“হিন্দুদের সহিষ্ণূতা”— কি বিচিত্র এই দেশ”
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ

ওয়াইসি নামে এক ভদ্রলোক যদি পাবলিক মিটিং এ বলতে পারে ‘তাজমহল আমাদের, আমরা তাজমহল নিয়ে চলে যাবো (কোথায়? সে প্রশ্ন তাকে করবেন) , তাহলে সে কথা সাম্প্রদায়িকতা হয় না।

জাকির নায়েক যা কুৎসা বলে বেড়ায় হিন্দুদের সম্পর্কে তা সাম্প্রদায়িক হয় না।

মসজিদ গুলোতে নামাজ অন্তে ‘পুতুল পুজার’ বিরুদ্ধে যা বলা হয় তা সাম্প্রদায়িকতা হয় না।

হিন্দুদের পুজা মন্ডপ ভেংগে পুড়িয়ে দিলেও তা সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে পড়ে না।

আদিবাসী হিন্দুদের ভুলিয়ে ভালিয়ে, যীশুর মুর্তিকে শ্রী কৃষ্ণের মতো সাজিয়ে আদিবাসীদের বিশ্বাস করানো হয় যে শ্রী কৃষ্ণ এবং যীশূ একই-তাতে সাম্প্রদায়িকতার কোনো গন্ধ বাম পন্থী রা খুজে পান না, কিছু ধর্মান্ধ হিন্দু গরুর মাংস সন্দেহে একজন মুসলমানকে মারলে সারা ভারতের সেকুলার রা, ফিল্মী দুনিয়ার তাবত নায়ক এবং তাদের সহধর্মিনীরা তাদের জন্ম ভুমিকে বাসের অনুপযুক্ত মনে করেন এবং বাম পন্থী “আতেল”গুলো (পড়ুন ইন্টেলেকচুয়াল) তাদের তৃতীয় শ্রেনীর সাংষ্কৃতিক সৃষ্টির জন্য পাওয়া পুরষ্কার ফিরিয়ে দেন–কারন একটা হিড়িক তুলে হিন্দুরা কতো ছোটজাতের প্রানী সেটা প্রমান করা। কিন্তু শুধু মাত্র হিন্দু এই দোষে একটা কিশোর হিন্দুকে পোড়ালে কোনো প্রতিবাদ করেন না ওই “আতেল গুলো”।

বাংলা দেশে শুধু মাত্র হিন্দু হওয়ার জন্য একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিরীহ সেবাইত তার প্রাতভ্রমনের সময় কুপিয়ে মারলে সেটা সাম্প্রদায়িক হয় না।

হায়দ্রবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পড়ুয়া, যিনি কিনা ‘ইয়াকুব মেননের’ ফাসির সাজার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ম্মিছিল করেন এবং আরো বহু পড়ুয়াকে হিন্দু বিদ্বেষী করে তোলেন, তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত করার পর তার বৃত্তি বন্ধ হলে এবং তার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে ভারতের তাবত নেতা নেত্রীরা সরকারি কাজ ফেলে হায়দ্রবাদ ছোটেন, আর হিন্দু নেতাদের গালা গাল করেন। অযোধ্যাতে ‘করসেবা’ করে বাড়ী ফেরার পথে গোধরাতে ট্রেনের কামরা বাইরে থেকে বন্ধ করে ৫৭ জন হিন্দুকে পুড়িয়ে মারলে কারো কোনো দোষ হয় না ।

সারা জীবন একজন তথাকথিত শিল্পী সমস্ত হিন্দুদের দেব দেবীদের নগ্ন অশালীন ছবি একে তার অরুচিকর বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিলেন আর রাশি রাশি অর্থ উপার্জন করলেন, সেটা কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা হলো না। কিন্তু তার প্রতিবাদ করায় হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক এবং “অসিহিষ্ণু” বলে পরিচিত হলো ।

বাংলাদেশের একজন মহিলা লেখক তার নিজের ধর্মের কুসংষ্কার এর বিরুদ্ধে লেখনী ধরায় তাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া স্বত্ত্বেও একজন ধর্মান্ধ সমাজ বিরোধীকে দিয়ে তাকে হেনস্তা করিয়ে ভারত ছাড়া করা হলো। পরবর্তীতে সেই সমাজ বিরোধী টাকেই এম পি করে লোক সভায় পাঠানো হলো ।

বর্তমান ভারতে “সহিষ্ণুতা আর অসহিষ্ণুতার” কেচ্ছা আর কতো লিখবো ? সময় তো অতি অবশ্যই নষ্ট হয় আর আঙ্গুলে অবশ্যই ব্যাথা হয়। ভারতের হিন্দুদের অবস্থা হয়ে গেছে “সাত কাহন শীবের গীত গাওয়ার মতো”। লিখতে বা বলতে ইচ্ছা করেনা, আবার সেই গীত না গেয়ে মনকে প্রবোধ দেওয়াও যায় না ।

জানি কোণো লাভ নেই। ;সেই রাজা লক্ষ্মন সেনের সময় থেকেই চলে আসছে প্রথা। কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই নিজের মাতৃ ভুমিকে দাও অপর বিধর্মীর কাছে। নিজের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিল্লীর বাদশার সংগে খাতির বানাও। সংখ্যা লঘুদের ভোট টানার জন্য তাদের বাড়ীতে, ঘর্মীয় স্থানে হাজির হয়ে তাদের স্তব স্তুতি করতে দড় হিন্দু দের কিছু বলা মানেই “ওলু বনে মুক্তা ছড়ানো” আর বাম পন্থী “আতেল গুলোর’ খিস্তি খেউড় শোনা, আর ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা গায়ে মেখে ঘুরে বেড়ানো। এর বেশী লাভ কিছু নেই।

বাঙ্গালীর বোধ কোনো দিনই হবে না। বৌদ্ধ আমলে দল বেধে বৌদ্ধ হয়েছিলো, ইসলামী শাসনে আবার ধর্ম পাল্টালো, কিছু দিন হিন্দু থাকার পর এবারে আবার ইসলাম গ্রহন করা, এই তো ভবিতব্য। তা এতে আর অসুবিধা কোথায়????

সারা পৃথিবীতে এমন একটি দেশ বা জাতি খুজে পাবেন না, যারা নিজেরা সংখ্যা গরিষ্ট হওয়া সত্বেও দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হিসাবে বাস করতে ভালো বাসে। গনতান্ত্রিক প্রথায় সংখ্যাগরিষ্টরাই শাসন করবে এটাই সব জায়গায় স্বাভাবিক। তারা সংখ্যা লঘুদের রক্ষনা বেক্ষেন করবে সেটাও স্বাভাবিক। কিন্তু সংখ্যা লঘুরা সব সরকারী সাহায্য পাবে আর শুধু মাত্র সংখ্যা গরিষ্ট সেই সুবাদে সব কিছু “খুটে খাও” এই নিয়মে চলবে এটা কোন গন্তাতান্ত্রিক প্রথা??? আর সেই জন্য কোণো রকম হেল দোল কারো নেই।

ইতিহাসে এমন নজির অনেক আছে ,যেখানে একটি দেশের আদি বাসিন্দারা বিদেশীদের পদানত হয়ে সেই বিদেশীদের কাছে তাদের সামাজিক , ধর্মীয়, প্রাচীন সংষ্কার, ন্যায়, নীতী সব কিছু বিসর্জন দিয়ে এক নতুন সংষ্কার, সামাজিক নীতি, ধর্মীয় অনুশাসন কে গ্রহন করতে বাধ্য হয়েছে। সেই পরিবর্তন যে ভালো হয়েছে একথা বলা যায় না । বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই বিজিতেরা মানসিক হতাশায় ভুগছে। পেরু, কানাডা, দক্ষিন আমেরিকার অনেক দেশে গেলে এই হতাশাগ্রস্থ আদিবাসীদের দেখা পাওয়া যায়।

আমাদের দেশে, এই সুপ্রাচীন ভারত বর্ষে, যে দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ, এমনকি বিভিন্ন খাদ্যাভাস, পোষাক পরচ্ছিদ ইত্যাদি থাকা সত্বেও এক সুতো দিয়ে গাঁথা একটি বিভিন্ন ফুলের মালার মতো বাস করেছে এবং সেই সুতোটা আর কিছুই নয় এক প্রাচীন ধর্মীয় দর্শন (সনাতন দর্শন), সেই উন্নত দর্শনের উত্তরাধীকারীরা আজ ছন্ন ছাড়া, বিপথ গামী এবং এক ‘দাস সুলভ’ মনোবৃত্তির মোহে আচ্ছন্ন, এটা ভাবতে বিস্ময় জাগে সেটা বলাও খুম কম বলা হবে।

সেই জন্যই বোধ হয় আলেকজান্ডার বলেছিলেন, “সত্য, সেলুকাস ,কি বিচিত্র এই দেশ” ।