বগুড়া রাজশাহীতে এত সাঁওতাল ছিলো তারা কোথায় গেলো? বিবিসির এক প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালে রেকর্ড ১৫ লক্ষ বাংলাদেশী ভারত গমন করেছে মূলত ৩ ক্যাটাগরিতে। চিকিৎসা,  ভ্রমণ, শপিং করতে তারা ভারতের ভিসা নিয়েছে।

প্রচন্ড ভারত বিদ্বেষী একটা দেশের মানুষের ভারতে বিপুলভাবে ভ্রমণ আলোচনার খোরাক নিঃসন্দেহে। বিবিসির রিপোর্ট বলছে, চিকিৎসা মান উন্নত এবং কম খরচ ভারতে যা বাংলাদেশে অপ্রতুল ও খরুচে।

দ্বিতীয়ত জিনিসপত্রের দাম বাংলাদেশের চাইতে ভারতে অর্ধেক। ৩ হাজার টাকার জামা বাংলাদেশে ৭-৮ হাজার। কক্সবাজার ঘুরতে যে টাকা বাংলাদেশে খরচ লাগে সে টাকায় ভারত ঘুরা‌ যায়। যেটা বিশেষভাবে উল্লিখিত বিবিসির রিপোর্টে, বাংলাদেশীরা ভারতে স্বাধীনভাবে বেড়ানো কথা বলেছেন যেটা বাংলাদেশে হয়ে উঠে না।

এক নারী বলেছেন কক্সবাজার ঘুরতে গিয়ে রাতের বেলা হোটেলে বসে থাকতে হলে বেড়ানোর কি দরকার? ভারতের এই নিরাপত্তা এবং সামাজিক অবস্থাটা আছে। কে কি পরে ঘুরছে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।

ভারত বাংলাদেশ থেকে বেটার এটা বলার জন্য এই লেখা নয়। ভারতে ধর্ষণের ঘটনা মাথায় রেখেই বলছি ভারতের মেয়েরা পোশাকে অনেক স্বাধীনতা ভোগ করে বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের মেয়েরাই বিবিসির কাছে ভারত ভ্রমণে তাদের কাছে বাংলাদেশের চাইতে ভারতকে লিবারাল মনে হওয়ার কথা বলেছে।

তারপরও এই রিপোর্ট আমার নয় বিবিসির এটা মাথায় রাখবেন। আমি যেটা বলতে চাই, সুযোগ পেলেই কিছু দাড়ি টুপি বিহিন সুটেড বুটেড ক্লিন সেভড সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ভারতের ‘কদর রাজ্য’ হয়ে না থেকে স্বাধীনতার চেষ্টা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন। এই প্রসঙ্গে কিছু তিতা সত্য বলি যা বেশিরভাগ মানুষের হজম হবে না।

বাংলাদেশ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গঠিত হওয়া একটা দেশ। এই পরিচয় এদেশের অন্যান্য জাতিসমূহকে জাতিগত আত্মপরিচয়হীন করে তুলেছে আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের কারণে। 

অবাঙালিদের উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ইত্যাদি বিশেষণে ফেলে অপদস্থ করে অস্বিত্বহীন করে তোলা হচ্ছে।

এই বাংলাদেশ নিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখেন এখানে কোন হিন্দু চাকমা মারমা সাঁওতাল গারো মনিপুরি… তারা কেউ কি “আমার দেশ” মনে করতে পারে কিনা? তাদের মনে স্বস্তি আছে কিনা।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ এখানে প্রকৃতপক্ষে বাংলাভাষী সুন্নি মুসলমান জাতীয়তাবাদ। পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীনতা হতে পরামর্শ দেয়া সুন্নি মুসলমানরা তো পশ্চিমবঙ্গকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে হতে বলছে। তাহলে সেই স্বাধীন দেশে অবাঙালী মুসলমান পশ্চিমবঙ্গবাসীর কি হবে? 

বাঙালির নিজস্ব দেশ হলে অবাঙালী মুসলমানও ভাবতে পারে তাদের নিজস্ব দেশ হলে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটবে। এই চিন্তা থেকেই কিন্তু পূর্ব বঙ্গের মুসলমান পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

যে জাতিদের সুন্নি মুসলমান বাংলাদেশীরা “উপজাতি ” বলে গালি দিচ্ছে তারাও যদি এখন ভাবে তাদের নিজস্ব দেশ হলে আত্মপরিচয় বিকাশ ঘটবে তখন কি সুন্নি ভাইয়ারা মেনে নিবেন?

বাংলাদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা পশ্চিমবঙ্গকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করে যা ভারত জোর করে দখল করে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গ ‘বাংলাদেশ’ হলে কি হত? বাংলাদেশ মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক কার্যক্রম বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে মুসলিম সেন্টিমেন্ট থেকে।

বাংলাদেশের যে মেয়েরা বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে পোশাকের চলাফেরার স্বাধীনতার কথা বলেছেন সেটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিনে থাকারই একটা কুফল এটা বলা কি অযৌক্তিক হবে?

বাংলাদেশে নারী নীতিমালা বিল যেখানে পিতার সম্পত্তিতে ভাইয়ের মত সমান ভাগ পাওয়ার কথা ছিলো তা পাশ করতে পারেনি ইসলাম অবমাননা হবে বলে। হিন্দু ধর্মে নারী পিতার সম্পত্তির ভাগ পায় না কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ কিন্তু হিন্দু শাস্ত্রকে অগ্রাহ্য করে সম্পত্তিতে নারীর ভাগ নিশ্চিত করেছে।

ভারত যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হতো তাহলে সেটা পাকিস্তান হয়ে উঠত। ভারত কোন বিষয় নয়, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ইহুদি যারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকুক সেখানে বাকি ধর্মের লোকেরা সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।

ভারত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বলেই শিয়া মুসলমানরা সেখানে শান্তিতে বসবাস করছে। ভারত মুসলমানের দেশ হলে তারা একে অপরের মসজিদে বোমা মারত। ভারত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বলেই সেখানে কাদিয়ানী মুসলমানরা নাগরিক হিসেবে বসবাস করছে।

মুসলমানের দেশ হলে পাকিস্তানের মত অমুসলিম ঘোষণা করা হত। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশ হলে  তাদের মসজিদকে উপসানালয় আর প্রকাশনাকে বাজেয়াপ্ত করে দিত।

এই সত্য গুলো এতো অস্বস্তিকর তিতা যে যুক্তি খন্ড না করেই আমাকে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি আরএসএস এজেন্ট বলে দেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। এক্ষেত্রে ভারতীয় বামপন্থীরাও পিছিয়ে নেই।

কথার কথা, পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীন হবে  বাঙালির নিজস্ব দেশ হিসেবে। তখন পশ্চিমবঙ্গের ৩০ শতাংশ মুসলিম ঘোট পাকাবে বাংলাদেশী মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে।

এখন যত “পোগতিশালী” বাংলাদেশী ছবক দিতে দেখছেন পশ্চিম বঙ্গকে স্বাধীন হতে এদের গণেশ উল্টে যেতে তখন সময় নিবে না। এরা তখন মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে হিন্দুদের “আধিপত্যবাদী বাবু সমাজ ” ব্রাহ্মণত্ববাদী” বলে মুসলমানদের স্বাধিকার দেয়ার উদ্ভট আবদার করবে।

বহুজাতি আর সম্পদায় মিলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থাই মানব সমাজের সমাধান। অভিবাসী ও স্থানীয় মিলিত যৌথ সমাজই সমাধান। কিন্তু এটাও তিতা সত্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোথাও জাতিগত সম্পদায়গত সহাবস্থান সম্ভব নয়। তুরস্ক আরমেনীয় খ্রিস্টানদের কচুকাটা করেছে।

আফগানিস্তান ছিলো বৌদ্ধদের দেশ। সেখানে বৌদ্ধরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সিরিয়া ছিলো খ্রিস্টান দেশ।

তারাও হারিয়ে গেছে। উদাহরণ আরো দেয়া যায়। বাংলাদেশ ছিলো হিন্দু আর বহু জাতির মিলিত বদ্বীপ। বগুড়া রাজশাহীতে এত সাঁওতাল ছিলো তারা কোথায় গেলো?

ইতিহাস তো জানাই…।

আরো পড়ুন..