“হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষার সমস্যা”
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ

(ভুমিকা)

১০০০০ বছর আগে থেকে শুরু করে যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ৫০০ বছর,অর্থ্যাত প্রায় ৯৫০০ বছর ভারতবর্ষে হিন্দুরা ভালোই ছিলো। নিজেদের মধ্যে মারামারি অবশ্যই করেছে। কিন্তু নিজের দেশ বা ভীন ধর্মী বর্বরদের কাছে বিকিয়ে দেয় নি। শত অসুবিধার মধ্যেও নিজের ধর্ম, সংষ্কার বাচিয়ে রেখেছে।

৫০০ খ্রীষ্ট পুর্বাব্দে পারস্য সম্রাট সাইরাস ভারতবর্ষের উত্তরপশ্চিম অঞ্চল (বর্তমান আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার কিছু অঞ্চল (উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তান,তুর্কমেনিস্তান = যা ছিলো রাজা তক্ষকের (ভরতের বড়ো পুত্র= রাজধানী ছিলো তক্ষশিলা) রাজ্যের এক অংশ= তক্ষকখন্ড, সেই সব অঞ্চল দখল করে নেয়।।  

সম্রাট সাইরাস অবশ্য, খাইবারের আশা পাশ দিয়ে উপরে চলে গিয়েছিলো। ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেননি। পারস্য তখন বৈদিক ধর্ম প্রভাবিত, অগ্নি উপাসক। সেই জন্য তার দেশ বিজয়ে ধর্মীয় উন্মত্ততা ছিলো না। তবে তার সেই আক্রমনে বৈদিক ভারতের যে ক্ষতি হয়েছিলো, তাকে তুলনা করা যায় ভুগর্ভস্তরে “ট্যাক্টনিক প্লেট” এর নড়ে ওঠার মতো। বৈদিক মানুষগুলো, যারা পামীরের ওপাশে থাকতো তারা সেই ভুকম্পে আলোড়িত হয়েছিলো। বেশ কিছু বিদেশী অসভ্য যুদ্ধবাজ এবারে জানতে পারলো যে, বৈদিক সভ্যতাকেও নাড়া দেওয়া যায়। বেশ কিছু লুটেরা বাহিনী ছিলো ওখানকার নানা উপজাতির মধ্যে। তারা অবশ্যই ঘোলা জলে মাছে ধরতে নেমে পড়েছিলো।

এর পরবর্তী আগ্রাসী হলেন, সুদুর গ্রীস থেকে আগত (মহান?) আলেকজান্ডার। সম্রাট সাইরাসের বংশধর দারায়ুসকে মেরে, স্থিতিশীল পারস্য সাম্রাজ্যেকে রাজনৈতিক ভাবে নড়বড়ে করে, সমগ্র বৈদিক প্রভাবিত দেশগুলিকে রাজনৈতিক ভাবে দফা রফা করে, সেই আমলের পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং ঐশ্বর্য্যশালী শহর ‘পার্সিপোলিস’ পুড়িয়ে দিয়ে, রাজা ভরতের ছোট ছেলে ‘পুষ্কল’ এর বংশধরদের রাজ্য (রাজধানী = পুষ্কলাবতী= বর্তমান ব্যাক্ট্রিয়া অঞ্চল) ধংস করে, এসে পৌছুলেন খাইবার গিরিপথের ওপারে। শ্রী কৃষ্ণের আত্মীয় বংশ ‘অশ্বসেনা’র রাজারা অমিত বিক্রমে আলেকজান্ডারকে বাধা দিলেন। শেষ রক্ষা হলো না। খাইবারের এপারে তক্ষশীলা, রাজা তক্ষশীল (রাজা ভরতের বড়ো ছেলে ‘তক্ষক’ এর বংশধর) আলেকজান্ডারের সংগে রফা করে খুলে দিলেন খাইবারের পথ। উদ্দেশ্য তক্ষশীলার পুর্বের রাজ্য, পাঞ্জাবের রাজা পৌরব বংশের ধ্বংস। হলোও তাই। মালী রাজার সংগে যুদ্ধে আহত আলেকজান্ডার ফিরে গেলেন ব্যাবিলনে। সেখানেই মারা গেলেন ৩ মাস পর।

আলেকজান্ডার যা করে গেলেন তাহলো বৈদিক সভ্যতার সুতিকাগৃহের সন্ধান পৌছে দিয়ে গেলেন সারা মধ্য এশিয়াতে। খবর পৌছে গেলো ক্রমে পামীরের উত্তরে বর্বর শকদের, হুনদের কাছে। আর গেলো আরব দুনিয়ায়। আরব বেদুইন যুদ্ধ বাজ দস্যুরা তখনো এক ধর্মীয় ছাতার তলায় এসে মানুষ মারার খেলায় মেতে ওঠেনি। এলো শকেরা, হুনেরা, কুষানেরা। এরা বৈদিক ভুমিকে অপবিত্র করলো ঠিকই,কিন্তু ক্রমে সেই বৈদিক ধ্যান ধারনাকে আশ্রয় করে ভারতবাসী হয়ে গেলো।

যারা ভারতে এসেছিলো তারা তো হিন্দু হলো। কিন্তু যারা আসেনি, সেই যুদ্ধবাজ বর্বর রক্তপিপাসু অসভ্যরা কি করলো? এরা বৈদিক রাজাদের অধীনে ছিলো, এদের শায়েস্তা করতে বিক্রমাদিত্যকে পামীর পার হতে হয়েছিলো। তাই পামীরের ওপাশের অসভ্য জাতি গুলির রাগ ছিলো। এরা আরবী বর্বরদের ধর্মকে গ্রহন করলো ,যখন ওই আরবী ‘জেহাদী’ রা পারস্য জয় করে ওদের দেশ গুলোতে গেলো। ওরা বাধা তো দিলো না বরং  দেখলো ওদের বর্বর মনোভাবের সংগে নিজেদের মিল আছে। ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’ এই আর কি। তৈমুর, সুবুক্তিগীন, তার ছেলে মাহমুদ (গজনী),ঘোরী, বাবুর দুরানী, খলজী, আবদালী, সুরী—- এই সব নামধারী যতো রক্তপিপাসু, লম্পট, তারা সবাই জেনে গেছে, খাইবারের ওপাশে আছে সারা পৃথিবীর ধর রত্ন, সুন্দরী নারী। কিন্তু ওই হিন্দুগুলো আর আগের মতো যুদ্ধ করতে পছন্দ করে না, প্রতিরোধ করতে অপারগ, কারন ওরা “বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি ‘ বলে দিন রাত ‘শান্তি শান্তি করে’। হিন্দু রাজাদের মতো ওরা আর ‘মারতে এলে মারে না, পড়ে পড়ে মার খায়’।

ব্যাস আর যায় কোথায়। আরবী বর্বরদের ‘দাস’ ওরা। প্রভুর কথা মতো, ওই দাস গুলো ‘জেহাদী মন্ত্র’ সার করে একের পর এক ঝাপিয়ে পড়লো ‘বৈদিক ভারতের” ভর কেন্দ্রে, সিন্দু, যমুনা,গংগার তীরে তীরে ,ইন্দ্রপস্থে, কনৌজে, মথুরায় এবং সুদুর গৌড়বংগে। সেখান থেকে দক্ষিনে। ৭১২ থেকে শুরু করে ১১০০ সালের মধ্যে (৪০০ বছরের কম সময়ে) সারা ভারতবর্ষ ‘মানব সভ্যতার পরাকাষ্টা বৈদিক ভারত’ হয়ে গেলো এক জগাখিচুড়ি ভারত ভুমি। যে ভুমিতে আর বৈদিক মন্ত্র উচ্চারন করার মতো মানুষ রইলো না। উচ্চারিত হতে থাকলো শুধু “আরবী” মন্ত্র।