তিতুমীর ও বাঁশের কেল্লার ভাঁওতা
——————————————

ওয়াহাবিরা নিজেদের বলে ‘মুয়াহিদ’ বা একেশ্বরবাদী। অন্যদের বলে মুশরিক বা অংশবাদী। ওয়াহাবিদের মূল তত্ত্বগুলো হলো :

১. তারা আল্লাকে হস্তপদ ইত্যাদি অঙ্গযুক্ত মনে করে না |
২. তারা মনে করে দ্বীনের প্রশ্নে যুক্তি-তর্কের কোনো স্থান নেই। দ্বীন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর কোরান-হাদিস থেকেই সংগ্রহ করতে হবে|
৩. আইন প্রণয়নের প্রশ্নে ঐক্যমতকে অগ্রাহ্য করতে হবে। দ্বীনীয় রীতি-নীতিতে সংগ্রাহকের মত গ্রহণীয় নয়। যারা ওসব মতামতে বিশ্বাস করেন তাদের ইসলামে অবিশ্বাসী বলেই গণ্য করতে হবে|
৪. সব রকমের নজিরকে অগ্রাহ্য করতে হবে|
৫. যেসব মুসলমান ওয়াহাবি মতবাদের শরীক নন তাদের গণ্য করতে হবে ইসলামে অবিশ্বাসী বলে|
৬. কোনো পীর-ফকিরকে আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ মাধ্যম বলে স্বীকার করা চলবে না|
৭. পীর-ফকিরের মকবারা বা মাজার দর্শন অবৈধ|
৮. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর ইবাদত বা ভজনা নিষিদ্ধ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ নেওয়াও নিষিদ্ধ। পীর-ফকিরের মাজারে-মকবারাতে কোনো রকম উৎসর্গ নিষিদ্ধ।

সৌদি আরবের ওয়াহাবিবাদ এবং ভারতের সৈয়দ আহমদ বেরলবির তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া আন্দোলনের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। সুতরাং বেরলবির মতবাদকে ‘ভারতীয় ওয়াহাবি আন্দোলন’ বলা যায়। বেরলবির, ভারতবর্ষে ওয়াহাবি মতবাদ প্রচার ও এই দেশকে ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বালাকোটের যুদ্ধে মর্মান্তিকভাবে তিনি নিহত হয়| সৈয়দ আহমদ বেরলবি যখন হজ্বযাত্রার উদ্দেশে কলকাতায় আসে তখন বহু বঙ্গবাসী মুসলমান তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এসব শিষ্যের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বারাসাতের মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর। পেশায় কুস্তিগীর| নদীয়ায় এক হিন্দু জমিদারের অধীনে লাঠিয়ালদের সর্দারি করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয় এবং বিচারে কারাদণ্ড ভোগ করে। কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষে যশোহর জেল থেকে বেরিয়ে সে  বেরলবির ‘তরিকায়ে মুহাম্মদিয়ায় যোগ দেয়। এই তিতুমীর পরবর্তীকালে শরিয়তি বিচ্ছিন্নতাবাদী ইসলামের প্রবেশ ঘটায় বাংলাদেশের লোকায়ত ইসলামে ও সমাজ জীবনে।

তিতুমীর তার এলাকায় তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া তথা বেরলবির অনুসারী ওয়াহাবিদের নিয়ে দল গঠন করে স্থানীয় মুসলমানদের বাধ্য করল নাম পরিবর্তন করতে, আরবীয়দের মতো জোব্বা পরতে, লম্বা দাড়ি রাখতে। উনিশ শতকের শুরুতে বঙ্গদেশের সাধারণ গ্রাম্য মুসলমানের পরিধেয় ছিল ধুতি। তিতুমীর ফতোয়া জারি করল যে কাছা দিয়ে কাপড় পরা চলবে না।  কারণ কোরান-হাদিসের কোথাও ধুতির কথা উল্লেখ নেই! তাই ধুতি পরা বাদ দিতে হবে!! সে আরো নির্দেশ দিল, গোঁফ ছাটতে হবে, দাড়ি রাখতে হবে, কামাতে হবে মাথার মাঝখানটা।  ফতেয়া জারি করল, পুরোপুরি আরবি মুসলমানি নাম রাখতে হবে। স্থানীয় মুসলমানদের পুরনো নাম পাল্টে নতুন নতুন আরবি নামও দিতে লাগল। সেই আমলে মুসলমান প্রজারা হিন্দু জমিদার ও তালুকদারদের বাড়িতে পূজা-পার্বণে ভেট পাঠাত।  অনুষ্ঠানে পাতা পেতে খিচুড়ি ও প্রসাদ খেতো বিনা দ্বিধায়। তিতুমীর এই ভেট পাঠানো ও হিন্দুদের ধর্মানুষ্ঠানে খাওয়া দুটোই বন্ধ করতে বলল। কারণ শরিয়ত অনুযায়ী একজন মুসলমান ‘কেতাবি’ খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের সঙ্গে একসঙ্গে আহার করতে পারে, কিন্তু পৌত্তলিক হিন্দুদের সঙ্গে আহার নিষিদ্ধ! অর্থাৎ তিতুমীরের কাছে হিন্দুদের তুলনায় খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা অপেক্ষাকৃত গ্রহণীয় ছিল।  তার কারণ খ্রিষ্টান-ইহুদিদের ‘আসামানি কেতাব’ (তওরাত, যবুর ও ইঞ্জিল) আছে, হিন্দুদের তো কোনো আসমানি কেতাব নেই! সুতরাং হিন্দুদের সর্বাত্মকভাবে বর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব!! তিতুমীর গ্রাম বাংলার সম্প্রীতির বাতাবরণ বিষাক্ত করে তুলল। নষ্ট করল তৎকালীন ধর্ম-সামাজিক ভারসাম্য। ভীত হয়ে উঠল হিন্দুসমাজ। বহু শতাব্দী ব্যাপী তুর্কি শাসনের দুঃস্বপ্ন থেকে হিন্দুসমাজ তখন সবে জেগে উঠছে!

ইংরেজরা বিধর্মী হলেও মূলত সাম্রাজ্যবাদী। সাম্রাজ্যের স্বার্থেই তারা হিন্দুদের ধর্মাচরণে তেমন হস্তক্ষেপ করত না। সেই আমলে খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রচার ছিল এবং তাতে সরকারি সমর্থনও ছিলো, কিন্তু তারা অন্তত গো-মাংস খাইয়ে হিন্দুদের জাত মারার জন্য ব্যগ্র ছিল না!! হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে পানাহারে আপত্তি করত না। ফলে তিতুমীরের কর্মকাণ্ড মোটেই ভালো ঠেকল না স্থানীয় জমিদারদের। তারা আরেক কট্টরপন্থী আওরঙ্গজেবের উদ্ভব আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে উঠল। তিতুমীরের আচার-আচরণে তারা কথাও বিপদের গন্ধ পেল।  জমিদারা এই নতুন বিভেদপন্থীদের শায়েস্তা করার সুযোগ খুঁজতে লাগল। মুসলমানরা, যারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া লৌকিক সংস্কারগুলো ছাড়তে পারেনি, তারাও তিতুমীরের ওপর বিরক্ত হলো। তারা তিতুমীরের কর্মকাণ্ডকে ভালো চোখে দেখত না | প্রমাণ সমসাময়িক সাহিত্যেও পাওয়া যায়:

‘এই মুল্লুকেউ সেই ওহাবীর ফছাদ
আসিয়া পৌঁছিল কত ঘটিল বিবাদ’

সুত্র:(আকবর-ই-পীর-ই নজদ : আবদুল কাদির)

এরাই বাংলাদেশের ইসলামী জনতার হিরো!!