জিন্নার ছবি ; দ্বিজাতি তত্ত্ব ও আনন্দবাজারের ভন্ডামি।

Spread the love

~ জিন্নার ছবি ; দ্বিজাতি তত্ত্ব ও আনন্দবাজারের ভন্ডামি :

গতকাল  আনন্দবাজার পত্রিকায় ( ০৭/০৫/১৮) ” ইতিহাস মুছিবে না ” শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে যেখানে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ঘটা জিন্নার ছবি অপসারণ সংক্রান্ত ব্যাপারকে সামনে রেখে একতরফা, মনগড়া ও বিভ্রান্তিমুলক তত্ত্ব খাড়া করার চেষ্টা হয়েছে। সম্পাদক মহাশয় শিরোনামটির আড়ালে সত্য সত্যই ইতিহাস মুছে দেওয়ার বা ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করেছেন।

          কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কার প্রতিকৃতি থাকবে বা কার মূর্তি স্থাপিত হবে সেটা একান্তই বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের এক্তিয়ার, বাইরের কারুর তাতে নাক গলাবার প্রশ্ন নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যে প্রতিকৃতি বা মূর্তি স্থাপিত হয় তা আলাদা তাৎপর্য বহন করে। সেই ব্যক্তির প্রতি যেমন মর্যাদা প্রদর্শিত হয় তেমনই বৃহত্তর অর্থে কতৃপক্ষের মনোভাবও প্রকাশ করে। মহম্মদ আলি জিন্না আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। তিনি ঐ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতাও করেন নি। আলিগড় আন্দোলন বা মুসলিম সমাজ সংস্কারে তাঁর কোন ভূমিকা ছিল না। বরং নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা পুরণ করতে গিয়ে এবং ক্ষমতা লাভের তীব্র বাসনা চরিতার্থ করতে গিয়ে তিনি চরম সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক দেশ আদায় করেন। সম্পাদক মহাশয়ের মতে ভারতীয় রাজনীতিতে জিন্নার তাৎপর্যপুর্ণ অবদান ছিল। হ্যাঁ, অবশ্যই ছিল। তবে সাম্প্রদায়িক এবং হিন্দু বিরোধিতার রাজনীতিতে। ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করে মুসলিম দের জন্য পৃথক নির্বাচক মন্ডলীর ব্যবস্থা করা। পরবর্তী ধাপে ক্যাবিনেট মিশনের বিরোধিতা করে ও ওয়াভেল পরিকল্পনায় জল ঢেলে ডাইরেক্ট একশন ডে আহ্বানের মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাধানোর উদ্দেশ্য দারুণ ভাবে সফল হয়েছিল তাঁর। এরই পরিণতিতে দেশভাগ, লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া ও আরো বিবিধ সমস্যা। এভাবেই জিন্না সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তাঁর অবদান রেখেছেন।

     আবেগের আতিশয্যে ও নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমানের তাড়াহুড়োয় সম্পাদক মহাশয় দ্বিজাতি তত্ত্বের জন্য নাগপুর তথা সঙ্ঘ পরিবারকে দায়ী করেছেন। তিনি হয়তো ইতিহাস বিস্মৃত হয়েছেন অথবা জেনেশুনে পাঠককে বিভ্রান্ত করেছেন। দ্বিজাতি তত্ত্বের জনক বলা হয় সৈয়দ আহম্মদ খান কে। পরবর্তী কালে জিন্না সেই ধারণাকে আরও পোক্ত করেন। সম্পাদক মহাশয়ের যুক্তি অনুসরণ করলে তো দেশব্যাপী ব্যাঙ্ক জালিয়াতির জন্য নেপোলিয়নকে দায়ী করলেও অত্যুক্তি হবে না। একজায়গায় তিনি আরও লিখেছেন জিন্নাকে আদর্শ মানবার গণতান্ত্রিক অধিকার ভারতীয় নাগরিকের থাকবে না কেন?  খুবই চমৎকার অকাট্য প্রশ্ন। একজন চরম সাম্প্রদায়িক, হিন্দু বিদ্বেষী রাজনীতিক কে যদি আদর্শ মানা হয় তাহলে তো শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়ক হর্ষদ মেটা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী ; সিরিয়াল কিলার চার্লস শোভরাজ মানবপ্রেমী মহাত্মা। হয়ত বৈশাখের তীব্র গরমে সম্পাদক মহাশয়ের মাথা বিগড়েছে তাই তিনি এভাবে ভুল বকেছেন। জিন্না সম্বন্ধে এটা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত মুল্যায়ন, কখনই সার্বজনীন নয়। সংবাদপত্রে প্রকাশ করে তিনি যে শুধু পাঠকদের মুল্যবান সময়ই নষ্ট করলেন তা নয়, নিজেকেও খেলো প্রমাণ করলেন। অবশ্য আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠী বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষতার  আড়ালে তোষণনীতির ধারক ও বাহক। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের বিরোধিতার নামে হিন্দুদের প্রতি বিষোদ্গারই এদের একমাত্র কাজ। আসিফার জন্য সামনের পাতায় বড় হেডলাইন, কিন্তু গীতার বেলায় ভেতরের পাতায় দুলাইন বরাদ্দ। দাদরি কান্ডের খবর ঠিক ছেপে যায় কিন্তু ঘরের কাছে ধুলাগড় বাদুরিয়ার খবর কোথায় হারিয়ে যায়। তবে সোস্যাল মিডিয়া শক্তিশালী হয়ে ওঠায় এদের এসব ধ্যাষ্টামী মানুষ ধরে ফেলেছেন।

       লেখার শুরুতেই বলেছি ছবি টাঙানো বা মূর্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে কতৃপক্ষের মনোভাব এবং উদ্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়। এদেশের মুসলিমদের মধ্যে হিন্দু বিদ্বেষী মনোভাবাপন্ন অংশের কাছে জিন্না নয়নের মনি। তাই তার ছবিকে ঘিরে আদিখ্যেতা খুব স্বাভাবিক। সবশেষে একটা কথা, মহম্মদ আলি জিন্না এই উপমহাদেশের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতীক ছিল আছে থাকবে। কোনভাবেই সে  ” ইতিহাস মুছিবে না”।