“আর কতো প্রান চাই ?”
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ

আমাদের ডাক্তারী শাস্ত্রে মোট দশ টি বিষয় পড়াশুনা করতে হয়েছে। তার একটি “Preventive and Social Medicine”. যে কোনো রোগের ‘অসুখ হবার পর চিকিৎসা” করার চেয়েও সেই রোগের প্রতিরোধের ব্যবস্থা করাই যুক্তি সংগত এবং কম ব্যয় সাপেক্ষ। এই কথাটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অতি সরল এবং মুল কথা। সংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে এই ‘প্রতিরোধ’ পন্থাই অনেক মানুষের প্রান বাচিয়ে দিতে পারে। একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থায় তাই প্রশাসকের ভুমিকায় থাকেন সেই সব চিকিৎসক যারা এই ‘Preventive Medicine” এ বিশেষজ্ঞ। আমাদের কলকাতাতেই এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবার বিশেষ একটি কলেজ আছে, সেন্ট্রাল এভিনিউ এ।

আমি নিজে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “সংক্রামক ব্যাধি’ র ওপরে একটি ডিগ্রী করেছি।  তাছাড়া ২০ বছর একটি দেশের স্বাস্থ্য পরিসেবার প্রশাসক হিসাবে কাজ করে এসেছি। সেই সুবাদে দ্বায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি, যদি রাজ্য প্রশাসন একটু সময় মতো কিছু কিছু রোগের প্রাদুর্ভাব হবার আগেই সেই রোগের ‘প্রতিরোধের ব্যাবস্থা’ নেয় বা নিতো, তাহলে অনেক প্রান অসময়ে ঝরে যাওয়ার হাত থেকে বেচে যেতো।

সম্প্রতি রাজ্যে “ডেঙ্গু’ নামক একটি ভাইরাল সংক্রামক ব্যাধি অনেক প্রান ছিনিয়ে নিয়েছে। সংখ্যাটা কতো তাই নিয়ে ন্যাক্কারজনক চাপান উতোর চলছে রাজ্যের প্রশাসন এবং বিরোধী পক্ষের মধ্যে। প্রশাসন দোষ চাপাচ্ছেন চিকিৎসকদের ওপর। চিকিৎসকদের এক গোষ্টি সরকারের পক্ষে যুক্তি খাড়া করছেন আর এক পক্ষ তার ঠিক উলটো বলে চলেছেন। আমি আমার চিকিৎসক জীবনের প্রায় ৪৩ বছর পার করে এবং পৃথিবীর নানা দেশে ( উন্নত এবং উন্নতিশীল) কাজ করার সুবাদে বলতে পারি ‘ এই ধরনের কথা চালাচালি’ কোনো সুস্থ মানসিকতার পরিচয় দেয় না।

মশা বাহিত রোগ শুধু এই ‘ডেঙ্গু’ই নয়। ভাগ্য ভালো আমাদের দেশে এনোফিলিস মশা বাহিত ‘সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া’ কম হয়। নইলে এই মারন ব্যাধি কতো মানুষের প্রান নিতো তার হিসাব করতে হিমশিম খেতে হতো। ৪ রকমের ডেঙ্গু, নানা রকমের ম্যালেরিয়া, জাপানী এনকেফালাইটিস এগুলি মানুষের প্রান নিয়ে নেয় খুব সহজেই। এই রোগ গুলি হবার পর চিকিৎসা করার খুব বেশী সময় পাওয়া যায় না। মহামারীর রুপ নিলে অসংখ্য মানুষের প্রান যায়। যা আজ যাচ্ছে। সংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কি হবে ? হ্যা, রাজনিতী অবশ্যই হবে।।

সারা দুনিয়ায়, মশা তার শ্রীবৃদ্ধির ধরন পাল্টেছে। ডিটিটি তে মশা অভ্যস্থ হয়ে গেছে। ওতে আর কোনো কাজ হয় না। অনেক ওষুধেও ওদের আর কিছু হয় না। মশার হাত থেকে বাচার একমাত্র উপায়, মশার বাড় বাড়ন্ত হওয়াটাকে সমুলে ধংস করা। তার জন্য চাই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নর্দমা গুলো পরিষ্কার রাখা এবং মশার জন্ম হওয়াটাকে রুখে দেওয়া। সেই কাজ করতে হয় সময়ে। গ্রাম গঞ্জে ডিডিটি দিয়ে আর কোনো লাভ নেই। মশা নিরোধক স্প্রে ছেড়া গত্যন্তর নাই আর তাও করতে হয় মশার প্রাদুর্ভাবের কিছু কিছু নির্দিষ্ট সময়ের আগে। এই কাজের দ্বায়িত্ব, দেশের অঞ্চল প্রধানের, পুরসভার সভাপতির এবং অতি অবশ্যই রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের।

আজ রাজ্যের নান স্থানে যখন বহু মানুষের প্রান যাচ্ছে, তখন সেই ঘটনাকে চেপে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় না নেমে ‘মশা মারার’ ব্যবস্থাই সুস্থ চিন্তা। সেই চিন্তা এবং চেষ্টা অনেক আগেই করা উচিত ছিলো। গ্রামের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি রোগীর চাপে বিকল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা নাজেহাল। আর কতো মানুষের প্রানের বিনিময়ে প্রশাসনিক চৈতন্য হবে??????