হগোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের জন্য রাস্তায় টাকা তুলছিল কিছু স্বেচ্ছাসেবী ছেলে-মেয়ে। পথচারীরা একদমই পাত্তা দেয়নি তাদের। কিন্তু এরপরই রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য শীতবস্ত্র আর নগদ অর্থ তোলার জন্য পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ থেকে মাইকিং শুরু হলে মানুষের ঢল নেমেছিল। গাট্টি-বোচকা নিয়ে মানুষ মসজিদের ত্রাণ তাহবিলে এসে জমা করছিল। গোটা বাংলাদেশের চিত্রটা ছিল এমন। দেশের সাঁওতালদের জন্য আমাদের একটা পয়সা বের হবে না কারণ সাঁওতালরা তো মুসলমান না! রোহিঙ্গারা মুসলমান। পাকিস্তানীরা মুসলমান। ভারত হিন্দু।…

৭১ সালে শরণার্থী হয়ে ভারতে নয় মাস থাকা একজন রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। ভারত মোটা চাল আর পানির মত ডাল খাইয়েছে নয় মাস- তাচ্ছিল্য ভরে তিনি সব সময় এই কথাটা বলতেন। পূর্ব বাংলা থেকে এসেছে শুনলেই কোলকাতার বাস-ট্রামে কোন পয়সা নিতো না। লোকজন কৌতূহল ভরে জানতে চাইত, আপনি ‘জয় বাংলার’ লোক?… এই শোন, আমাদের মাসির দেশের লোক, কোন পয়সা নিবি না…। কিন্তু ‘মাসির দেশ’ কথাটাতে তীব্র আপত্তি তার! এটা নাকি ‘দাদাদের’ এক ধরণের আধিপত্যতার বর্হিপ্রকাশ…।

ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে জেলে নৌকা উল্টে ৩০ জন বাংলাদেশী জেলে যখন মৃত্যুর মুখে পতিত তখন ভারতীয় নৌবাহিনী জাহাজ তাদের উদ্ধার করে বাংলাদেশের কাছে হস্থান্তর করে। বিলিভ ইট অর নট, এই ঘটনাটিতেও লোকজন ভারতীয় নৌবাহিনীর উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রসন করেছে। তারা ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাংলাদেশ সীমান্তে কি করছিল?

এখন পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় ১৩০ জন পাহাড় ধসে মারা গেছে! ভাল করেই জানি আমাদের ক্রিকেট প্রজন্মকে এই মৃত্যু একটুও ছুঁবে না। তাদের ইতিহাস শুরু হয়েছে ২০১৫ বিশ্বকাপ ক্রিকেট থেকে! সেদিন আইসিসি জানত বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে তাই আগে থেকেই আম্পায়ারদের বলেছিল তোমরা ভারতের পক্ষে খেলবে…। সেই থেকে ভারত চুর, মালাউনরা চুর…। কালকের ম্যাচে যাবতীয় দেশপ্রেম উজার করে দিয়ে দেয়া হবে টেলিভিশনের সমানে বসে। এমন কি ভারত ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলংকার সঙ্গে হেরে গেলেও আমরা জিতে যাই…। স্বদেশী সাঁওতাল, চাকমা, হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের চেয়ে বিদেশী রোহিঙ্গাদের প্রতি আমাদের যে বিপুল দরদ, এবং এই একতরফা দরদের যে উৎস তা থেকে ক্রিকেট বাইরের কিছু নয়। ভারতের বিপক্ষে গ্যালারিতে ‘মালাউনের বাচ্চা’ হয়ে যাবার পর ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহো আকবর’ কেন বাদ যাবে? পাকিস্তানের ‘জলিল চাচা’র ইমামতিতে গ্যালারিতে নামাজ পড়ে ভারতের ‘সুধির গৌতমকে’ একটু ধাক্কা দেয়ার মধ্যে যে অন্ধকারটুকু রয়েছে তাকে আড়াল করতে রোহিত শর্মার বিরুদ্ধে নো বল, ফালানী, তিস্তা, বাণিজ্য ঘাটতি… এরকম হাজারটা কারণ সামনে আনতে হয়। কিন্তু আসল সত্যটা তো আমরা মনে মনে জানি…। ভারত বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যাচ ঘিরে যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের খেলার সময় যে উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, আঞ্চলিকতা দেশের মানুষের মধ্যে জাগিয়ে উঠানোর চেষ্টা চলছে তার বিরুদ্ধে আগেও লিখেছি ভবিষ্যতেও লিখে যাবো। ফেইসবুকের মানবতাবাদী ব্লগারদেরও যখন সিজনাল ক্রিকেট জ্বরে উম্মাদ হতে দেখি তখন হতাশ হতেই হয়। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে খেলাতেও আমাদের লক্ষ রাখা উচিত কোন বর্ণবাদী বিদ্বেষ যেন প্রকাশিত না হয়। মানুষ দিনকে দিন সভ্য হবে। পৃথিবীর সভ্য নাগরিকদের মত আমাদেরও চিন্তাগত পরিবর্তন জরুরী। খেলা হোক বিনোদন। ‘বার্সা-রিয়াল মার্দ্রিদ’ থেকে ‘ভারত-বাংলাদেশ’ যেন উত্তেজনা আর প্রতিযোগিতায় বেতিক্রম হয়ে ধর্ম জাতীয়তাবাদকে টেনে না আনে। দুই দেশের সব ক্রিকেট ভক্তকেই সেটা মাথায় রাখতে হবে…।

লেখক, পাঠক।