জনাব কবীর সুমন, ফ্রান্সের মত দেশে কতজন মুসলমান বাস করে আর সেখানে ইসলামি মৌলবাদ কতখানি সমস্যা বলে মনে করেন? হন্ডুরাসে কতজন মুসলমান বাস করে জানি না তবে সেখানে কেউ শার্লি হেবদোতের মত কার্টুন আঁকলে বাড়ি গিয়ে কেটে দুটুকরো করে আসবে। মনে আছে ফ্রান্সে  শার্লি হেবদোত নামের একটা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ম্যাগাজিন অফিসে ১২জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো মুসলমানদের নবীকে নিয়ে ফান কার্টুন করার অপরাধে। মুহাম্মদকে নিয়ে সিনেমা বানারো পর পরিচালক অভিনেতাদের হত্যা করা হয়েছিলো ইউরোপেই। সবখানেই মুসলমান সংখ্যালঘু ছিলো। নিশ্চিত করেই আপনি ইউরোপে ইসলামী মৌলবাদকে প্রধান সমস্যা মনে করবেন না। কিন্তু বারবার দেখা গেছে মারছেন ওখানে লাশ পড়ছে শশ্মানে! মানে পৃথিবীর যেখানেই ইসলামের ইজ্জ্বত খোয়ানো হচ্ছে অমুনি জায়গা মত আওয়াজ বেরুচ্ছে। আপনার তত্ত্ব অনুযায়ী ভারত যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ সেহেতু এখানে হিন্দু মৌলবাদই প্রধান সমস্যা, ইসলামি মৌলবাদ নয়। তাহলে ডেনমার্কে কেমন করে পত্রিকা অফিসে ঢুকে গুলি করে হত্যা করেছিলো ইসলামি মৌলবাদীরা? বেলজিয়ামে যারা শরীয়া আইনের দাবীতে সহিংস আন্দোলন করেছিলো তারা কি খ্রিস্টান মৌলবাদের প্রতিনিধি? রঙ্গীলা রসূল বইয়ের প্রকাশককে খুন করা হয়েছিলো অবিভক্ত ভারতবর্ষে। কৃষ্ণকে লুচ্চা বদমাইশ বলে একটা বই প্রকাশ করেছিলো মুসলমানরা। সেই বইয়ের পাল্টা জবাব ছিলো রঙ্গীলা রসূল। ব্যস, সারা ভারতে মুসলমানদের অনুভূতি ভেঙ্গে খান খান। বইয়ের জবাব হিন্দুরা বই দিয়েই দিয়েছিলো। কিন্তু মুসলমানরা সেটা চাপাতি দিয়ে দিয়েছিলো। তখনো ভারতবর্ষে হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো। তাহলে?

আমার ফেইসবুক বন্ধু Chakraborty Samrat সমসাময়িক ঘাটনাবলী যা ভারতে ইসলামিক মৌলবাদীরা ঘটিয়েছে তার কিছু উদাহরণ দিয়েছেন তার পোস্টে তাই আর বাড়ালাম না। প্রধান কথা হচ্ছে কবীর সুমন ভারতে ইসলামিক মৌলবাদকে তুচ্ছ করতে চাইছেন। অথচ একমাত্র গ্লোবাল মৌলবাদ হচ্ছে ইসলামিক মৌলবাদ। গোটা ভারতে হিন্দুরা একজন ভগবানকে কেন্দ্র করে কখনই ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না। বাঙালী হিন্দুর কাছে কালিদূর্গা প্রধান হলে অন্যত্র রাম, হনুমান… তামিলারা তো রাবণকে প্রধান ভগবান মনে করে। এরা সবাই হিন্দু কিন্তু ‘মুসলিম উম্মাহর’ মত কোন কিছু নেই যা তাদের বিনি সুতায় বেধে রাখে। বিজেপি কিন্তু এসব কারণেই সত্যযুগের ভারত না চেয়ে ‘আচ্চা দিন’ চায়। আধুনিক ভারত সমৃদ্ধির ভারত চায়। বিজেপি হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল। হিন্দুরা একটা জাতি বড় জোর বলতে চাইছে। কিন্তু প্যান ইসলামিজমের মত মুসলিম বিশ্ব বলার মত অবস্থা নেই। ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ করার যে দাবী সংঘ পরিবারের সেই ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ কেমন তার ব্যাখ্যা তারা কোনদিন দিতে পারবে না। যদি দেয় তাহলে সেটা পার্থিব একটা ব্যাপার দাঁড়াবে। কারণ হিন্দুদের ধর্ম দিয়ে একটি প্লাটফর্মে কখনই আনা যাবে না। কিন্তু ইসলামি খেলাফতের ডাকে সিরিয়াতে সারা বিশ্ব থেকে মুসলিমরা যোগ দিয়েছিলো। এটা সম্ভব হয়েছিলো কারণ ইসলাম একটা রাজনৈতিক ধর্ম। যেমনটা হিন্দুরা তো বটেই খ্রিস্টান বৌদ্ধদের পক্ষে সম্ভব নয়।

আফগানিস্থানে যখন তালেবানরা বুদ্ধ মূর্তি কামান দেগে ভেঙ্গেছিলো তখন সারাবিশ্বে বুদ্ধ অনুভূতি বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। এরকম ঘটনা মুসলমানদের উপর ঘটলে ৫৭টি মুসলিম দেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাত। নিউজিল্যান্ডে মসজিদের হামলার ঘটনায় ‘মুসলিম দেশগুলোর’ সংগঠন ওআইসিসি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলো এবং দাবী করেছিলো এই ঘটনা উগ্রবাদকে আরো বিস্তার করবে। কিন্তু আফগানিস্থানে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি ভাঙ্গার পর, কিংবা রামুতে বুদ্ধ মূর্তি, মন্দির ধ্বংসের পর আমরা সেরকম কোন প্রতিক্রিয়া কোন দেশ থেকে পাইনি। ওআইসির মত কিছু বৌদ্ধরা, খ্রিস্টানরা, হিন্দুরা গঠন করেনি। কেউ বলেনি এই ঘটনার পর বৌদ্ধ উগ্রবাদ আরো বিস্তার লাভ করবে। বার্মার বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ একান্তই বার্মিজ বৌদ্ধদের নিজস্ব আবিস্কার। সেই জাতীয়তাবাদে কোন জাপানী চাইনিজ মঙ্গলিজ একাত্বতা বোধ করেনি। ইউরোপে হোয়াইট সুপ্রিমিটিকে যদিও একদল লোক খ্রিস্টান মৌলবাদ বলে চালাতে চান কিন্তু অসত্য কখনই সত্যের প্রতিদ্বন্দি হতে পারে না এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলাকারী লোকটি নিজেকে ধার্মীক খ্রিস্টান বলেনি নিজেকে। সে স্পষ্ট করেই সাদা চামড়ার মহানত্বকে প্রচার করেছে। কিন্তু মুসলমানদের কথা আলাদা। দেশ যেটাই হোক, মুসলমানরা একটা অভিন্ন জাতিসত্ত্বা অনুভব করে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে। এ কারণেই ইসলামিক মৌলবাদী একটা গ্লোবাল সমস্যা। ভারতে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরও তসলিমা নাসরিনকে পুলিশ প্রহরায় থাকতে হয়। তার বই প্রকাশনা উৎসব ভারতে মুসলিমদের সহিংসতায় পন্ড হয়েছে। সালমান রুশদী তো ইরানে থাকতেন না। ব্রিটিশ এই এক্সমুসলিম লেখককে ইংলেন্ডের মত দেশে গৃহবন্দি থাকতে হয়েছে কাদের ভয়ে জনাব কবীর সুমন?

নিশ্চিত করেই ভারতে হিন্দু মৌলবাদ ভারতে প্রধান একটি সমস্যা। রামবমনি মিছিল রীতিমত সহিংস একটা চেহারা নিয়েছে। ভারতে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায় সেখানে হিন্দু মৌলবাদ শক্তিশালী হবে এটাই স্বাভাবিক। যেখানে বৌদ্ধ, খ্রিস্টানরা সংখ্যায় বেশি সেখানে তাদের প্রভাব, তাদের বিশ্বাস, তাদের কুসংস্কার বড় সমস্যা হবে এটাই সত্য। কিন্তু ইসলামিক মৌলবাদকে বাকী তিনটির সঙ্গে মেলানো যাবে না। মুসলমানরা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অটমেটিক সেই দেশটির পরিচয় হয়ে যায় ‘মুসলিম’। সাধারণ মুসলমানদের হাতেই এটা ঘটে, প্রগতিশীল মুসলমানদের হাতেই এটা ঘটে- এর জন্য ইসলামিক মৌলবাদের প্রয়োজন হয় না। ইসলামিক মৌলবাদ ভিন্ন একটা জিনিস। এটা আরো গভীর আরো ভয়ংকর। ঢাকাতে মাওলানা ফারুকী নামের একটা উদার ইসলামিক বক্তা ছিলেন। তাকে বাড়ি গিয়ে কেটে দুটুকরা করে এসেছিলো ইসলামিক মৌলবাদীরা। ৫৭টা মুসলিম দেশ আছে পৃথিবীতে, এই ৫৭টা মুসলিম দেশে ইসলামিক মৌলবাদীরা বেশি সুবিধা পাবে কিংবা সেখানে ইসলামিক মৌলবাদীরাই বড় সমস্যা। কিন্তু পৃথিবীর বাকী সবগুলো তথাকথিত অমুসলিম দেশেও ইসলামিক মৌলবাদী একটা সমস্যা। যদি শুনেন হন্ডুরাসে একটা লোক আল্লাহো আকবর বলে কাউকে ছুরি মেরে নিজে আত্মঘাতি হয়েছে সেটাকে কি সমস্যা হিসেবে দেখবেন? বর্তমান পৃথিবীতে ‘বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ’ তো একটা বড় সমস্যা কারণ এটি পৃথিবীকে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত করে। এই আহ্বান প্রতিটি জাতি সত্ত্বায় থাকা মুসলিমদের নিজ জাতির সঙ্গে ঐক্যটানে দুর্বল করে ফেলে। বাংলাদেশ স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পরও নিজেদের আইডেন্টি ঠিক করতে পারেনি, তারা মুসলমান নাকি বাঙালী, কোনটি আগে বসবে কোনটি পরে বসবে। এই সমস্যা নাম কি জনাব কবীর সুমন? ভারতবর্ষের মুসলিমদের আইডেন্টি ক্রাইসিস সম্পর্কে আপনি যেন কিচ্ছু জানেন না? এই সমস্যার নাম কি? অবশ্যই এই সমস্যাগুলোর পিছনে ইসলামি মৌলবাদ একটা বড় প্রেরণা। সেই মৌলবাদ ভারতে কোন সমস্যাই হবে না? আপনি যে কিছু ঢেকে রাখতে গিয়ে উদোম হয়ে যাচ্ছেন সেই খবর আছে?