ভারতের ধর্মগুরু গুরমিত রাম রহিম ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তার লক্ষ লক্ষ ভক্ত গোটা পাঞ্জাব রাজ্যকে যুদ্ধ পরিস্থিতি করে তুলেছে। দিল্লিতে রেড এলার্ট জারি হয়েছে। সারা বিশ্বের রাম রহিমের ৫ কোটি ভক্ত বা অনুসারী আছে। এই ৫ কোটি মানুষ তাদের ধর্মগুরুর জন্য গোটা পৃথিবীকে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। কিংবা নিজেরাই আগুনে ঝাপিয়ে আত্মাহুতি দিতে পারে। রাম রহিম ধর্ষণ করাকে যদি বলে এটা কেবল মাত্র তার জন্য বৈধ করা হয়েছে তাহলে তার কোটি কোটি অনুসারী বিনা বাক্যে সেটাকেই মেনে নিবে। তাদের গুরুর ধর্ষণের অধিকারের জন্য পৃথিবীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। শুধুমাত্র পাঞ্জাবে তার ৫ লক্ষ ভক্ত-অনুসারীদের তান্ডবে ভারতের ইতিহাসে একটা মামলার রায়ের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মুখে পড়ল। কি এমন জাদুরকাঠি আছে এইসব ধর্মগুরু, অবতার, নবী, পীরদের হাতে যাতে তারা মানুষকে ভেড়ার পালে পরিণত করে ফেলে? হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়ণকারী এইসব মহাপুরুষদের কোন কাজই কেন তাদের ভক্তদের বিবেক যুক্তিতে বাধে না?

প্রথম কথা হচ্ছে এই সমাজের একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষও ‘নবীতে’ “অবতারে’ বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে নবী, অবতার, পীর, সাধুদের সঙ্গে আল্লাহ ভগবানের সরাসরি একটা যোগাযোগ আছে। তবে কেউ একজন এসে নিজেকে নবী বলে দাবী করলে সেটা হয়ত এক কথাতে বিশ্বাস করে নিবে না। অলৌকিক বিষয়ে বিশ্বাস আছে তবে কেউ সেরকম দাবী করলেই সেটা সব মানুষ মেনে নিবে না। এখানেই আসল পয়েন্টটা খেয়াল করতে হবে। একবার যদি আপনি কাউকে বিশ্বাস করে ফেলেন তার সঙ্গে আকাশের হট কানেকশন আছে- ব্যস, তাহলেই চলবে। যেহেতু পৃথিবীতে আধ্যাত্বিক শক্তিধারী নবী, বাবাজি, মাতাজি, পীর-আউলিয়াতে আপনার বিশ্বাস আগেই ছিলো- যুক্তিহীন এই বিশ্বাস যখন বিশেষ একজন ব্যক্তির উপর গিয়ে পড়বে, সে তখন আপনাকে দিয়ে মানুষ হত্যা পর্যন্ত করাতে পারবে। নিজের শিশু কন্যাকে তার বিছানায় অবলীলায় পাঠিয়ে দিবেন। আপনার সয়-সম্পত্তি তার পথে ব্যয় করে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে পড়লেও কখনো আপনার ভক্তি এতটুকু কমবে না।

একজন নবী, অবতার, পীর, সাধুর প্রথম পুঁজি হচ্ছে সমাজে এইসব হাজার হাজার বছর ধরে চলা অতিপ্রাকৃত ব্যাপারে মানুষের বিশ্বাস আর আস্থা। তাকে শুধু যেটা করতে হবে আপনার আস্থাটা আদায় করে নেয়া নিজের উপর। এইসব মানুষ অসম্ভব একটা ক্ষমতার অধিকারী হয়ে থাকে। জন্মগত এই ক্ষমতাটা রাজনীতিবিদদেরও থাকে। তাদের একটা ভাষণে মানুষ খইয়ের মত ফুটে। নিজের জীবনের মায়া ভুলে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আপনি ইচ্ছা করলেই সেরকম করে কখনই মানুষকে জাগাতে পারবেন না। কথায়, ব্যক্তিত্বে, দৃঢ়তায়, অসীম ধর্য আর শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবার মানুষিকতায় তারা হ্যামিলনের বংশি বাদকের মত সম্বহোন করে ফেলতে পারে। হিটলার তার একটি উদারহণ। মধ্যযুগের এইসব ক্ষমতাধররা ছিলো একেক জন ধর্মীয় নেতা। প্রকৃতপক্ষে এরা একেকজন সাইকোপ্যাথ। নিজেদের ধর্মমতকে প্রতিষ্ঠা করতে এরা তাদের অনুসারীদের দিয়ে অবিশ্বাসীদের হত্যা, তাদের নারীদের ধর্ষণ, দাসে পরিণত করা থেকে হেন কিছু নেই বাদ দেয়নি। মোটেই আশ্চর্যের কিছু নেই যে সেসব কুকীর্তিগুলো তাদের আজকের যুগের ভক্তদের মনেও কোন প্রশ্ন কিংবা সন্দেহ আনে না। বরং এইসব কুকীর্তিগুলোর পক্ষে তারা নিজ দায়িত্বে একটি করে যুক্তি তৈরি করে। এখানেও সেই একই কারণ। যেহেতু তারাও নবী, পীর, অবতারে সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাসী, তারা মনে করে তাদের মহাপুরুষের সঙ্গেই যেহেতু বিশ্বের সত্য ঈশ্বরের যোগাযোগ ছিলো বা কাছের মানুষ ছিলো কাজেই তিনি কোন অন্যায় করতে পারেন না। তিনি কোন পাপ কাজ করতে পারেন না। ভারতের গুরমিত রাম রহিমের ভক্তদের মনে ঠিক এটাই কাজ করছে। তারা গোটা ভারতকেই আগুনে জ্বালিয়ে দিতে পারে আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে। মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় ভয়টা হচ্ছে এইসব সাইকোপ্যাথিদের কোটি কোটি অন্ধ অনুসারীতে পৃথিবী ভরপুর হয়ে আছে…।