কোলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস প্রাঙ্গনে আম গাছের নিচে বেলপাতা সিঁদুর দিয়ে একটা পাথরকে পুজা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য মুক্তচিন্তা শিল্প সাহিত্যের স্থানে কৌশলে ধর্মকে ঢুকিয়ে দেয়া। অভিনব কিছু নয়, কিন্তু আমাকে যেটা আনন্দিত ও আশ্বস্ত করেছে,- কোলকাতার বুদ্ধিজীবীদের তুমুল প্রতিবাদ দেখে। ভিডিওতে দেখেছি তারা ক্যামেরার সামনে প্রকাশ্যে বলছেন, এটা ধর্মকর্ম করার জায়গা নয়, এখানে মুক্তচিন্তা শিল্প সাহিত্যের আলাপ হয়, ধর্ম থাকবে ধর্মাস্থানে এখানে কেন? নবীন প্রবীন সব সাহিত্য শিল্প প্রেমিই দেখলাম তীব্র আন্দোলন শুরু করে এটাকে (আম গাছের নিচে পাথরটা) এখান থেকে সরিয়ে দেবার কথা বলছেন বুক ফুলিয়ে।…

দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, আমাদের বাংলা একাডেমির কোন নতুন ভবন উদ্বোধনই তো হয় মোল্লা ডেকে দোয়া-কালাম করার মাধ্যমে! পিছনে থাকেন আমাদের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা মুনাজাত ধরে। আমাদের নাট্যশালা বলুন আর শিল্পকলা ভবন, নির্মাণ ফলকের একদম উপরে আরবীতে বিসমিল্লাহ ছাড়া শুরুই করা যায় না। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা কি কখনই প্রকাশ্যে এরকম ধর্মকরণের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন? বাংলাদেশের শিল্পকলা, সাহিত্য একাডেমি, নাট্যশালার নকশা মসজিদ ছাড়া মন্ত্রণালয়ে পাশই করবে না। এখানে শিল্প সাহিত্য প্রাঙ্গনে মাইকে উচ্চস্বরে আজান বাজে। এফডিসির মত সিনেমা প্রাঙ্গনে কোটি কোটি টাকা খচর করে আধুনিক মসজিদ বানানো হয়েছে। এগুলো এতটাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক যে কখনই মনে হয়নি যে ধর্মনিরপেক্ষ স্থানে এগুলো বসানো অনুচিত। উল্টো যুক্তি দেই, এদেশের মানুষের প্রধান ধর্ম ইসলাম, এখানে ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান, কাজেই ইসলাম ও মুসলমানিত্বকে অস্বীকার করে সেক্যুলারিজমকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে শাপলা চত্ত্বরের মত বড় ধরণের বিরোধ দেশের সাধারণ মুসলমানদের কাছ থেকেই আসবে। শুধু ফরহাদ মজহারই এরকম যুক্তি দেন তা না, যতীন সরকারের মত বাম বুদ্ধিজীবীরাও একই রকম করে বলেন, সেক্যুলারদের ধর্মহীনতাই মৌলবাদীদের উত্থান ঘটিয়েছে! অথচ এরাই কোলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টসের এই ঘটনায় ‘হিন্দুত্ববাদের উত্থান’ দেখতে পাবে নিশ্চিত!

‘ইসলাম বিদ্বেষের’ বিরুদ্ধে আমাদের বাংলা একাডেমি বিগত কয়েক বছর ধরে জিহাদ শুরু করেছে। বামাতী আমাতী বুদ্ধিজীবীরা সেক্যুলারদের ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। আমি যদি বাংলা একাডেমিতে মিলাদ মাহফিলের বিরোধীতা করি সেটাকে নিশ্চিত করেই এদেশে সবাই ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ হিসেবে দেখবে। তাহলে কোলকাতার ফাইন আর্টসের আমতলায় বেলপাতা সিঁদুর দিয়ে পাথরের পুজার বিরোধীতাকে এই ইনারাই কি বলবেন ‘হিন্দু বিদ্বেষ’? বলবেন না যে সেটা নিশ্চিত। কারণ ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ থাকলেও জগতে ‘খ্রিস্টান বিদ্বেষ’ ‘হিন্দু বিদ্বেষ’ বলতে কিচ্ছু নেই!

সমস্যাটা তাই মৌলবাদীদের নিয়ে নয়। ধর্ম যতদিন থাকবে ততদিন এরাও থাকবে। ধর্মকে বাঁচিয়ে রেখে মৌলবাদহীন বিশ্ব অবাস্তব। কারণ সব ধার্মীকই ধর্মের মূল অংশ ধরে থাকতে চাইবে। তাই মূল সমস্যাটা তারাই যারা নিজেদের প্রগতিশীল এবং শিল্প সাহিত্যের মত অগ্রসরমাণ কোন কর্মে নিযুক্ত থাকেন। ভারতে ধর্মীয় মৌলবাদ কোনদিনই ভারতের সেক্যুলার সমাজকে পরাজিত করতে পারবে না শেষ পর্যন্ত কারণ ভারতে প্রগতিশীলদের ধর্মবাদীদের বিরুদ্ধে সদা প্রতিবাদ মুখরতা। তাদের ধর্মের বিরুদ্ধে মুখর সোচ্চার অবস্থান কখনই স্থায়ীভাবে ভারতে ধর্ম রাষ্ট্র করতে দিবে না। কিন্তু বাংলাদেশ পাকিস্তানের মত মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে তথাকথিত প্রগতিশীলদের ইসলামের প্রতি পক্ষপাত এখানে সেক্যুলার সমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কোলকাতার ফাইন আর্টস প্রাঙ্গনে আমতলার ঐ পাথরকে প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ নাকি লাথি মেরে ফেলে দিতেও চেয়েছিলো। যেদিন বাংলাদেশ পাকিস্তানে রাস্তা আটকে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে চেষ্টায় কেউ লাথি মেরে জায়নামাজ সরিয়ে দিতে অগ্রসর হবে সেদিন মনে করব এই দেশগুলিতে মৌলবাদ আর কোনদিন শিকড় গাড়তে পারবে না…।