হিন্দুরক্তে লাল হয়ে যাওয়া ১০ ই ফেব্রয়ারি ।
ঢাকা-বরিশালের সেদিনের কথা আমরা কি ভুলতে পারি!!!

১৯৫০ এর ১০ই ফেব্রুয়ারি দিনটিতেই বাংলাদেশে ঢাকা-বরিশালে পাকিস্তান সরকারের রটানো মিধ্যা গুজবে ১০ থেকে ১৯ শে ফেব্রয়ারি পর্যন্ত ৯ দিনে মুসলিমরা প্রায় ১০০০০ হিন্দুদের হত্যা করে । এর পর থেকে চলতে থাকে অবাধে লুটপাট, হিন্দু নারীদের ধর্ষন। শ্মশানে পরিনত হয়ে যায় বাংলাদেশের হিন্দু অধুষ্যিত অঞ্চল গুলি । মোট ৫০০০০ হিন্দুদের হত্যা করা হয়।

১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ থেকে ১ মাসে ৫০ লক্ষ হিন্দু বিতাড়নের নৃশংস ইতিহাস: ১৯৪৭ এর পর থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত কেন ৫ বছরে পূর্ববঙ্গের হিন্দুর সংখ্যা ২৯% থেকে ২২% এ নেমে এল তার ইতিহাস কোথাও পাওয়া যাবে না, কোন সেকুলার বা মুসলিম ঐতিহাসিক সেই ইতিহাস লিখবেন না, কেন না তাহলে তো আয়নায় নিজের মুখ দেখতে হয়। হিন্দুদের সেই ইতিহাস জানা দরকার, যা জানলে আপনাদের শরীরে শিহরণ জাগবে।

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তানের দাবী উত্থাপনের পর ১৯৪৬ সালের ১৬ই থেকে ১৯শে আগস্ট মুসলিম লীগ পাকিস্তান আদায়ের জন্য কলকাতায় ডাইরেক্ট এ্যাকশন পালন করে। ২০ হাজার অসহায় নিরস্ত্র হিন্দুকে হত্যা করে, হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি সংযোগ, ভাংচুর, লুঠপাট করে এবং অসংখ্য হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ করে, হিন্দুদের প্রাণে মারার ভয় দেখিয়ে ধর্মান্তরেরও চেষ্টা করে। এরপর আক্রমণ শুরু হয় নোয়াখালিতে, সেখানে নৃশংসভাবে খুন করা হয় ১ হাজার হিন্দুকে, ধর্ষণ করা হয় ১২ থেকে ৪২ এর সব হিন্দু নারীদের, বলপূর্বক ধর্মান্তরণ করা হয় প্রায় সবাইকে। নানা চাপে পড়ে জন্মভিটা থেকে বিতাড়িত হয় বেশীর ভাগ হিন্দু।

হিন্দুদের এই রক্তপাতের ওপর দেশ ভাগ হল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়ে প্রাণ গেল ২০ লাখ হিন্দু ও শিখের, ধর্ষিতা হল ১ লক্ষ নারী, উদ্বাস্তু হলো কয়েক কোটি হিন্দু ও শিখ! কিন্তু এত কিছু পেয়েও মুসলমানরা খুশি হল না। তাদের আরও চাই, বাকি হিন্দুদের বাড়িঘর, জমিজমা সব কিছু। এজন্য হিন্দুদের মারতে হবে, কাটতে হবে, মেয়েদের ধর্ষণ করতে হবে, তাদের দেশ থেকে তাড়াতে হবে, পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের সংখ্যা যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে এনে ওদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিতে হবে।

এই পরিকল্পনা থেকেই শুরু হল ১৯৫০এর হিন্দু বিতাড়ন। অনেকেই এটাকে বলে ১৯৫০ এর দাঙ্গা, কিন্তু দাঙ্গা মানে দুই দলের মারামারি, এই ধরণের দাঙ্গা বাংলায় কখন হয় নি। ১৯৪৬ থেকে আজ পর্যন্ত বাংলার হিন্দুরা শুধু মুসলমানদের হাতে মারই খেয়েছে, একজন মুসলমানকেও হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিতে হয়নি বা মার খেতে হয়নি। তাই কোন যুক্তিতেই এই হিংসাগুলোকে দাঙ্গা বলা যায় না, প্রকৃতপক্ষে এসব ঘটনাকে দাঙ্গা নাম দিয়ে মুসলমানদের অত্যাচারকে যুক্তিসঙ্গত করার চেষ্টা করা হয়। ব্যাপারটা ওরাও মেরেছে তাই আমরাও মেরেছি, এতে দোষের কিছু নেই। বাংলায় কখন হিন্দু মুসলমান মারামারি হয় নি, মুসলমান সবসময়ই মেরেছে আর হিন্দু মার খেয়েছে।

শুরু হয়েছিল ১৯৪৬ সাল থেকে আর বলি হয়েছিল  নোয়াখালি, কুমিল্লা ও ঢাকার হিন্দুরা, পরবর্তী ঘটনাগুলি ১৯৪৬ এর সম্প্রসারিত রূপ। অনেকে ভেবেছিল দেশ ভাগ হয়ে গেলে এই সমস্যাগুলো মিটে যাবে। কিন্তু যারা এটা ভাবত তাদের মুসলমানদের মানসিকতা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। এই অজ্ঞানতার কারণে বার বার বাংলার হিন্দুদের হতে হয়েছে মুসলমান আক্রমণ এর শিকার এবং এখনও হতে হচ্ছে। ১৯৪৬ সালে কলকাতা ও নোয়াখালির পর উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে ১৯৫০ সালে। ১৯৪৬ এর ঘটনা ঘটানোর জন্য যেমন ১৯৪০ সাল থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল এবং ক্ষেত্র প্রস্তত করা হচ্ছিল, ঠিক তেমনি ১৯৫০ সালের ঘটনার জন্য ১৯৪৮ সাল থেকে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছিল।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে ঘটে এই ঘটনাটি: বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার দীঘারকুল গ্রাম, একজন হিন্দু নদীতে মাছ ধরছিল। সেই সময় সেখানে একজন মুসলমান নৌকা বেয়ে এসে তার সামনে জাল ফেলার প্রস্তুতি নেয়। এতে হিন্দু মুসলমানকে বাধা দেয় এবং তার মাছ ধরার স্থানে জাল ফেলতে নিষেধ করে। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়, এতে আল্লা ছাড়া কারো কাছে মাথা নত না করা মুসলমানটি মনে করে তার জেদ বজায় থাকছে না এবং এক হিন্দুর কাছে তার মাথা নত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নিকটবর্তী মুসলমান গ্রামে গিয়ে ঐ মুসলমানটি রটিয়ে দেয় হিন্দুরা তার  নৌকায় থাকা এক মুসলমান মহিলাকে আক্রমণ করে অসম্মান করেছে। ঐ সময় গোপালগঞ্জের এস ডি ও নৌকাযোগে ওখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, এই অভিযোগ তাঁর কানে যায় এবং তিনি কোনরূপ তদন্ত না করেই মুসলমান ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে হিন্দুদের শায়েস্তা করার জন্য সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী পাঠালেন। স্থানীয় মুসলমানরা পুলিশের সাথে যোগ দিয়ে হিন্দুদের বাড়ী ঘরে  হামলা করে এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে নির্মমভাবে প্রহার করার পর বাড়ীর সব মূল্যবান দ্রব্য লুঠ করে নিয়ে যায়। নির্মম প্রহারের ফলে ঘটনাস্থলে এক গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত ঘটে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় হিন্দুদের উপর মুসলমানদের এই পৈশাচিক অত্যাচার বিশাল এলাকা জুড়ে  হিন্দুদের মনে ভয়ংকর ত্রাস ও ভীতির সঞ্চার করে।

এর পরের ঘটনাটি ঘটে বরিশাল জেলার গৌরনদী থানায়। এখানকার ইউনিয়ন বোর্ডে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে একটি সমস্যা হয়। কিছু হিন্দু ছিল কমিউনিস্ট, যে কমিউনিস্টরা পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে ছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই শুরু হয়েছিল পূর্ববঙ্গ থেকে কমিউনিস্ট বিতাড়ন। মুসলমানদের এই তাড়া খেয়েই পূর্ববঙ্গের সব হিন্দু কমিউনিস্ট পশ্চিমবঙ্গে হিজরত করেন এবং পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয় বামেদের রমরমা।

যাহোক,  হিন্দুদেরকে শায়েস্তা করার জন্য এই কমিউনিস্ট সূত্রকেই কাজে লাগানো হয়। গৌরনদী থানার উপর কমিউনিস্টরা আক্রমণ করতে পারে, এই গুজব ছড়িয়ে চারিদিকে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয় এবং বরিশাল সদর থেকে গৌরনদী থানায় সশস্ত্র বাহিনী পাঠান হয়। তারা ঐ অঞ্চলের বহু হিন্দু বাড়ী লুঠ করে মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নিয়ে যায়। যেসব বাড়ির মালিক কমিউনিস্ট হওয়া তো দূরের কথা রাজনীতিও করত না, এমনকি বাড়িতেও থাকত না, সে সব বাড়িও আক্রমণ করে লুঠ করা হয়। ঐ অঞ্চলের বহু হিন্দুকে গ্রেফতার করা হয় এবং স্কুলকলেজের বহু হিন্দু ছাত্র শিক্ষককে কমিউনিস্ট আখ্যা দিয়ে অযথা হয়রানি করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারকে লিখিত আবেদন করে কোন প্রতিকার পাননি। সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমায় আর একটি ঘটনা ঘটান হয়। স্থানীয় মুসলমান ও পুলিশ মিলে হিন্দুদের বাড়ী ঘরে হামলা করে মূল্যবান জিনিসপত্র লুঠ করে নিয়ে যায় এবং এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার নামে মিলিটারী চৌকি বসান হয়। এই মিলিটারি চৌকিতে খাবার সরবরাহ করতে বাধ্য করা হয় হিন্দুদের, রাতের বেলা হিন্দু মেয়েদেরও ক্যাম্পে পাঠাতে বাধ্য করত মিলিটারী।
এরপরই ঘটে রাজশাহী জেলার নাচোলের ইলা মিত্রের সেই বিখ্যাত ঘটনা। কমিউনিস্ট দমনের নামে পুলিশের সাথে স্থানীয় মুসলমানরা মিলে হিন্দুদের উপর অত্যাচার করে এবং তাদের সম্পত্তি লুঠ করে। ওখানকার সাঁওতালরা সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে।

১৯৪৯ সালের ২০ ডিসেম্বর খুলনা জেলার বাগেরহাট মহকুমার মোল্লারহাট থানার কালশিরা থেকে তিন মাইল দূরে ঝালরডাঙ্গা গ্রামে কমিউনিস্টদের খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ এক অভিযান চালায়। এই গ্রাম থেকে কিছু যুবক পালিয়ে গিয়ে কালশিরা গ্রামে জয়দেব ব্রহ্মের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। শেষরাতে পুলিশ জয়দেবের বাড়িতে হানা দেয়, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে যুবকরা আবার পালিয়ে যায়। পুলিশ কাউকে না পেয়ে জয়দেবের স্ত্রীকে মারতে শুরু করে।  জয়দেবের স্ত্রীর চিৎকার শুনে ঐ যুবকরা আবার ফিরে আসে এবং পুলিশকে মারতে শুরু করে। ঘটনাস্থলে এক পুলিশ মারা যায় এবং অন্যরা আহত হয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ খুন হওয়ায় জয়দেব এবং তার কিছু প্রতিবেশী বিপদ আঁচ করতে পেরে পালিয়ে যায় এবং অন্য সাধারণ গ্রামবাসী, যারা নির্দোষ ছিল তারা গ্রামে রয়ে যায়। পরদিন বিকালে  খুলনার পুলিশ সুপার একদল সৈন্য এবং সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে ঐ গ্রামে গিয়ে গ্রামের হিন্দুদের পাইকারি ভাবে প্রহার করা শুরু করেন এবং প্রতিবেশী মুসলমান দের হিন্দুদের সম্পত্তি লুঠ করতে উৎসাহ দেন। লুঠ হয় হিন্দুদের সম্পত্তি, মারা যায় বেশ কয়েক জন হিন্দু, অনেক নারী ও পুরুষকে জোর করে মুসলমান বানান হয়, মন্দিরের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং মন্দিরকে অপবিত্র করা হয়। পুলিশ, মিলিটারী এবং স্থানীয় মুসলমানরা অনেক হিন্দু মহিলাকে ধর্ষণ করে।

১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই গ্রামটি পরিদর্শনে যান পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। তিনি গিয়ে দেখেন  গ্রামটি জনশূন্য ও বিধ্বস্ত,  ৩৫০টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ৩টি বাড়ি অক্ষত আছে, বাকি সব বাড়ি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দুদের নৌকা, গরু, ছাগল সব লুঠ করে নেওয়া হয়েছে। কালশিরার এই অত্যাচারিত, গৃহহীন হিন্দুরা এক দিনে পথের ভিখিরিতে পরিণত হয়ে কলকাতায় পালিয়ে যায় এবং অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। তাদের এইসব কাহিনী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এই সাম্প্রাদায়িক উত্তেজনার খবর পূর্ববঙ্গের পত্রিকাগুলিতে অতিরঞ্জিত করে ছাপান হয়, যদিও পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের উপর পুলিশ ওমুসলমানদের যৌথ আক্রমণ এর সময় পত্রিকাগুলো চোখ বন্ধ করে রেখেছিল।
কালশিরা ও নাচোলের ঘটনার জন্য পূর্ববঙ্গ বিধানসভার হিন্দু বিধায়করা সংসদে একটি প্রস্তাব এনে আলোচনা করতে চান, কিন্তু সেই প্রস্তাব বাতিল করে দেওয়া হয়। ক্ষুব্ধ হয়ে হিন্দু বিধায়করা  সংসদ ত্যাগ করে বেরিয়ে আসেন। হিন্দু সাংসদদের এই ওয়াক আউটে মুসলিম লীগ সরকার ভালরকম রুষ্ট হয় এবং  ১৯৪৬ সালের পর হিন্দুদের আরেকবার শায়েস্তা করার জন্য প্ল্যান তৈরি করে। কলকাতার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে পূর্বববেঙ্গর পত্রিকাগুলোর অপপ্রচার এবং উস্কানি তো ছিলই, এর সাথে ১৯৫০ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ঘটানো হয় আরেকটি ঘটনা।

ঘটনাটি এরকম: একজন মহিলার  কাপড়ে লাল রং মাখিয়ে তাকে ঢাকার সচিবালয়ে ঘোরান হয়  এবং প্রচার করা হয় যে ঐ মহিলার দুটি স্তন কলকাতার হিন্দুরা কেটে নিয়েছে। এই প্রচার বিশ্বাস করে সচিবালয়ের সমস্ত মুসলিম কর্মচারী কাজ ফেলে হিন্দুদের ওপর বদলা নেওয়ার জন্য শ্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। নির্বোধ মুসলমানরা এটা চিন্তা করে দেখল না, কলকাতায় কারো স্তন কেটে নিলে তার পক্ষে সুস্থ ভাবে ঢাকায় এসে হাঁটা সম্ভব নয় এবং তা থেকে তাজা রক্ত ঝরাও সম্ভব নয়। ১৯৫০ এ কলকাতা থেকে ঢাকায় যেতে লাগত প্রায় ২৪ ঘন্টা। তাহলে কলকাতায় স্তন কেটে নিলে কিভাবে কারো স্তন থেকে ২৪ ঘন্টা পর তাজা রক্ত ঝরে? কিন্তু দূরাত্মার ছলের অভাব হয়না, সচিবালয় থেকে শুরু হওয়া হিন্দুবিরোধী মিছিল বড় হতে হতে ১ মাইল দীর্ঘ হয় এবং ভিক্টোরিয়া পার্কে গিয়ে দুপুর ১২টায় একটি বিশাল জনসভার রূপ নেয়। ঐ জনসভায় মুসলিম লীগের নেতারা হিন্দুবিরোধী বক্তব্য রেখে উপস্থিত মুসলমানদের হিন্দুদের বিরুদ্ধে আরো ক্ষেপিয়ে তোলেন এবং জনসভা শেষ হতে না হতেই পুরো ঢাকা শহরে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়।

শহরের সব জায়গায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযাগ ও লুঠপাট শুরু হল। যে যেখানে পেল সেখানেই হিন্দুদের খুন করতে লাগল। উচ্চপদস্থ সকল পুলিশ কর্মকর্তারা এই লুটতরাজ, খুন, অগ্নিসংযোগকে শুধু নীরব দর্শকের মতোই দেখলেন না,  তাঁরা দাঙ্গাকারী দের বুদ্ধি দিয়ে, কৌশল শিখিয়ে মুসলমানদের আরও উৎসাহ দিতে লাগলেন।

পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ওইদিন করাচী থেকে ঢাকায় পৌঁছলেন এবং ১৯শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করেন। ১১ই ফেব্রুয়ারি তিনি পূর্ববঙ্গের মূখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে হিন্দুদের রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন, কিন্তু তাঁর কথায় কোন কর্ণপাত করা হয়নি, হিন্দু নির্যাতন চলতেই থাকে।
এই সময় সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “ঢাকায় ৯ দিন অবস্থানকালে আমি ঢাকা ও তার পার্শ্ববতী এলাকার সব দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করি। ঢাকা নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা চট্টগ্রাম রেলপথে শত শত নিরপরাধ হিন্দুর হত্যালীলার সংবাদ আমাকে দারুণভাবে ব্যথিত করে।” জিহাদ সবসময়ই একটি লাভজনক ব্যাপার। কারণ এর সাথে গনিমতের মাল অর্থাৎ লুঠের সম্পত্তির বিষয়টি জড়িত। ঢাকায় যখন হিন্দুদের উপর হত্যালীলা, অগ্নি সংযোগ ও তাদের ধনসম্পত্তি লুঠ চলছে  এবং ঢাকার মুসলমানরা লাভবান হচ্ছে, তখন বরিশালের মুসলমানরা এই লাভ থেকে পিছিয়ে থাকবে কেন? 

বরিশালে সেই সময় মুসলিম লীগের আরেক নেতা এবং পাকিস্তান আদায়ের বলিষ্ঠ নায়ক এ কে ফজলুল হক, কলকাতায় তাঁর ঝাউতলা রোডের বাড়ি বিক্রি করার জন্য কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। হিন্দুদের ওপর মার এবং লুঠপাট শুরু করতে হবে, কিন্তু এর জন্য একটা ইস্যু দরকার। বরিশাল শহরে মিথ্যা গুজব ছড়ান হল যে কলকাতায় হক সাহেবকে হিন্দুরা খুন করে ফেলেছে। রং মাখান কাপড়কে যারা স্তন কাটা রক্ত ধরে নিয়ে ঢাকা এবং তার আশেপাশে হাজার হাজার হিন্দুকে খুন করতে পারে, তাদের সম্পত্তি লুঠ করতে পারে, বাড়িঘর দোকানে আগুন দিতে পারে, মেয়েদের ধর্ষণ করতে পারে, সেই মুসলমানদের কাছে হক সাহেব বেঁচে আছেন না সত্যিই মারা গেছেন তার সঠিক তথ্যের কোন দরকার ছিল না। শুরু হয়ে গেল বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালি ও পিরোজপুর, বড়গুণা জেলায় খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুঠপাট। খুন করা হল ৭ হাজার হিন্দুকে। এর সাথে ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুঠপাটের বিষয়টি কল্পনা করে নিন।

ঢাকা ও নারায়নগঞ্জে হত্যা, ধর্ষণ, লুঠ, অগ্নিসংযোগ আগে থেকেই চলছিল, বরিশালের সাথে সাথে তা সম্প্রসারিত হল কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালি, সিলেট, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ এবং  মাদারীপুর জেলায়। এই সবগুলো জেলা মিলিয়ে ১৯৫০ এর  ফেব্রুয়ারি মাসে খুন করা হল ৫০ হাজার হিন্দুকে। আবার অনুরোধ করব, এর সাথে ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুঠপাট এবং ধর্মান্তর কল্পনা করে নিন। বরিশাল শহরে এরকম পরিস্থিতির খবর পেয়ে বাড়ি বিক্রি বন্ধ রেখে ফজলুল হক তড়িঘড়ি বরিশাল ফিরে শহরে ও তার আশে পাশে ১৬ টি জায়গায় জনসভা করে বললেন, “তোমরা দেইখ্যা যাও, আমি মরি নাই। কিন্তু তোমরা এইটা কী করলা?”

কিন্তু কে শোনে কার কথা? ঐ সময় ফজলুল হকের কথা শুনে এ্যাকশন বন্ধ করার চেয়ে হিন্দুদের মেরে লুঠের মাল হস্তগত করা ছিল নীতিহীন মুসলমানদের কাছে অনেক বেশী জরুরী। ফজলুল হক স্বশরীরে বরিশালে উপস্থিত হয়েও হিন্দুদের হত্যা করা থেকে মুসলমানদের নিরস্ত করতে পারেননি। যদিও এই সময়  হিন্দু হত্যা বন্ধে তার ফজলুল হকের সদিচ্ছা ছিল, এজন্য তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না হক ছিলেন পাকিস্তান সৃষ্টির একনিষ্ঠ সমর্থক, যে পাকিস্তানের জন্য হিন্দুদের এত রক্ত ঝরিয়েছিল মুসলমানরা। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ফজলুল হকই প্রথম পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবী তোলেন, ১৯৪৬ সালে ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডের তিনি ছিলেন নীরব সমর্থক এবং ১৯৪৬ সালে নোয়াখালির ঘটনায় যে দুচার জন মুসলমানকে এ্যারেস্ট করা হয়েছিল, ফজলুল হক তাদের ছেড়ে দেবার জন্য সুপারিশ করেছিলেন।

বরিশালের এই সংবাদ পেয়ে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ঢাকা থেকে বরিশাল গেলেন। সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “ইং ২০শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০ আমি বরিশাল পৌঁছলাম এবং সেখানকার দাঙ্গার ঘটনাবলী শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই জেলা শহরে প্রচুর হিন্দুবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক হিন্দুকে খুন করা হয়েছে। এই জেলার প্রত্যেকটা দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা আমি পরিদর্শন করি। আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না কী করে জেলা শহর থেকে মাত্র ৬ মাইল পরিধির মধ্যে মোটর রাস্তা দ্বারা যুক্ত কাশীপুর, মাধবপাশা এবং লাখুটিয়ার মতো স্থানে মুসলিম দাঙ্গাবাজরা বীভৎস তাণ্ডব সৃষ্টি করতে পারে! মাধবপাশার জমিদারবাড়িতে ২০০ জনকে হত্যা ও ৪০ জনকে আহত করা হয়। মুলাদী নামক একটি স্থানে নরকের বিভীষিকা নামিয়ে আনা হয়। একমাত্র মুলাদীতেই ৩০০ জনের বেশি লোককে খুন করা হয়েছে। মুলাদী গ্রাম পরিদর্শন কালে আমি স্থানে স্থানে মৃত ব্যাক্তিদের লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি।

দেখলাম নদীর ধারে কুকুর শকুনেরা  মৃতদেহগুলি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। আমি জানতে পারলাম সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে পাইকারি হারে খুন করার পর সব যুবতী নারীকে মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়েছে। রাজাপুর থানার অন্তর্গত কৈবর্তখালি গ্রামে ৬৩ জনকে একদিনে হত্যা করা হয়। ঐ থানা অফিসের কাছেই অবস্থিত হিন্দু বাড়িগুলি লুঠ করে জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের কেটে ফেলা হয়। বাবুগঞ্জ বাজারের সমস্ত হিন্দুর দোকান প্রথমে লুঠ করে পরে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিস্তারিত বিবরণ যা এসেছে, তা থেকে খুব কম করে ধরলেও একমাত্র বরিশাল জেলাতেই খুন করা হয়েছে ১০ হাজার হিন্দুকে। ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গের দাঙ্গার বলির সংখ্যা মোট ৫০ হাজারের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াবে। গভীর দুঃখে আমি কাতর হয়ে পড়লাম। প্রিয় পরিজন হারান, স্বজন  হারান নারীপুরুষ ও শিশুদের সব হারান কান্না, বেদনা, বিলাপে আমার ভগ্ন হৃদয় হাহাকার করে উঠল। আমি নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম, “ইসলামের নামে কী আসছে পাকিস্তানে?”

উদ্বাস্তু হিন্দুদের ভারতমুখী স্রোত: ১৯৪৮-৪৯ সালে বিচ্ছিন্ন দুএকটি ঘটনা যা  উপরে উল্লেখ করেছি তা ঘটলেও ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে হিন্দুদের উপর শুরু হওয়া গণআক্রমণ চলতে থাকে পুরো একমাস ধরে। এই সময় থেকেই ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য হিন্দুদের দেশত্যাগের স্রোত শুরু হয়। সেই সময় পূর্ববঙ্গে গোয়ালন্দ, পার্বতীপুর ও খুলনা, এই তিনটি জায়গা থেকে কলকাতার ট্রেন পাওয়া যেত। এজন্য ঢাকা,  ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর জেলার লক্ষ লক্ষ হিন্দু বাড়িঘর, জমিজমা সর্বস্ব ত্যাগ করে একবস্ত্রে দেশত্যাগের জন্য এসে জড় হতে শুরু করে গোয়ালন্দে, উত্তরাঞ্চলের হিন্দুরা পার্বতীপুরে এবং যশোর ও খুলনাসহ পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের হিন্দুরা খুলনা স্টেশনে। সীমান্তের আশপাশের জেলার হিন্দুরা বাসে করে সড়ক পথে বা পায়ে হেঁটে ঢুকে পড়ে ভারতে। বরিশাল থেকে কলকাতা যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল জাহাজ। তাই বরিশাল, পটুয়াখালি, ভোলা জেলার হিন্দুরা বরিশালে এত পরিমাণে এসে জড় হতে শুরু করে যে জেটিতে স্থান সংকুলান অসম্ভব হয়ে পড়ে।