইল ভাঙিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা পেয়ে গেলেন তখনই ওই আন্দোলনের লক্ষ্য ভুলে গেলেন। এবং তার ফলে সেই ‘নাগরিক পঞ্জী’ তৈরী করতে ৩২ বছর সময় লাগল।


৭) আসাম পথ প্রদর্শক। এই ‘নাগরিক পঞ্জী’ বা তালিকা সারা দেশের জন্য হওয়া দরকার। এবং তা খুবই যুক্তিসঙ্গত।
৮) এই NRC কোনো রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছায় তৈরী হয়নি। সুপ্রীম কোর্ট এর চাপে তৈরী হয়েছে। তবে একে বাস্তবে রূপায়িত করতে কেন্দ্রের মোদী সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। 
৯) এই NRC র ফলে বাংলাদেশী মুসলমান ও বাংলাদেশ থেকে আগত আসামে বসবাসকারী মুসলমান ও বাঙালি হিন্দুদের জীবনে একটা অনিশ্চয়তা তৈরী হয়েছে।
১০) যারা এটা অস্বীকার করছেন তারা এটা নিয়ে রাজনীতি করছেন। কারণ মনে রাখতে হবে যে, যে ৪০ লক্ষ নাম NRC থেকে বাদ পড়েছে তার মধ্যে ১৩-১৪ লক্ষ হিন্দুর নাম আছে। এটা আমার কথা নয়। আসাম বিজেপির প্রভাবশালী নেতা ও NRC বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই তথ্য জানিয়েছেন।
১১) তবে এটা চূড়ান্ত তালিকা নয়। যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা আরো প্রায় ২ মাস সময় পাবেন উপযুক্ত প্রমাণপত্র দাখিল করে তাদের নাম তোলার।
১২) বিজেপির যে সকল নেতা ও মন্ত্রীরা বলছেন যে হিন্দুরা শরণার্থী, তাদের কোনো সমস্যা হবে না – তারা জেনে বা না জেনে ভুল কথা বলছেন। 

১৩) এই NRC র ফলে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারী দের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। কিন্তু তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো প্রায় অসম্ভব। কারণ বাংলাদেশ স্বীকার করবে না যে ওরা ওদেশের নাগরিক। তবে এদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে। ফলে মুসলিম তোষণ কিছুটা কমবে। তাদের রেশন কার্ড, আধার কার্ড, ইত্যাদি অধিকার বাতিল করে দিতে হবে। শুধুমাত্র Work Permit দিয়ে এদেশে থাকার অধিকার দেওয়া যাবে।

১৪) মোদী সরকার একটা নাগরিকত্ব আইন সংশোধন এর প্রস্তাব এনেছেন। তাতে বলা হয়েছে যে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে যে সকল হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ, ও জৈনরা ভারতে চলে আসবেন তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু এই বিল এখনো সংসদে পাস্ হয় নি। আইন তৈরী তো এখনো অনেক দূরে। সেইজন্যই পাকিস্তান থেকে আগত ৬০০ হিন্দুকে চোখের জল ফেলতে ফেলতে পাকিস্তানে ফিরে যেতে হয়েছে। এবং তাদের মধ্যে অনেকে সেখানে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। 

তাই ভারতের আইনের চোখে এখনো পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ২৪ শে মার্চের পর আগত বাংলাদেশী মুসলমান ও হিন্দু কে একইরকম ভাবে দেখা হবে – যতক্ষণ পর্যন্ত নাগরিকত্ব আইন সংশোধন না হয়।
১৫) মোদী সরকার এই আইন করতে চাইলেও আসামের অসমীয়া ভাষী মানুষরা এই প্রস্তাবিত আইনের তীব্র বিরোধিতা করবে। আসাম বিজেপি হয়ত প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা না করলেও ভিতরে ভিতরে উস্কানি দেবে না – এটা ভাবার মত সরল বুদ্ধি আমার নেই। 

১৬) এই সংশোধনী বিল সংসদে পেশ হলেই বিজেপি ছাড়া সমস্ত রাজনৈতিক দল, মিডিয়া ও বহু সংস্থা এর তীব্র বিরোধিতা করবে এই বলে যে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে এই ভেদভাব করা যায় না। তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদের উভয় সদনে যদি বা এই বিল পাস্ করিয়ে নেওয়া যায়, তার পরেও বিরোধীরা সুপ্রীম কোর্টে যাবে এই যুক্তিতে যে এর দ্বারা আমাদের সংবিধানের মূল কাঠামোর হানি হবে। তারপর সবাই জানেন, কোর্টে গেলে কত বছরের ধাক্কা। রামমন্দির কেস ১৯৪৯ সাল থেকে চলছে। এখনো শেষ হয় নি।  
১৭) সুতরাং NRC লাগু হয়ে যাবে। কিন্তু আসামে বাঙালি হিন্দুরা কতটুকু ছাড় পাবেন তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। 

১৮) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ২০০৫ সালে লোকসভায় বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছিলেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। আজ ঠিক তার বিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন – তা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং তা শুধুমাত্র ভোটের জন্য এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মনে হয় যে মমতার এই উল্টো অবস্থান শুধু মুসলিম ভোটের জন্য নয়। এর দ্বারা তিনি একটা বড় অংশ হিন্দু রিফিউজি ভোটেরও আশা করেন।  
১৯) আসামবাসীর একটা যুক্তি সকলের জানা দরকার। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেছেন,
“১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত বিপুল সংখ্যক বাঙালি হিন্দু রিফিউজির দায়িত্ব তো আমরা নিয়েছি। আর কত নেব ? তাই দেশ ভাগের ফলে উদ্ভূত অতিরিক্ত বোঝা এইবার গোটা ভারত ভাগ করে নিক। আমাদেরকে রেহাই দেওয়া হোক। আসাম চুক্তির শর্ত অনুসারে ১৯৭১ সালের পরে আগত সমস্ত বাংলাদেশীকে, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে, আসাম এর বাইরে নিয়ে যাওয়া হোক। নাহলে আসামের সংস্কৃতির অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”
২০) আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষুব্ধ বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নেতৃত্বের উপর যাঁরা বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দুদের জন্য নাগরিকত্ব দাবী করছেন ও আশ্বাস দিচ্ছেন। তাঁরা একবারও একথা ভাবছেন না যে এত অতিরিক্ত মানুষকে আমরা জায়গা কোথায় দেব? তা কি এখানকার পাবলিক স্পেসে ভাগ বসানো হবে না? তা কি এখানকার মানুষের উপর ক্রমাগত অন্যায় চাপ সৃষ্টি করা হবে না?
তাই আমার ক্ষোভ এই যে এঁরা কেউ বাংলাদেশ থেকে আগত এক কোটিরও অধিক হিন্দুর জন্য সেখান থেকে সংখ্যানুপাতিক জমি দাবী করছেন না। যত দায় শুধু আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মণিপুর ও পশ্চিমবঙ্গের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছেন।
আমার ইচ্ছা হয় সেইসব নেতা ও কর্মীদেরকে বলি, আপনাদের প্রত্যেকের বাড়িতে মাত্র একটি করে রিফিউজি হিন্দু পরিবারকে আশ্রয় দিন। খেতে দিতে হবে না। শুধু থাকার জায়গা দিন। বাকী হিন্দু রিফিউজিদের দায়িত্ব দেশ নেবে।
সুতরাং আমার দাবী,
ক) ১৯৪৭ সাল থেকে যত হিন্দু ওপার থেকে এপারে এসেছে তাদের সংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশ থেকে জমি চাইতে হবে। প্রয়োজনে জোর করে ছিনিয়ে নিতে হবে।
খ) বাংলাদেশে অবশিষ্ট সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সে দেশের ভিতরে ভারতের সেনা মোতায়েন করতে হবে। 
আমার ভোটের দরকার নেই। জনপ্রিয়তার দরকার নেই। সুতরাং কারো মন রেখে কথা বলার দায় আমার নেই। তাই বর্তমান NRC প্রসঙ্গে আমি যতটুকু বুঝেছি তা সবাইকে জানানোর চেষ্টা করলাম।      
পরিশিষ্ট : ২০১৬ সালে আসামে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর সকল হিন্দুত্বপ্রেমীরা খুব উৎসাহিত হয়ে ভেবেছিলেন যে, আসামে বাঙালি হিন্দুর সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। কিন্তু আমি তখনই আমাদের পত্রিকায় লিখেছিলাম যে এই ধারণা অচিরেই ভুল প্রমাণিত হবে। কারণ, আমাদের পূর্বপুরুষরা মুসলমানের দেশভাগের অন্যায় দাবীর কাছে মাথা নত করে যে কাপুরুষতার পরিচয় দিয়ে আপোষ করেছিলেন – তা ছিল পাপ। সেই পাপের শাস্তি আমাদেরকে ভোগ করতেই হবে। সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমাদেরকে করতেই হবে। এটা জগতের নিয়ম। এর কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না। বাপের টাইটেল পাব, রক্ত পাব, সম্পত্তি পাব, মায়ের গয়না পাব। আর তাঁদের কর্মের ফল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকব – তা তো হতে পারে না।
তাই আসামে বাঙালি হিন্দুর এই সংকট থেকে আমরা যেন এই কঠিন শিক্ষা নিতে পারি যে, আর আপোষ নয়। আর মাথা নীচু করা নয়। আর অন্যায় দাবী মেনে নেওয়া নয়। আর পা পিছানো নয়। আর এক ইঞ্চি জমি ছাড়া নয়। পূর্বপুরুষদের কাপুরুষতার পুনরাবৃত্তি আর নয়। সকল হিন্দু যুবককে সংকল্প নিতে হবে – আমার মাথা কেটে যদি মাটিতে পড়ে যায় তবুও দুর্বৃত্তকে এক ইঞ্চি জমিও আর ছাড়ব না। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ নয়। যুদ্ধকে স্বাগত জানাও আমার বাঙালি হিন্দু যুবকরা। ক্লীবতা নির্বীর্যতা ত্যাগ কর আমার ভায়েরা। ভবিষ্যৎ আমাদের। কারণ শাস্ত্র বলেছেন – বীরভোগ্যা বসুন্ধরা।  
https://www.facebook.com/jharu.roy/videos/2137150829859496/