করাচী শ্রীরামকৃষ্ণ মিশনে জেহাদী আক্রমণ, ৬০ হাজার দুঃপ্রাপ্য বই পুড়িয়ে দেওয় হয়।এখানে ল্লেখযােগ্য যে নােয়াখালীর দাঙ্গার নায়ক গােলাম সারােয়ার ফতােয়া দিয়ে দিলেন সুচেতা কৃপালনীকে যে ধর্ষণ করতে পারবে তাকে গাজী উপধিতে ভূষিত করা হবে এবং বহুত টাকা ইনাম দেওয়া হবে। তাই তিনি নিজের সম্মান রক্ষাকল্পে।সবসময় পটাসিয়াম সাইনাইডের ক্যাপসুল গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন।

আমার সহৃদয় পাঠক পাঠিকা একবার চিন্তা করুন। যেখানে কংগ্রেস সভাপতির স্ত্রীর এই অবস্থা সেখানে সাধারণ হিন্দুনারীদের কি অবস্থা হয়েছিল। পরবর্তী কালে ১৯৫০ সালে ঢাকার তথা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু নিধনের শিকার হয়ে এক বস্ত্রে যখন কলকাতা এলাম তারপর পিসিমা (উষারানী গুহরায়) আমাকে বল্লেন চল লাখনৌ থেকে বেড়িয়ে আসি সচেতাদির বাড়ীতে উঠাবাে। তােক দেখলে খুবই খুসী হবে।

 

আমি বল্লাম তিনি এখন একটা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তিনি কি আমাদের কে পাত্তা দেবেন? পিসিমা বল্লেন তুই চলনা। আমিতাে বিনা নােটিশে বারকয়েক তার বাড়ী গিয়ে থেকে এসেছি। তবে খুবই ব্যস্ত রাত্রে ছাড়া কথা বলার সময় নেই। তাের সম্বন্ধে দু-তিনবার জিজ্ঞাসা করেছে। আমার মনে হয় বইটার অপরিসীম গুরুত্ব অনুভব করে আমার হাত থেকে পেয়ে তিনি আমাকে মনে রেখেছেন।

১৯৫০ সালে ঢাকা থেকে এসে একদিন বেলুড় মঠে গেলাম স্বামী মাধবানন্দের সঙ্গে দেখা করতে। ৩/৪ জন সাধুকে জিজ্ঞাস করার পর একজন বল্লেন ঐ যে স্বামীজির মন্দিরের নিকট পায়চারী করছেন তিনি। আমি সামনে গিয়ে হাঁটুগেড়ে আমার দুই হাত তার দুই পায়ে স্থাপন করে আমার মন্ত্রক তার চিরণ যুগলের উপর রেখে চোখের জলে পা দুটো সিক্ত করে দিয়ে ২/৩ মিনিট পর উঠে দাঁড়ানাের পর তিনি দুহাত আমার মাথার উপর হাত স্থাপন করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

২/৩ মিনিট আমি বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম, তারপর বাম মহারাজ আমি ঢাকা থেকে এসেছি। স্বামী জ্ঞানত্মানন্দ, স্বামী সম্বুদ্ধানন্দ, স্বামী ত্যাগীশ্বরানন্দ, স্বামী সত্যকামানন্দ প্রভৃতি মহারাজদের স্নেহধন্য এবং ঢাকা মিশনের একজন সেচ্ছাসেবক, যে ব্যাপারে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি সেটা হলাে নােয়াখালীতে হিন্দু নিধনের পর “পূর্ববঙ্গ ও হিন্দু সমাজ” নামে বইটা যদি আপনারা না ছাপতেন তবে অধিকাংশ হিন্দুরাই স্বধর্মে ফিরে আসতাে না।

 

তারা মুসলমান হয়েই ওখানে থেকে যেত, (এখানে উল্লেখ্য যে ঐ সময় নােয়াখালীতে হিন্দুসমাজ খুবই গোভা ছিল। সময়টা ১৯৪২/৪৩ হবে আমাদের গ্রামের কয়েকজন নব্য কমুনিষ্ট এরা বামফ্রন্টের মন্ত্রী প্রশান্ত শূরের সমসাময়িক। গােপনে মুরগীর মাংস রান্না করে খাওয়ার অপরাধে সমাজচ্যুত হয়েছিল অর্থাৎ তাদের হাতে কেউ খাবেনা কোন বাড়ীতে নিমন্ত্রণ হলে ওরা বাদ ইত্যাদি।

স্বামীজির থেকে জানা গেল এই কাজটা শ্যামপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়ের মস্তিষ্ক প্রসূত। কি অক্লান্ত পরিশ্রম তাদের করতে হয়েছে, অতজন ধর্মগুরু এবং সমাজপতিদের সঙ্গে যােগাযােগ করে তাদের লিখিত বিবৃতি এনে তা’ ছাপিয়ে সময়মত বিতরণ করা এখন আমরা তা কল্পনাও করতে পারিনা।

এখনকার মত তখন ফোন, ইন্টারনেট, মােবাইল ইত্যাদি ছিল না। আমি আজও অবাক হয়ে পড়ি এই দুই মানব দেশপ্রেমিকের দূরদৃষ্টি দেখে। আর যেসব অকৃতজ্ঞ বাঙ্গালী, শ্যামাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়কে সাম্প্রদায়িক বলে গালি না দিয়ে জলগ্রহণ করেননা, তাদের মুখে থুতু ফেলতেও আমার ঘৃণা বােধ হয়।

 

ভগবানের অশেষ কৃপায় আমি এক কপি সংগ্রহ করে রেখেছি এবং আজ ৬৬ বৎসর পর তা আবার পুনঃ প্রকাশিত হচ্ছে ভাবী কোনাে গবেষকদের কাজে লাগবে বলে। যেহেতু বইটা রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃক প্রকাশিত তাই এখানে আর একটা ঘটনার উল্লেখ করছি কারণ রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃক প্রকাশিত কোন বইতে এই ঘটনার উল্লেখ দেখতে পাইনি।

করাচী শ্রীরামকৃষ্ণ মিশনে জেহাদী আক্রমণ

দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে আমার অভ্যাসমত স্কুল থেকে এসে বিকালে ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনে যাওয়ার পর মঠাধ্যক্ষ স্বামী জ্ঞানাত্মানন্দজী মহারাজ আমাকে বল্লেন, রবি “তুই এক্ষুণি গিয়ে শ্রীশকে ডেকে নিয়ে আয়, করাচী থেকে মহারাজ এসেছেন তাঁর দুটো পাঞ্জাবী সেলাই করতে হবে। আমি সাইকেলে গিয়ে শ্রীশবাবুকে সামনে বসিয়ে মঠে ফিরলাম, শ্রীশবাবু মিশনের ভক্ত এবং মহারাজদের পাঞ্জাবী সেলাই করতেন।

 

তিনি মাপ নিয়ে চলে। গেলেন রাতভর পরিশ্রম করে দুটো পাঞ্জাবী তৈরী করে সকালে মঠে পৌঁছে দিলেন। পাঞ্জাবীগুলাে সাদা কাপড়ের ছিল, পরদিন আমি মঠে গেলে স্বামী। নাত্মানন্দের আদেশ অনুসারে আমাদের পাড়ার রঞ্জক সাবান” কোম্পানীর বাড়ী থেকে দুটো গেরুয়া রং করার সাবান এনে তাদের নির্দেশ অনুসারে পাঞ্জাবী দুটোকে গেরুয়া রং করে দিলাম।

কার জন্য এই দুটো পাঞ্জাবী রং করা হলাে জানেন? তিনি করাচী রামকৃষ্ণ মিশনের সভাপতি স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী মহারাজ পরবর্তীকালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার এক দিন আগে থেকেই অর্থাৎ ১৩ই আগষ্ট ১৯৪৭ থেকেই করাচীতে হিন্দু এবং শিখদের উপর মুসলমানদের অত্যাচার আরম্ভ হয়। মুসলমানরা করাচী রামকৃষ্ণ মিশনের মঠে আগুন ধরিয়ে দেয়।

ঐ সময় করাচী দিল্লী বিমান চলাচল বন্ধ, ঢাকা করাচী বিমান চলতাে তাই রঙ্গনাথানন্দজী এক কাপড়ে বিমান যােগে। ঢাকা এসে রামকৃষ্ণ মিশনে উঠেছেন। এরপর প্রায় তিনমাস তিনি ঢাকা মঠে ছিলেন।

 

প্রায়ই কোননা কোন ভক্তের বাড়ীতে বৈকালে তার ধর্মালােচনা সভা হতাে, আমার কাজ ছিল ওনাকে রিক্সা করে নিয়ে যাওয়া এবং সভা শেষে মঠে পোঁছে দেওয়া। যেদিন যার বাড়ীতে সভা হতাে তারাই যাতায়াতের রিক্সা ভাড়া দিয়ে দিতেন। শ্রী জুনারকর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের বাড়ীতেই অধিকাংশ দিন সভা হতাে। আমার সৌভাগ্য যে এহেন মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রায়

তিন মাস একই রিক্সায় যাতায়াত করার সুযােগ পেয়েছি। এখানে রঙ্গনাথানন্দজীর লেখা পত্র আমার সংগ্রহশালায় আছে, করাচী মঠে থাকাকালে লালকৃষ্ণ আদবানী এমন কি পাক প্রেসিডেন্ট মঃ আলী জিন্নাও মিশনে এসে তাঁর বক্তৃতা শুনতেন। কথিত আছে স্বামী বিবেকানন্দের পর রামকৃষ্ণ মিশনে অতবড় বক্তা আর কেউ ছিলেন না।

পরবর্তীকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে বেদান্ত প্রচারে অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছেন। ঢাকা থাকাকালিন আমি জানতে পারি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে হিন্দু নিধনের সময় করাচী মঠের গ্রন্থাগারের প্রায় ৬০ হাজার দুঃপ্রাপ্য বই পুড়িয়ে দেয় জেহাদী মুসলমান দুস্কৃতিরা। তার মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির সংগ্রহে থাকা।

 

সিন্ধু সভ্যতার অনেক নিদর্শন ছিল যা তারা রক্ষা কল্পে মিশনে জমা দিয়েছিলেন। এরপর করাচী মঠ বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায় তার সুদ থেকে ভরতুকি দিয়ে মিশন বইপত্র গুলি সস্তাদরে বিক্রি করে, এই লাইব্রেরীটা পােড়ানাের ব্যাপারে। স্বামী বিবেকানন্দের একটি লেখা প্রণিধান যােগ্য

“তাহাদের (মুসলমানদের) মূলমন্ত্র” আল্লা এক এবং মহম্মদই এক মাত্র পয়গম্বর” যাহা কিছু ইহার বহির্ভূত সে সমস্ত কেবল খারাপই নহে, উপরন্তু সে সমস্তই তৎক্ষণাৎ ধ্বংস করিতে হইবে। যে কোন পুরুষ বা নারী এই মতে সামান্য অবিশ্বাসী তাহাকেই নিমেষে হত্যা করিতে হইবে।

যাহা কিছু এই উপাসনা পদ্ধতির বহির্ভূত তাহাকেই অবিলম্বে ভাঙিয়া ফেলিতে হইবে, যে কোন গ্রন্থে অন্যরূপ মত প্রচার করা হইয়াছে সেগুলিকে দগ্ধ করিতে হইবে। প্রশান্ত মহাসাগর হইতে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত ব্যাপক এলাকায় দীর্ঘ পাঁচশত বৎসর ধরিয়া রক্তের বন্যা বহিয়া গিয়াছে ইহাই মুসলমান ধর্ম।”

এর পর থেকে পড়ুন..

প্রথম পর্ব

তৃতীয় পর্ব

৪র্থ পর্ব

লেখক-রবীন্দ্রনাথ দত্ত, সামাজিক ওভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক।
 আরো লেখা……