গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে  যে তথ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তার একটা ক্রোনোলজি তৈরি করার চেষ্টা করছি।

১৮৩৫ সালে ইংরেজরা যখন দার্জিলিং-এর দখল নেয়, তখন সেখানে সাকুল্যে ২০টি লেপচা পরিবার ছিল। একটিও গোর্খা ছিল না।

১৮৩৯ সালে দার্জিলিং জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চা বাগানের পত্তন হয়। এইসময় থেকে এখানে নেপালী শ্রমিক আসা শুরু।

১৮৫০ সালে দার্জিলিং-এর জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০০০। 

এরপরে, ১৯০৭ সালে লণ্ডনে গিয়ে দার্জিলিং ও ডুয়ার্স মিলিয়ে একটি আলাদা রাজ্যের দাবি করেন শামসের জঙ্গ বাহাদুর রানা। ব্যক্তিটি ইংরেজের ক্রীড়নক ছিলেন। এই দাবির পেছনে ইংরেজের ইন্ধন ছিল। বাংলা তখন উত্তাল, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। বাঙালিকে অন্তত দার্জিলিং ছাড়া করাটা স্ট্র্যাটেজিক প্রয়োজনও বটে, কারণ আন্তর্জাতিক সীমান্তের এত কাছাকাছি বিপ্লবী বাঙালির প্রভাব ইংরেজ সাম্রাজ্যের জন্য ভালো নয়।

এই সময়েই ইঊরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশন এবং প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে দার্জিলিং জেলাকে পৃথক রাজ্য করার দাবিপত্র পেশ করা হয়। বাংলার উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে দার্জিলিংকে মুক্ত রাখা, বাঙালির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য এই সময় থেকেই নেপালীদের মধ্যে বাঙালিবিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্যোগ নেয় ইংরেজ।

১৯১৭ সাল। হিলমেন্স অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠন পৃথক দার্জিলিং রাজ্যের দাবি করে। এই সংগঠন মূলত ইংরেজের তাঁবেদার প্রাক্তন সেনা অফিসার ও তাদের মদতপুষ্ট গোর্খা গুণ্ডাদের। এরা ১৯১৭, ১৯৩০ এবং ১৯৩৪ সালে সরকারকে যে স্মারকলিপি দেয়, সেগুলোর ছত্রে ছত্রে ইংরেজের প্রতি আনুগত্য, রাজনৈতিক আন্দোলনরত বাঙালিদের প্রতি ঘৃণা, এবং ইংরেজ-বিশ্বস্ততার পুরস্কার হিসেবে পৃথক রাজ্যের অনুরোধ।

১৯৪৩ সালের মে মাসে দার্জিলিং-এর চা বাগান মালিক এবং ইংরেজ সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায় অল ইন্ডিয়া গোর্খা লীগ স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ডম্বর সিং গুরুং ছিলেন ইংরেজের আশীর্বাদধন্য। এই ডম্বর গুরুং যে স্মারকলিপি দিচ্ছেন, তার প্রথমেই ইংরেজকে সুদীর্ঘকাল সেবা করে এসেছে গোর্খারা, সেই সত্য স্মরণ করানো হচ্ছে। ডম্বর গুরুং ১৯৪৭এ একটি জনসভায় বলেন, বাঙালিরাই শত্রু, ইংরেজ নয়।

১৯৪৭ সালের একটি সরকারী নথিতে বলা হচ্ছে, বাংলার প্রাদেশিক কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার ফলে ডম্বর সিং গুরুং কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে বাংলার এবং কেন্দ্রীয় আইনসভার (কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে) সদস্যপদে নির্বাচিত হয়েছেন।

খুব সম্ভবত কমিউনিস্ট রতনলাল ব্রাহ্মণকে কাউন্টার করার জন্য বাংলার কংগ্রেসের এই কৌশল। এই রতনলাল ব্রাহ্মণ ৬ই এপ্রিল ১৯৪৭ সালে কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে গোর্খাল্যান্ডের দাবিপত্র জমা দিয়েছিলেন।

এরপরে শুধু ১৯৫১ থেকে ১৯৬১-এর মধ্যে নেপালী জনসংখ্যা ৩১৫% বাড়ছে দার্জিলিং জেলায়। হ্যাঁ, তিনশো পনেরো শতাংশ। এরপরে হু হু করে বেড়েই চলেছে। কার্টসি ভারত নেপাল চুক্তি ১৯৫০।

১৯৬১ সালে গোর্খা লীগ মিছিল করে, হাতে কুকরী নিয়ে, বাঙালিবিরোধী স্লোগান মুখে।

১৯৭০ সালে বাঙালি বিতাড়ন শুরু, নেতৃত্বে দেওপ্রকাশ রাই।

১৯৮৩তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক অপসৃত হাবিলদার, জনৈক সুবাস ঘিসিং মঞ্চে এলেন। জি এন এল এফ তাণ্ডব শুরু করল। বাঙালি বিতাড়ন ইতিমধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছিল, জি এন এল এফ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে ক্লিনজ করেছিল এই সময়। একবার এক সিপিএম সমর্থকের কাটামুণ্ডুও ঝুলিয়ে দেওয়া হয় প্রকাশ্যে, জ্যোতিবাবুরা কিছু করেন নি।

১৯৮৮ সালের ২৫শে জুলাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিং ও জি এন এল এফ সুপ্রিমো সুবাস ঘিসিং একটা চুক্তি করেন দিল্লিতে। দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলের জন্ম।

২০০৭ সালে একটি টিভি চ্যানেলে গানের অনুষ্ঠানে জনৈক প্রশান্ত তামাং এর জন্য গণ এস এম এস প্রেরণের হিস্টিরিয়া চলাকালীন বিমল গুরুং এবং তার গুণ্ডাবাহিনীর উত্থান।

(তথ্যসূত্র দেবপ্রসাদ কর, উত্তরবঙ্গের গোর্খায়ন)