দেখুন, পাশাপাশি মন্দির মসজিদ। রাস্তা একটাই, হাশেম ভাই আর হিমু দাদা গল্প করতে করতে যে যার প্রার্থনা স্থলে ঢুকে যাচ্ছে। সন্ধ্যায় আজানের শব্দ আর সন্ধ্যারতির মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। এই সুরটাই তো আমার আপনার ঐক্যবদ্ধ ভারতের সুর। দেখুন, পাশের চায়ের দোকানে পাশাপাশি বসে গল্পে মেতেছে রহিম চাচা আর রামু কাকা। এ মা, রিক্সা থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেল সুবোধদার ছোট্ট মেয়েটা, ছুটে এসে তুলে নিল মিজানুর। রোশেনারার কলেজে পরীক্ষা, অটো পাচ্ছে না – বাইকে গিয়ে সামনের স্ট্যান্ড থেকে অটো নিয়ে এল সিদ্ধার্থ। মন্দিরের উৎসব কমিটিতে থাকে রহিম চাচারা, ফকির বাবার মাজারের ওরস কমিটিতে থাকে রামু কাকারা। বলুন তো কে না চায় এই সম্প্রীতি?

কিন্তু মনের মধ্যে  ঘাপটি মেরে বসে থাকা সেই হিসেবী সংশয়ী সাবধানী পোড় খাওয়া লোকটা বুদবুদের মত কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন তুলেই যায়…..,

এখন তো চারদিকে হিন্দু বসতির মাঝে ছোট্ট একটা মুসলিম মহল্লা। আচ্ছা, যখন সংখ্যার আনুপাতিক হারটা একটু পাল্টে যাবে, তখনও কি ঠিক এখনকার মতোই সম্প্রীতির ফুরফুরে হাওয়া বইবে? তখনও কি চারদিকে  সম্প্রীতির জয়গান বা সেটা রক্ষার এমন উদাত্ত আহ্বান শোনা যাবে? তখনও কি ভাবে গদগদ হয়ে বলতে পারব – “আমাদের এখানে এসব নেই, আমরা মিলে মিশে বেশ শান্তিতেই আছি “? তখনও কি রহিম চাচাকে এই চেহারাতেই পাওয়া যাবে? রামু কাকা? হাশেম ভাই আর হিমু দাদা তখনও এক রাস্তা দিয়েই প্রার্থনা করতে যাবে তো? এখন ভোরবেলা আজানের মাইকে ঘুম ভাঙলেও কোন সমস্যা নেই, কেউ সেই মাইক বন্ধ করতে বলে না। কিন্তু তখনও কি মন্দিরে মাইক বাজলে কারোর কোন সমস্যা হবে না ? তখনও কি মন্দিরে খোল করতাল নিয়ে কীর্তনের আসর বসবে, গান বাজনা ইসলামে হারাম বলে আপত্তি আসবে না? আর কিছু দিন পর সেই একই রাস্তা দিয়ে মন্দিরের উৎসবের বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া যাবে, শিরক হবে না ? আরো কিছুদিন পর মন্দিরটাই কি থাকবে? তখনও কি সুবোধদার ডাগর হয়ে উঠা মেয়েটি ঐ রাস্তা দিয়েই নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারবে, ‘মাল ঈ গণিমত’ হয়ে যাবে না ?

তাহলে কি বর্তমানে যে আপাত সম্প্রীতি আমরা দেখছি বা আমাদের দেখানো হচ্ছে, বলা যে হচ্ছে এটাই ভারতের ঐতিহ্য –  সেটা কি মিথ্যে, এতোই ঠুনকো যে বিশেষ পারিপার্শ্বিক বা বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের সংখ্যার উপর সেটা নির্ভর করে? সেটা কি শুধু, শুধুই একটা সম্প্রদায়ের মনে? তাহলে যেটা আদৌ নেই, সেটা নষ্ট করার চক্রান্ত কে কিভাবে করতে পারে?

আমি ঘাবড়ে যাই, চিৎকার করে বলি – “চুপ কর, কেন এমন বলছ”?  উত্তরে সে আমাকে দেখিয়ে দেয় আমাদের পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ পাকিস্তান বা এদেশেরই সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা।
পাল্টা চিৎকার করে উঠে সে – “এতোই যদি সম্প্রীতি, তাহলে কেন হয় ছেচল্লিশের ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ বা নোয়াখালী, পঞ্চাশের বরিশাল বা চৌষট্টির খুলনা? কেন কাশ্মীরের কাশ্মীরী পন্ডিতদের দিন কাটে রাস্তায়? এতোই যদি সম্প্রীতি, তাহলে কেন কাংলাপাহাড়ীর দূর্গার পড়ে থাকতে হয় কুমোর বাড়ীতেই, কেন সরস্বতী মূর্তি রাস্তায় রেখেই তেহট্টের ছোট্ট মেয়েটার অঞ্জলি দিতে হয় মাথার রক্তে? এত সম্প্রীতি থাকলে কেন মহরমের জন্য পিছিয়ে দিতে হয় বিসর্জন? কেন ঐ বাংলার নাসিরনগর, রামু, মালোপাড়া, লংদু বা গোবিন্দগঞ্জের মতো এই বাংলাতেও হয় দেগঙ্গা, কালিয়াচক, সমুদ্রগড়, ধুলাগড় আর বাদুড়িয়া? কেন হয় গোধরা – গুজরাত? কেন কাশ্মীরের পড়শি দেশে কেন মহরমের মিছিলে ঢেকে যায় দূর্গার মুখ ? কেন মূর্তি পূজা শিরক বলে, ভাঙা মূর্তি গড়াগড়ি খায় রাস্তায়? কেন রমজানের কারণে খুলে নিতে হয় জগন্নাথের মাইক?  কোথায় তাহলে সম্প্রীতি?

আমি বাক্যহারা। শুধু বলি, “একদিন ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে”। হ্যাঁ, শান্তি সবাই চায়, কেউ চায় সবাইকে নিয়ে শান্তি , কেউ চায় অন্যদের নির্মূল করে বিশ্বময় শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে সেই বিশ্বের শান্তি। কিন্তু আমরা শুধু আশা করতে পারি একদিন সবাই ভুল বুঝতে পারবে, হিংসা হানাহানি ছেড়ে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলবে। বুঝতে পারবে, অনেক হয়েছে, নিজেদের অনেক সর্বনাশ আমরা করে ফেলেছি। এই হানাহানি ছাড়াও আমাদের তো আরও অনেক কিছু করার আছে, করার ছিল। তবে এই ভাবনাটা ভাবতে হবে আমাদের সবার, কারণ সম্প্রীতির গানটা কোরাস গান, এটা একা গাওয়া যায় না। আমি স্বপ্ন দেখি আমার পরবর্তী কোন প্রজন্ম দেখবেই সেই শান্ত পৃথিবী।