গ্রিকদূত মেগাস্থিনিস যাঁকে সান্দ্রোকোত্তাস বলে বর্ণনা করেছেন , তিনি চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন না৷ ছিলেন চন্দ্রকেতু৷ এই দাবি মান্যতা পেলে নতুন করে লিখতে হবে ইতিহাস, যার কেন্দ্রে থাকবে মগধ নয়, বাংলা৷ আলোকপ্রান্ত হবে চন্দ্রকেতুগড়ের ইতিহাস৷ লিখছেন সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

—মাটির হাজার ফুট নীচে একটা সোনার নৌকা রয়েছে৷ কেউ সেটা তুলতে পারবে না৷ কারণ মালিক রাজি হবে না৷ — মালিক কে ?— কেন , মা মনসা !বলছিলেন এক ভ্যানচালক৷ ঠিকই বলছিলেন৷ এখানে মাটির নীচে আছে সম্পদ , আসলে প্রত্নসম্পদের ভাণ্ডার , যা ‘সে ভাবে ’ তোলার চেষ্টাই হয়নি কোনও দিন৷ আর নৌকার লোককথারও ভিত্তি আছে৷ বিদ্যাধরী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল এই বন্দরনগরী৷ নদী তার খাত বদলে সরে গিয়েছে , কোথাও নদী মজে গিয়েছে৷ বন্দরসভ্যতার অনেক নিদর্শন মিলেছে এই চন্দ্রকেতুগড়ে৷

চন্দ্রকেতুগড় নামে এখানে একটি ঢিবিও রয়েছে , রাজা চন্দ্রকেতুর নামে৷ লোকে বলে , চন্দ্রকেতু আসলে কিংবদন্তি রাজা , সত্যি নয়৷ সত্যি এমন রাজা থাকলে নিশ্চয়ই জানা যেত , প্রমাণ থাকত৷ প্রমাণ আছে বইকি , তবে সে কথা এখনও সে ভাবে প্রচারিত হয়নি৷ গ্রিকদূত মেগাস্থিনিস তাঁর বিবরণ ইন্ডিকায় যাঁকে সান্দ্রোকোত্তাস (Sandrocottus) বলে বর্ণনা করেছেন , তিনি চন্দ্রগুন্ত ছিলেন না , ছিলেন চন্দ্রকেতু৷ আইআইটি খড্গ়পুরের আর্কিটেকচার অ্যান্ড রিজিয়োন্যাল প্ল্যানিংয়ের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক জয় সেনের এই দাবি মান্যতা পেলে অবশ্য অন্যরকম ভাবে লিখতে হবে ভারতের ইতিহাস৷ মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সন্ধি প্রকল্পে চন্দ্রকেতুগড়ে কাজ করছে খড্গ়পুর আইআইটির অধ্যাপকমণ্ডলী , যার মধ্যে অধ্যাপক সেন ছাড়াও রয়েছেন জিয়োলজি অ্যান্ড জিয়োফিজিক্সের অধ্যাপক অরিন্দম বসু, অধ্যাপক প্রবাল সেনগুন্ত , অধ্যাপক অভিজিত্ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ৷ চন্দ্রকেতুগড়ে কী ভাবে নগরায়ণ হয়েছে , তা নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান করা শুরু হয়েছে৷ অন্তত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে (আলেকজান্ডার ভারতে আসেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে ) পাল যুগ পর্যন্ত (দ্বাদশ শতক ) এখানে যে টানা একটি সভ্যতাই ছিল , উত্খননে তার প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে৷

অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুরে এখনও একটি মন্দির আছে৷ কথিত , সেই মন্দিরেই তাল -বেতালকে বশ করেছিলেন বিক্রমাদিত্য৷ পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা গিয়েছে , বিক্রমাদিত্য নামে একজন নন , দু’জন রাজা ছিলেন৷ কিন্ত্ত ইতিহাস গবেষকদের কাছে এখনও প্রশ্ন, কিংবদন্তি রাজা বিক্রমাদিত্যই কি দ্বিতীয় চন্দ্রগুন্ত ? আর রাজা চন্দ্রকেতু? শুকনো বেড়ার গায়ে চাঁপাফুল ফুটিয়েছিলেন যিনি , তাঁর গড়ের অবশেষও তো আবিষ্কৃত হয়েছে৷ তাই চন্দ্রকেতু নামে কোনও রাজা বাস্তবে ছিলেন না , এমন কথা জোর করে বলা যায় না৷ তাল -বেতালের বিক্রমাদিত্য যদি দ্বিতীয় চন্দ্রগুন্ত মৌর্য হতে পারেন , তা হলে বেড়ার গায়ে চাঁপাফুল ফোটানো রাজাই বা গল্পকথা হবেন কেন ?‘সান্দ্রোকোত্তাস যে চন্দ্রকেতু ছিলেন , তার অনেক প্রমাণ আমরা পেয়েছি৷ বিভিন্ন সময়ে তিনটি ইন্ডিকা লেখা হয়েছিল৷ মেগাস্থিনিসের বিবরণ আমরা সংগ্রহ করেছি৷ এ ছাড়াও আমরা পড়েছি এরিয়েন এবং টলেমির বিবরণ৷ সেই বিবরণে নদীর যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে , তা নদিয়া জেলা৷ তবে বর্তমান নদিয়া নয় , পদ্মা যেখান থেকে ভেঙেছে , সেখান থেকে পাবনা হয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত৷ আমরা এমন অনেক প্রমাণই পেয়েছি , যা থেকে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি , সান্দ্রোকোত্তাস আসলে চন্দ্রকেতুই৷ ’ বললেন অধ্যাপক সেন৷ তা হলে পলিবোথরা কি পাটলিপুত্র নয় ? যদি না হয় , তাহলে সেটি কী ? উত্তরে সেন বলেন , ‘এ নিয়ে আরও গবেষণা করতে হবে৷ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ সম্পূর্ণ করতে পারেননি৷ এখন নতুন করে কাজ শুরু হয়েছে৷ ’যুগে যুগে গবেষণায় অনেক পুরোনো ধারণা বদলেছে৷ উত্খননে উঠে এসেছে অজানা কথা৷ ১৯২০ সালে উত্খননের আগে জানাই ছিল না সিন্ধু সভ্যতার কথা৷ আরও উত্খননে জানা গেল , সেটি সিন্ধুসভ্যতা নয় , সিন্ধু-গাঙ্গেয় সভ্যতা৷ কিন্ত্ত আর্যরা বাইরে থেকে (পড়ুন ইউরোপ ) ভারতে এসে এ দেশকে সভ্য করেছে , ঔপনিবেশিক এই তত্ত্বই আঁকড়ে থেকেছে ভারত৷ ১৯০৭ সালে যে চন্দ্রকেতুগড়ের সন্ধান পাওয়া যায় , আজও তা পুরোপুরি উত্খনন করা হয়ে উঠল না৷ প্রশ্নটা এখানেই৷ গঙ্গারিডি বা গঙ্গারিডাই (গঙ্গাহূদি , গঙ্গাঋদ্ধি ?) নামে যে সভ্যতার কথা গ্রিক পর্যটকদের বিবরণীতে পাওয়া গিয়েছে , তা নিয়ে কোথাও কোনও প্রচারই নেই৷ অধ্যাপক সেন বলেন , ‘আসলে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সভ্যতা যেতে পারে , কোনও ইতিহাসবিদ সেটা ভাবতেই চান না৷ তাই অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ উপক্ষিত রয়ে গিয়েছে৷ শুঙ্গরা নির্দিষ্ট কোনও উপজাতি ছিল না , কিন্ত্ত তাদের উত্স পূর্ব ভারত৷ তারাই ছড়িয়ে পড়েছে গ্রিস পর্যন্ত৷ সেই প্রমাণও আমরা পেতে শুরু করেছি৷ ’ আইআইটির রিপোর্ট অনুযায়ী , এখানে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক অর্থাত্ মৌর্যপূর্ব যুগ থেকে পাল -সেন যুগ পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন মিলেছে৷

দীর্ঘ কয়েক বছর বেড়াচাঁপা -চন্দ্রকেতুগড়ে গবেষণা করেছেন নমন আহুজা৷ এখন তিনি দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড ইস্থেটিক্সের ইন্ডিয়ান আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচারের অধ্যাপক৷ সান্দ্রাকোত্তাস আসলে চন্দ্রকেতু, এমন দাবির প্রেক্ষিতে আহুজা বলেন , ‘এমন কী তথ্য পাওয়া গিয়েছে যাতে এক দিনের সব গবেষণা নস্যাত্ করে দেওয়া যায় ? তেমন প্রমাণ আগে দেখি , তার পর এ নিয়ে মন্তব্য করব৷ ’উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বেড়াচাঁপায় রয়েছে খনা -মিহিরের ঢিপি৷ আর চন্দ্রকেতুগড়ে তেমন কিছু এখন দেখা যায় না৷ তবে সংরক্ষিত এলাকাটি রয়েছে৷ দেগঙ্গা থানার অধীন ব্যস্ত মোড় বেড়াচাঁপা থেকে দক্ষিণে বড়জোর এক কিলোমিটার গেলেই চন্দ্রকেতুগড়৷ ফলকে লেখা ইতিহাস৷ ইতিহাস লেখা রয়েছে মাটির নীচেও৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহালয়ের উদ্যোগে চন্দ্রকেতুগড়ে উত্খনন করা হয়েছিল ১৯৫৬ -৫৭ এবং ১৯৬৬ -৬৭ সালে৷ তবে সেটি আচমকা হয়নি৷ স্থানীয় বাসিন্দা তারকেশ্বর ঘোষের অনুরোধে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের পক্ষ থেকে ১৯০৬ সালে এই জায়গা পরিদর্শনে আসেন অ্যালবার্ট হেনরি লংহার্স্ট৷ তার তিন বছর পরে এখান থেকে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করে নিয়ে যান পুরাতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ১৯২২ -২৩ সালে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের পূর্বাঞ্চলীয় সুপারিন্টেন্ডেন্ট কে এন দীক্ষিত এই স্থান নিয়ে প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করেন৷ তার পর ১৯৫৫ সালে চন্দ্রকেতুগড়ে উত্খনন হয় কে জি গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে , কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে৷ উত্তর ভারতে মৌর্যযুগ শুরুর আগের সময়ের মৃত্পাত্র পাওয়া যায় উত্খননে৷ ১৯৬০ সালে এখান থেকে মৌর্য ও গুন্ত যুগের বিপুল পরিমাণে মাটির তৈরি পুরা নিদর্শন উদ্ধার হয়৷ তার পরও খনন হয়নি৷ কারণ ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এই বিষয়টি মোটেই গুরুত্ব পায়নি৷ তা ছাড়া পূর্ব পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ ) তৈরি হওয়ার পরে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে খনন করা সম্ভবও ছিল না৷ রাজ্য সরকারও তখন এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি