কাঁঠাল বীচি, ‘মাল ই গণিমত’ আর সীমার লাল তিল..!

কী বেআক্কেলে প্রশ্ন ! কাঁঠাল বীচি কী লাল হয়, না সাদা? কোন গুলি ভাজা খেতে কেমন? আমার আধুনিকা শহুরে বউয়ের তো জানারই কথা নয় কাঁঠাল বীচি যে ভেজেও খাওয়া যায়। মাথায় ছিট পড়ার সব লক্ষণ স্পষ্ট ! ওর জানার কথা নয়, এই লালচে লম্বাটে কাঁঠাল বীচি গুলি আমাকে টেনে নিয়ে গেছে শৈশবের কোন দিন গুলিতে….।

পাশের বাড়ির ভাড়াটে ছেলে মেয়েদের সুতলি বাঁধা ‘বাংলা প্যান্ট’ এর কোঁচড়ে সব সময় গোঁজা থাকতো কাঁঠাল বীচি ভাজা। তখন ভাবতাম, শখ করেই বুঝি খায় ওরা। মাঝে মাঝে আমাদেরও দিত, খেয়ে দেখতাম খুব স্বাদ ! ওরাই শিখিয়েছিল , লম্বাটে লাল রং এর বীচি গুলি খেতে দারুণ মিষ্টি আর খুব সুন্দর একটা গন্ধ থাকে এতে । নির্জনে ডেকে নিয়ে কোঁচড়ে গোঁজা কাঁঠাল বীচি দিতে গিয়েই সীমা একদিন আমাকে ওর শরীরের একটা লাল তিল দেখিয়েছিল, যদিও আমি তখন এর অর্থ বুঝতে পারি নি, পারার কথাও নয়। মেয়েরা মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি পেকে যায়, বা এখন বুঝতে পারি পরিস্থিতিই ওকে অসময়ে পাকিয়েছিল। কিন্তু এখন ভাবি, এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না। বলছি সবটা –

তখন তো আর বাড়ি বাড়ি বাউন্ডারি ওয়ালের চল ছিল না, আমাদের বাড়ি আর পাশের জ্ঞাতি বাড়ি ছিল একাকার, বিশাল। আমাদের সীমানার লাগোয়া ঘরেই ওদের বাড়িতে ভাড়াটে হিসাবে থাকতো সীমারা, ছিল আরও কয়েক ঘর ভাড়াটে। প্রচুর ছেলে মেয়ে, এখনকার মতো উপকরণ বেশি ছিল না, কিন্তু দারুণ খেলাদার মজাদার ছিল দিন গুলি। সীমারা ছিল তিন ভাই, তিন বোন। সবচেয়ে বড় বোনকে আমরা দেখি নি, নামও শুনিনি। ওর কথা কেন জানি ওদের খুব বেশি বলতেও শুনতাম না। সীমা ছিল আমার সমান, ওর ঠিক বছর দুয়েকের বড় দুই ভাই দিলীপদা আর প্রদীপদা ছিল জমজ। সুদীপদা সবচেয়ে বড়, রাশভারী – মুখ গুঁজে পড়াশোনা করত । মাঝখানে কবিতাদি, বিষাদমাখা মুখ নিয়ে কী জানি ভাবত সারাদিন । প্রদীপদা তো পাড়ায় খুব বেশি মিশত না, দিলীপদাকে পাড়ার সবাই ‘বাংলা দিলীপ’ বলে খ্যাপাত, আমরাও । বাংলাদেশ থেকে এসেছে খুব বেশি দিন হয় নি তো ! এখন ভাবলে হাসি পায়, আগে হোক আর পরে, আমরা সবাই তো ওখান থেকেই ওঠে এসেছি। নিজেদের দুর্দশা নিয়ে এরকম মজা মনে হয় বাঙালির পক্ষেই করা সম্ভব।

যাই হোক, ওদের মা, যাঁকে আমরা দু ভাই জ্যাঠিমা ডাকতাম, কালোর মধ্যে ভারী সুন্দর ছিল দেখতে। জ্যাঠু ছিল ফর্সা, লম্বা। মলিন পোষাকেও চেহারায় চলনে বলনে সম্ভ্রান্ত ছাপ ছিল স্পষ্ট। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটতেন, পরে শুনেছি মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর গুলি লেগেছিল।
পড়াশোনা জানতেন বলে জ্যাঠু একটা দোকানে হিসাব দেখতেন, তখনকার ভাষায় ‘খাতা লিখতেন’ ।  জ্যাঠিমা, কবিতাদি, প্রদীপদা আর সীমা ঘরে বসে কাগজের ঠোঙা বানিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি করত। এভাবেই কোন মতে চলতো এতবড় সংসারটা, সুদীপদার পড়ার খরচ। কতদিন গিয়ে দেখেছি, কবিতাদি আনমনে ঠোঙা বানিয়েই চলেছে, আমি যে সামনে বসে আছি এতক্ষণ ধরে , কোন হুঁশই নেই। কিন্তু যখনই জ্যাঠু দুপুর বেলা খেতে আসতো, গলার আওয়াজ পেয়েই দৌড়ে হাত মুখ ধোয়ার জল নিয়ে আসত, খাওয়ার সময় হাত পাখা নিয়ে বাতাস করতে বসে যেত । দিলীপদাকে খুব কমই দেখতাম ঠোঙা বানাতে, সারাক্ষণ টৈ টৈ।  দিলীপদাকে পেয়ে আমাদের কাছে খুলে গিয়েছিল নতুন দিগন্ত। ঘুড়ি বানানো , গুলতি, ডাংগুলি, ঠুসকি, বল বিয়ারিং দিয়ে তেকোনা গাড়ি, আমের আঁটি ঘষে ঘষে বাঁশি – আরও কত কী ! এমনিতে জ্যাঠিমাকে কোনদিন উঁচু গলায় কথা বলতে শুনি নি, কিন্তু ছেলে মেয়েদের যখন মাঠ থেকে ডেকে আনতেন, কেমন যেন অদ্ভুত অনুরণন করে হাঁক পাড়তেন। আগে অনেক বড় খোলামেলা জায়গায় থাকতেন তো, মনে হয় সেই অভ্যাস ! ছোট বেলায় সেই ডাক শুনে মনে হত কোন নদী, খাল বা তেপান্তরের মাঠ থেকে যেন ভেসে আসছে সেই ডাক – দিলী.. ঈ.. ঈ.. প, সী… ঈ… ঈ… মা.. আ… আ !

এত অভাবের মধ্যেও জ্যাঠিমা ঘরদোর সাধ্যমত মোটামুটি পরিপাটি করেই রাখতেন। তবে ওদের ঘরে এমন কিছু জিনিস দেখতে পেতাম, যা এইরকম ঘরে ঠিক মানায় না। হাতির দাঁতের দাবার ঘুঁটি, পেতলের মিনে করা ফুলদানী, মাঝখানটা পেতলের  কাঠের খুব ভারী চ্যাপ্টা চাকতির মতো একটা জিনিসের কথা খুব মনে আছে। ছেঁড়া পোষাক পরতে দেখেছি, কিন্তু এদের কাউকে কোনদিন নোংরা ময়লা পোষাকে দেখি নি। প্রদীপদা দিলীপদা আর সীমার পরনে থাকতো ইজের টাইপের ঘরে বানানো সুতির ডোরাকাটা হাফ প্যান্ট, সুতলি বাঁধা – আমরা বলতাম ‘বাংলা প্যান্ট’, আদুর গা। আমরা পরতাম ‘ইংলিশ প্যান্ট’। তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি – খাওয়া দাওয়ার অভাব ছিল প্রচন্ড। দিলীপদাকে প্রায়ই বলতে শুনতাম – “খিদে পেয়েছে রে, ভীষণ খিদে”! ওদের মুখে ওদের আরো ছোট বেলার যে গল্প শুনতাম, ওদের বাড়ির যে গল্প শুনতাম – এখনকার ওদের অবস্থার সঙ্গে কোনো মতেই মেলাতে পারতাম না। ঐ বয়সে এতকিছু ভাবার কথাও নয়, শুধু মনে হতো, ওরা হয়তো অতীতের মিথ্যে ফুটানি দেখাচ্ছে এখনকার অভাবের লজ্জা ঢাকতে। মাকে বললে অবশ্য মা একটা শ্বাস ফেলে বলতো – “ওদের অবস্থা এরকম ছিল না রে”! খেলতে খেলতে একটু পর পরই এদের দেখতাম কোঁচড়ে গোঁজা সেই কাঁঠাল বীচি মুখে পুরতে। মিষ্টি আলু পোড়াও খেতে দেখেছি। ভাবতাম এদের এতো খিদে কি করে পায় ! আমাদেরও দিত, বেশ লাগতো খেতে । মাঝে মাঝে হিংসেও হত, এত অন্য রকম স্বাদের খাবার এরা খায় ! তখন তো এত অভাব টভাব বুঝতাম না, ভাবতাম শখ করেই বুঝি খায়।

এখন যেমন পেট থেকে বেরিয়েই ছেলে মেয়ে বোধ জেগে ওঠে, আমাদের ছোটবেলায় এরকম ছিল না। ধিড়িঙ্গে হয়েও আমরা একসঙ্গে হুটোপুটি করেছি, ‘সংসার সংসার’ খেলতে গিয়ে স্বামী স্ত্রী হয়েছি। কোলে বসে বা কোলে বসিয়ে পেছন থেকে জাপটে চোখ ধরে খেলেছি ‘আয়রে আমার টিয়ে’। অন্য রকম কোন অনুভূতি কিন্তু হত না। আর এখন? এক নির্জন দুপুরে সীমা আমাকে ইশারায় আড়ালে ডেকেছিল যেন মহার্ঘ্য কিছু দেবে বলে। গিয়েছিলাম, কিন্তু ও যখন আমায় বলল আমার নিজের হাতে ওর কোঁচড় থেকে কাঁঠাল বীচি বের করতে – হতাশ হয়েছিলাম। ও বুঝতে পেরে ওর শরীরের একটা লাল তিল দেখিয়েছিল আমাকে। কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে না পেরে লজ্জায় চলে এসেছিলাম তাড়াতাড়ি, কাঁঠাল বীচি না নিয়েই । চলে আসতে আসতে কানে এসেছিল ওর রাগত অস্ফুট স্বর – “জুলা, আহালডাইয়া”! আমার মনে হয় মাঝখানে একটা পাতলা পার্টিশান দেওয়া দুটি ঘরে এতগুলো মানুষ থাকাতেই ও এত অল্প বয়সে পেকে গিয়েছিল। যাই হোক, প্রায়ই দেখতাম জ্যাঠিমা পাশের বাড়ির গাছ থেকে বকফুল, সজনে পাতা পেড়ে আনছেন, নিচের জলা থেকে শাক পাতা কুড়িয়ে আনছেন। লাউ, চাল কুমরোর খোসা গুলি পর্যন্ত ফেলতেন না, যত্ন করে রেখে দিতেন। অভাবে স্বভাব নষ্ট – জ্যাঠিমার কথায় অনেক দিন আমাদের ঘর থেকে আলুটা বেগুনটা পাস করতে গিয়ে মার কাছে হাতে নাতে ধরাও পড়েছি। মা অবশ্য গম্ভীর শুধু বলতো – বলে নিলেই তো হয় ! এখন বুঝতে পারি, এই সামান্য রোজগারে জ্যাঠিমার পক্ষে সম্ভব ছিল না এতগুলো পেটের খোঁদল ভরাট করা। প্রায়ই শুনতাম কান্নাকাটি, এখন বুঝি সে ছিলো খিদের কান্না, পেট ভরে খেতে না পারার কান্না। মা বাবার কাছে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে ! কিন্তু এদের তো এরকম হওয়ার কথা ছিল না।

আলাদা করে কবিতাদির কথা কিছু বলতে হয়। কবিতাদি ছিল একদম জ্যাঠিমার মতো, কালোর মধ্যে খুব সুন্দর, টানা টানা চোখ। কিন্তু সবসময় খুব আনমনা, কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে। এমনিতে খুব কম কথা বলতো, কিন্তু মার সঙ্গে কথা বলতে দেখতাম । মা’ও মনে হয় কবিতাদিকে খুব ভালোবাসতো। পাশের বাড়ির বিয়ে, কবিতাদিরাও নিমন্ত্রিত। কিন্তু কবিতাদি কিছুতেই যাবে না। মা বুঝতে পেরে আলমারি খুলে দিয়েছিল – যে শাড়িটা ভালো লাগে পরার জন্য, গয়নাও। কিন্তু কবিতাদিকে কিছুতেই রাজি করানো যায় নি। দিলীপদার মধ্যে এরকম আড়ষ্টতার কোন বালাই ছিল না। ঐ নিমন্ত্রণের কথা মনে থাকার আরো কারণ হল জ্যাঠিমাদের দেওয়া উপহার। কী দিয়েছিল, এতদিন পর এখন আর মনে নেই, কিন্তু সেটা এদের অবস্থার সঙ্গে এতটাই বেমানান ছিল যে, বড়দের অনেক দিন এ নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছি, ফুটানি! কবিতাদির কথায় আসছি – কবিতাদির গানের গলা যে ছিল এতো সুন্দর, আমরা কেউ জানতামই না। আমাদের উঠানে ছিল একটা খাটিয়া , সন্ধ্যের পর কাজ কর্ম সেরে সেখানে এসে জুটত মহিলারা সবাই। কবিতাদি আসতে চাইতো না ,  মা ডাকলে কখনো কখনো আসতো। একদিনের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে – সবাই চলে গেছে, শুধু মা আর কবিতাদি। পূর্ণিমা ছিল, নাকি কাছাকাছি ছিল – মনে নেই। জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। মা গান ধরেছে “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো…” । কিছু ক্ষণ পর আমাদের অবাক করে দিয়ে কবিতাদি মায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইতে শুরু করলো। আমরা অবাক, যাকে কোনদিন গুনগুনিয়েও গাইতে শুনি নি, তার এতো সুন্দর আর এতো তৈরি গলা কী করে হয় ! একটা আতা গাছ ছিল, সেই আতা গাছের নিচেই ছিল খাটিয়াটা। আতা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো আর সেই গান – সেই অপার্থিব দৃশ্য বা অনুভূতি কোনদিন ভোলার নয়। পরে জেনেছিলাম কবিতাদি নাকি বাংলাদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত গান গাইত। এর কয়েক দিন পরেই এক সকালে কেউ এসে দেখতে পায় ঐ বাড়ির কোনার কাঁঠাল গাছটাতে কবিতাদি ঝুলছে। আমাদের দু ভাইকে দেখতে যেতে দেওয়া হয় নি, পাছে ভয় পাই । এখন বুঝি, অন্যরা মানিয়ে নিতে পারলেও কবিতাদির পক্ষে সম্ভব হয় নি জীবনযাত্রার তারতম্য, পড়াশোনা, গান বন্ধ হয়ে পারিপার্শ্বিক ছেড়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া। শেকড় থেকে তুলে ফেলা সব গাছ কি অন্য জায়গায় বাঁচে !

অভাবের কাছে কি শোকও হার মানে? নাকি শোকে শোকে মানুষ পাথর হয়ে যায়? মাত্র দশ বারো দিন ওদের ঘরে দেখেছিলাম আস্তে আস্তে ফিকে হতে থাকা শোকের আবহ। এরপর আবার সব স্বাভাবিক। কথা কম বললেও একটা মানুষের উপস্থিতির শূন্যতা এত তাড়াতাড়ি ভরাট হয়ে যায় ! নাকি অভাবের সংসারে একটা পেট কমে গেল ! তবে পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল জ্যাঠুর মধ্যে। অবস্থার তারতম্য, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হতাশা আর বড় আদরের প্রথম সন্তানের স্মৃতি এতদিন জ্যাঠুকে মানসিক ভাবে দুর্বল করতে না পারলেও কবিতাদির মৃত্যুর পর উনি কিরকম জানি হয়ে গিয়েছিলেন। নেশা করতেন কি? জ্যাঠিমার গায়ে হাত উঠতো কি? কোন কোন দিন দেখতাম জ্যাঠিমার চোখ ফোলা, গালে কালশিটে – কিন্তু কোনদিন জ্যাঠিমাকে চিৎকার করে কাঁদতে শুনি নি। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না ওদের !

যতটুকু বুঝতাম, জ্যাঠুদের ছিল পাটের আড়তদারী। বেশ বড় ব্যবসা, বেশ বড় একান্নবর্তী পরিবার। গ্রামের বেশির ভাগ হিন্দু পরিবার অনেক আগেই অবস্থা বুঝে ভারতে চলে এলেও এক সময়ের মুক্তিযোদ্ধা জ্যাঠু ‘জয় বাংলা’ র টানে গোঁ ধরে পড়েছিলেন। পরে যা হয় – স্বপ্ন ভঙ্গ, আর কচুরিপানার জীবন।
এখন বুঝি – সবাই চলে এলেও উনি ভাবতেই পারেন নি , উনার মতো লক্ষ লক্ষ বাঙালির আত্মত্যাগে শুধু বাঙালির জন্য জন্ম নেয়া বাঙালির স্বপ্নের ‘জয় বাংলা’ তেই যে উনার মতো বাঙালিদের ঠাঁই নেই। বাঙালি হলেও ওনারা যে হিন্দু, কাফের মালাউনের বাচ্চা ! উনার জানা ছিল না, দেশভাগের পরও হিন্দু প্রধান ভারত সবার হয়ে থেকে গেলেও, একই দেশ ভেঙ্গে সৃষ্টি হওয়া মুসলিম প্রধান অংশগুলি যে শুধুই মুসলমানদের, এই অংশ গুলি যে কোনদিনই সবার হয় না, হতে পারে না । উনার জানা ছিল না, সেই দেশে থাকা বিধর্মী কাফেরদের ঘরের মেয়েরাও যে ‘ মাল ই গণিমত’, অর্থাৎ ঐ মেয়েদের উপর মা বাবার চেয়েও বেশি ধর্ম সম্মত অধিকার যে ঐ নরপশুদের ! বড়জোর পূর্ণিমা রানী শীলের বাবার মতো হাতজোড় করে একজন একজন করে আসার অনুরোধ করা যায়। সবচেয়ে বড় মেয়ে ‘মাল ই গণিমত’ হয়ে হারিয়ে যাওয়ার পর উনার ভুল ভাঙলো এবং সব ফেলে ভাসতে ভাসতে এখানে আসা। নোবেল সেনের ‘ভূমি সংস্কার’!

জ্যাঠু অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার খরচ যোগাতে ঘটি বাটি সব বেচে খরচ কমাতে ওরা খাল পাড়ের কোন এক বস্তিতে উঠে গিয়েছিল। পড়াশোনা অন্তঃপ্রাণ সুদীপদা পড়া ছেড়ে ঐ দোকানেই বাবার কাজটা নিয়ে নিয়েছিল। এরপর আর খোঁজ খবর রাখি নি। দরকারই বা কী , আমরা তো ভালোই আছি !

যাই হোক, ওদের কথা ভেবে তো আমাদের লাভ নেই, আমরা তো ভালোই ছিলাম, আছি। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল , শখ করে কাঁঠাল বীচি ভাজা খেতে। মুখে না বললেও বউ ঠিক টের পেয়েছিল। যতো পাগলামিই করি, বউ যেন সবসময় তৈরি সব পাগলাটে ইচ্ছে পূরণ করতে। পরের রোববারই সারপ্রাইজ হিসেবে মুখের সামনে হাজির লালচে রং এর লম্বাটে কাঁঠাল বীচি ভাজা। কাজের মাসীকে দিয়ে বালি যোগাড় করে, সেই বালিতে ভাজা। কিন্তু খোসা ছাড়িয়ে মুখে দিয়ে কোঁচড়ে গোঁজা বীচির সেই স্বাদ তো পেলামই না, সুন্দর গন্ধটাও না। বরং মুখটা কেমন বিস্বাদ হয়ে গেল ! অথচ সেই একই রকম লাল রং এর লম্বাটে বীচি।

কিন্তু কেন? খুব বেশি ভেবে ভেবে আমি কি নিজের অজান্তেই ঐ জ্যাঠুর জায়গায় নিজেকে নিয়ে বসাচ্ছি? ভালো ছিলাম, আছিও তো । কিন্তু পরিস্থিতি যেভাবে পাল্টাচ্ছে, ভালো থাকবো কি না বা আমার কিছু না হলেও আমার পরবর্তী প্রজন্ম ভালো থাকবে কি না – সেই চিন্তা কি অজান্তেই মাথায় ঢুকে বসে আছে? না, এমন তো হওয়ার নয় ! চুড়ান্ত স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক বেইমান এক জাতির একজন হিসাবে আমার তো এরকম হওয়ার কথা নয়!

তাহলে কেন এরকম হচ্ছে? কেন এতবছর পর ওদের কথা ভেবে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে? নিষ্ফল আক্রোশে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠছে হাত, কাদের উদ্দেশ্যে?