শ্যামাপ্রসাদ ও তপনদার এঁদো গলিতে ইঁট পাতা।

গত ১৯শে নভেম্বর, হিন্দু সংহতির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক, শ্রী তপন ঘোষ, চিঠি পাঠিয়ে এবং ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মহামহিম রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রীর কাছে আগামী ১০ই ডিসেম্বর, মানবাধিকার রক্ষা দিবসের দিনে, শিয়ালদহ স্টেশনের নাম বদলে, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নামে রাখার আবেদন রাখেন। তপনদার এই আবেদনের অব্যবহিত পরেই, আমি change.org সাইটে একটি অনলাইন পিটিশন তৈরি করি যাতে এই আবেদনের সমর্থককারীরা সেই পিটিশনে সই করে নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করতে পারেন। পিটিশনটি তৈরি করার পরে তপনদা সহ হিন্দু সংহতির অন্যান্যরা বিভিন্ন সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করেন যাতে আরও বেশী সংখ্যক বাঙালী পিটিশনে সই করে এই আবেদনের প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করতে পারেন এবং ২৩শে জুন ও ৬ই জুলাই-এর গণ্ডী থেকে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে মুক্ত করে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে উদ্যোগী হয়।

পিটিশনের বয়স আজ চার দিন হয়ে গেলেও, খুবই আশ্চর্যজনকভাবে, স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা মাত্র এক হাজার। আশ্চর্যজনক এটাই যে হিন্দু সংহতির যারা যারা এই পিটিশন শেয়ার করেছে তাদের, সোশাল মিডিয়াতে, মিলিত ফ্রেন্ডস ও ফলোয়ারের সংখ্যা ২ লাখের বেশী এর মধ্যে শুধু তপনদারই ফেসবুকে ৫০০০ ফ্রেন্ডস, ২০০০+ পেন্ডিং রিকোয়েস্ট, ৩৬৫০০ ফলোয়ার এবং ট্যুইটারে ৪৪০০০+ ফলোয়ার আছে। এই মোট সংখ্যার মাত্র ৫০ শতাংশও যদি এই পিটিশনের আবেদন দেখে থাকে তাহলেও সেটার সংখ্যা ১,০০,০০০ জন। তারমানে এদের মধ্যে মাত্র ১% সমর্থক এই পিটিশনে সই করেছেন।

এই ঘটনার কারণ খুঁজতে গেলে একটু গভীরে যেতে হবে। দিল্লী চিরকালই বাংলাকে বঞ্চনা করে, সুভাস বোস হোক বা শ্যামাপ্রসাদ, তাঁরা চিরকালই বঞ্চিত, উপেক্ষিত। উত্তরভারত শাসিত বিজেপিও দীনদয়াল-কে যতটা গুরুত্ব দেয় শ্যামাপ্রসাদকে তা দেয় না, গান্ধী-প্যাটেলকে যতটা গুরুত্ব দেয়, সুভাস বোসকে তা দেয় না। তারা নিজেরা শ্যামাপ্রসাদকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য কম্যুনিস্টদেরকে অভিসম্পাত দেবে, কারণ এতে রাজনৈতিক লাভ আছে, কিন্তু নিজেরা তাঁদের প্রাপ্য দেবেনা। তাই বিজেপি ‘বাংলা বাঁচাও দিবস’ পালন করার জন্যে রাজঘাটে গান্ধীর সমাধিস্থলকে বেছে নেয়, যে গান্ধী দেশভাগ করে কয়েক কোটি বাঙালীর জীবনে অভিশাপ এনে দেয়ার জন্যে দায়ী।

অথচ শ্যামাপ্রসাদকে যোগ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্য আমরা যখন শিয়ালদহ স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে “শ্যামাপ্রসাদ টার্মিনাস” করার দাবী জানালাম এবং সেই মর্মে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রেল মন্ত্রীকে চিঠি দিলাম, সেগুলো সব ফেসবুকে দিলাম, তখন অবাক হয়ে দেখলাম যে সেই আবেদনে শেয়ারকারী ও স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা সোশাল মিডিয়ায় মোট সমর্থকদের মাত্র ১%। লক্ষণীয় বিষয় হল যে আমাদের সোশাল মিডিয়া সমর্থকদের অধিকাংশই ঘোষিত হিন্দুবাদী ও জাতীয়তাবাদী, তাহলে সংখ্যা এত কম কেন?

এরা শ্যামাপ্রসাদকে ভালোবাসেন না? শ্রদ্ধা করেন না?

তা তো হতে পারে না! তাহলে কেন তাদের এই অনীহা?

আসলে এরা সবাই শ্যামাপ্রসাদকে ভালোবাসেন, শ্রদ্ধাও করেন, কিন্তু তার থেকে বেশি ভালোবাসেন নিজেকে। সেটা অস্বাভাবিক নয়। তাই তপন ঘোষের পিটিশনে সই করলে, ফেসবুকে শেয়ার করলে যদি লোকাল বিজেপি বা আর এস এসের বিরাগভাজন হয়ে যান, আগামী সোনার দিনগুলিতে পদ পাওয়া, পদোন্নতি, এ ছাড়াও বহুরকমের উচ্ছিষ্ট পেতে অসুবিধা হতে পারে – তাই শিয়ালদা স্টেশনকে শ্যামাপ্রসাদের নামাঙ্কিত করার দাবীকেও প্রকাশ্যে সমর্থন করা রিস্ক হয়ে যাবে।

অথচ এরাই আবার সময় খরচ করে, ট্রেন-বাস-ট্যাক্সির ভাড়া খরচ করে, গাড়ির তেল খরচ করে তপনদার এঁদো গলিতে ভাঙা ঘরে আসেন। কারণটাও সবাই জানে। যদি তপন ঘোষ কোনোদিন, যা বাজারে শোনা যায়, বিজেপি তে এসে যায়!

তাই ওই এঁদো গলিতে ইঁট পেতে রাখা।

অনেকে, যাঁরা দূরে থাকেন, বঙ্গ বিজেপির ততটা উচ্ছিষ্টাকাঙ্খী নন, তাঁরাও আমাদের এই প্রচেষ্টাকে সাহায্য করলেন না। তার কারণ তাঁরা শ্যামাপ্রসাদকে যতটা শ্রদ্ধা করেন, তাঁর অবদানের যোগ্য স্বীকৃতি যতটা চান – তার থেকেও বেশি চান যেন তপন ঘোষ ও হিন্দু সংহতি বেশি প্রচার না পেয়ে যায়।

বড় জাহাজের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে ছোট ডিঙিতে চাপার সাহস সবার থাকেনা। তাই বড় জাহাজ, নাব্যতার অভাবে, পাড়ের থেকে বহু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেও সেটা ছেড়ে নৌকা নিয়ে পাড়ে আসার থেকে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে, পাড়ের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ানোটাই নিরাপদ। ডঃ মুখার্জীর দুর্ভাগ্য যে তিনিও, রাম মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের মত, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ‘অ্যাসেট’ হয়ে গেছেন, ফলে এই বঙ্গের বাঙালী তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে তাঁর প্রতি ঋণী হলেও হয় তাঁর অবদান সম্পর্কে অবহিত নয় অথবা অবদানের স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত।

যাক, শ্যামাপ্রসাদ বাঙালির অনেক উপকার করেছেন। এইবার আমাদের ব্যক্তিগত উপকার করলেন। এই পোস্ট দেওয়ার পর আশা করি তপনদার বাড়িতে চা-খরচ কমবে।