বিবিসির এক প্রতিবেদন পড়ে পাকিস্তানে মদ নিষিদ্ধের সময়টা জানতে পারলাম। ব্যর্থ অযোগ্য জুলফিকার আলী ভূট্ট ইসলামী শরীয়ত অনুসারে পাকিস্তানে মদ নিষিদ্ধ করে জনগণের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে নিজের গদি বাঁচাতে চেয়েছিলেন। ভূট্ট নিজে আকন্ঠ মদ পান করেও পাকিস্তানে মদ নিষিদ্ধ করেছিলেন স্রেফ অশিক্ষিত মুসলমানদের ভোট বা সমর্থন তার নিজের কাছে ধরে রাখতে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হবার পরও মদ সেদেশে ছিল খুবই স্বাভাবিক একটি পাণীয়। করাচির মত শহরে মদের দোকানে গিয়ে মদ খাওয়া ছিল পাকিস্তানের সংস্কৃতির একটি অংশ। পাকিস্তানে ৯৭ শতাংশ মুসলমান হবার পরও মদ নিয়ে তাদের মধ্যে কোন রকম গোড়ামী তো ছিলই না, বরং গোটা পাকিস্তানে অসংখ্য মদের বার ছিল যেখানে সাধারণ নাগরিকরা মদ খেতে যেতেন। বিয়ে বাড়ি কিংবা অতিথি আপ্যায়নেও এক সময় পাকিস্তানে মদ পরিবেশন এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে পাকিস্তানের আজকের প্রজন্ম সেকথা কল্পনাও করতে পারবে না।

ভূট্ট মদ নিষিদ্ধ করার পরই পাকিস্তানে মদ হয়ে উঠল নিষিদ্ধ আর অবৈধ এক জিনিস। শুরু হলো চোরাই মাল হয়ে মদের কারবার। একই সঙ্গে পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য আর ধরপাকড়। অপরিশোধিত মদ খেয়ে মৃত্যু থেকে শুরু করে অন্ধ হয়ে যাবার ঘটনা পাকিস্তানে নতুন কিছু নয়। যদিও পাকিস্তানের সেনা এড়িয়াসহ ভিআইপি জোনগুলো মদ অবাধ আর সহজলভ্য। যত নিগৃহত সাধারণ জনগণের বেলায়। মদ নিষিদ্ধের ঘটনাটি পাকিস্তানের জন্য ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এর কারণ হচ্ছে, একটা শহর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তার চরিত্রগত উদারতা থেকে রক্ষণশীলতার দিকে মোড় নেয়। যে করাচিকে নানা মত ও রুচির একটি অসাধারণ শহর বলা হতো সেটাই হয়ে উঠেছিল কট্টর মৌলবাদীদের দ্বারা নৈরাজ্যময়। ভূট্ট মদ নিষিদ্ধ করার পর মৌলবাদী গ্রুপগুলো মদের বার দোকানে গিয়ে হামলা ভাংচুর সহ নানা রকম ধ্বংসাক্ত অবস্থার সৃষ্টি করে যা ছিল এই শহরের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। আজকের করাচি হচ্ছে নিষিদ্ধ মদসহ নানারকম নেশা দ্রব্যের অবাধ কালো বাজার। মদের দোকান বন্ধ হয়ে পাকিস্তানে আরো দশটা মাদকাসক্ত সমস্যা গড়ে উঠেছে যা দেশটির তরুণদের জন্য সুখবর নয়…। বলতে গেলে জুলফিকার আলী ভুট্টই আজকের পাকিস্তানের সর্বনাশটি করে দিয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর মুজিব সরকার মদ জুয়া নিষিদ্ধ করে দেয়। ভূট্ট পাকিস্তানের সেক্যুলার সমাজতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার হাত ধরেই পাকিস্তান ইসলামী ভাবধারায় মদ নিষিদ্ধ হয়েছিল। একই ঘটনা মুজিবের বেলায় দেখা গেলো। কেউ এখন বলতেই পারেন সেক্যুলার হলেই বুঝি মদ খেতে হবে? না মোটেই নয়। তবে সেক্যুলার হয়ে ক্ষমতায় এসে মদ নিষিদ্ধ করে জনগণের ইসলামী সেন্টিমেন্টকে সুরসুরি দেওয়াও নিশ্চয় সেক্যুলারিজম বলে না? বাংলাদেশের যুব সমাজ ফেনসিডিল থেকে শুরু করে সব ধরণের সিরাপ জাতীয় ঔষধ খেয়ে নেশায় চুঁর হয়ে বসে বসে ঝুমায়। ইয়াবার মত মরণঘাতি ট্যাবলেট খেয়ে একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মদ নিষিদ্ধ। হুবহু পাকিস্তানের মত এখানেও চোরাই পথে দেদারছে মদ আসছে। সেই মদও খাচ্ছে এদেশের মুসলমানরাই। তাহলে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কেন? ইসলামে মদ নিষিদ্ধ বলেই দেশ স্বাধীন হবার পর মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফেনসিডিল, ইয়াবা খেয়ে তারুণ্য শেষ করে দেয়ার বদলে বারে বসে একটা বিয়ার কিংবা দু পেগ মদ খেলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? এদেশে মদের ব্যবসার লাইসেন্স কোন মুসলমানের নামে দেয়া হয় না বলে জানি। অবশ্যই তাকে অমুসলিম হতে হবে। কতখানি ধর্মরাষ্ট্র হলে পড়ে এইরকম আইন করতে পারে ভাবা যায়! রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আর সংবিধানে বিসমিল্লাহ বসানোর বহু আগেই আমরা শরীয়ত বসিয়েছিলাম রাষ্ট্রীয় আইনে বুঝা যাচ্ছে…।

মদ নিষিদ্ধ এবেলেবেল নয় বলেই এদেশের তরুণ সমাজ ড্রাগ খেয়ে নেশা করে। এদেশে সস্তায় বিয়ার উৎপাদনের অনুমোদন দেয়া হোক- দেখবেন কেউ নতুন করে আর ফেনসিডিল ইয়াবা ধরছে না। ইয়াবা বদিরাও বৈধ পথে মদের ব্যবসা করে সংসদে যাবে। তার সঙ্গে ফটো তুললেও কোন প্রধানমন্ত্রীর ইজ্জত যাবে না!…

পাঠক।