বাংলাদেশের আদমশুমারি থেকে দেখা যায়, ১৯৫১-২০১১ সময়কালে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা মাত্র ৩৭ লাখ বেড়েছে, পক্ষান্তরে এই সময়ে মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে ১১ কোটি ১৩ লাখ ৷ হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রজনন হার মুসলমান জনগোষ্ঠীর তুলনায় (প্রায় ১৫%) কম ৷ আলী রীয়াজ সাহেব ২০১৪ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন স্ট্যাটিস্টিক্স নিয়ে একটি অসাধারণ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এর নাম হল “ভয়ের সংস্কৃতি”। তার হিসাব অনুসারে, ২০১১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা হওয়া উচিত ছিল প্রায় ২.৭৯ কোটি ৷ বান্ডবে রয়েছে ১.২১ কোটি ৷ অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি হিন্দু বাংলাদেশের জনসংখ্যা থেকে নিরুদ্দিষ্ট। এই নিরুদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ভারতে অভিবাসী হয়েছে। আকবর আলী খানের “অবাক বাংলাদেশ”-এও এসব নিয়ে একটি চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বলেন, বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক উন্নতির মোহে বিশ্বব্যাপী অভিবাসনের হার দ্রুত বাড়ছে ৷ তবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অভিবাসনের মূল প্রণোদনা আর্থিক নয় ৷ বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতীয় রাজ্যসমূহের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত নয় |

বেসরকারি সংস্থা ‘অধিকার’-এর হিসাব অনুসারে, ২০০৯ থেকে ২০১৩–এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে হিন্দুদের বাস্তুভিটা আক্রমণের ঘটনা ঘটে ৫৬৮টি; মন্দিরের ওপর হামলা হয় ২৪৭টি ৷ বছরে গড়ে ১৬৩টি সহিংস ঘটনা ঘটে ৷ এই হিসাবে বাংলাদেশে গড়ে ২.২ দিনে একটি দাঙ্গা হয়। তবে দাঙ্গার পরিসংখ্যান দিয়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যাবে না; প্রকৃত পরিস্থিতি হলো যে বাংলাদেশে দাঙ্গাকারীদের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য দাঙ্গার প্রয়োজন নেই, এখানে হিন্দুদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ‘ভয়ের সংস্কৃতি” বিরাজ করছে৷ এ প্রসঙ্গে আবার আলী রীয়াজ সাহেবের কাছে যাওয়া যাক। তিনি লিখেছেন, “অনিশ্চয়তা, ভীতি ও শঙ্কা ধর্মীয়ভাবে বাংলাদেশের “সংখ্যালঘু” হিন্দু জনগোষ্ঠীকে জন্মভূমিতেই পরবাসী করে তুলতে সক্ষম হয়েছে ৷ আর এই যে অনিশ্চয়তার ভীতি ও শঙ্কা. এটা তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে কেবল প্রত্যক্ষ সন্তাস থেকেই নয়, বিরাজমান অদৃশ্য, অপ্রত্যক্ষ কিন্তু সদা উপস্থিত একধরনের সন্ত্রাস থেকে ৷ এই সন্ত্রাসকে আমরা বলতে পারি কাঠামোগত সন্ত্রাস৷’

বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৪ হাজার ৮৯ জন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার ধর্মীয় পরিচয় বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রায় ৭.৯২ ভাগ সরকারি কর্মকর্তা হিন্দু | ২০১১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮.৫ ভাগ ছিল হিন্দু ৷ আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে জনসংখ্যার অনুপাতে সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগে হিন্দুদের হার খুব অসন্তোষজনক নয় ৷ তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা নিরাপত্তার অভাবে ভারতে চলে যাওয়ায় হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত বর্তমানে ৮.৫-এ নেমে এসেছে ৷ ২০০১ সালে হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার ৯.৬ শতাংশ ছিল। এই হিসাবে হিন্দুরা জনসংখ্যার অনুপাতে সরকারি চাকরি পায়নি ৷ তবে আকবর আলী খান বলেন, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য কম।

ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভারত ও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি ৷ এরা এখনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ৷ মানুষের জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাচ্ছে না ৷ এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন ও সরকারের জবাবদিহি ৷

(ব্লগ কমেন্ট থেকে, লিখেছিলেন সুমিত রায়)

বাংলাদেশে কোন মৌলবাদী গোষ্ঠী সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি তেমনভাবে দখল করেনি, দখল করেছে মূলত রাজনৈতিক দলগুলো। অধ্যাপক আবুল বারাকাতের বইয়ে এর পরিসংখ্যানটা আছে। কারা দখল করেছে তা নিজের চোখেই দেখিনিন।