#আমি_অদৃশ্য_১

অবশেষে সেই সময় এসে গেছিল । যখন শৃঙ্খলিত পৃথ্বীরাজ কে ঘোরী সেনাবাহিনী টেনে হিজরে বধ্য ভূমিতে উপস্থিত করল। পৃথ্বী এখন অন্ধ।ওকে মুহম্মদ ঘোরী যুদ্ধে পরাজয়ের পর দুটো চোখ নষ্ট করে দিয়েছে।

কিন্তু মুহম্মদ  ঘোরী  পৃথ্বী কে তার সামনে এনে অনেক বড় ভুল করল। এই সময়ের জন্যই আমি এত দিন এত দিন এত অপেক্ষা করেছি। আমার প্রাণ প্রিয় বন্ধু পৃথ্বী কে চরমতম অত্যাচারিত হতে দিয়েছি। এই মুহূর্তের জন্যই তো আমি এত অংক , এত হিসাব কষেছি । ঈশ্বর সাক্ষী এই সময়ের জন্য একমাত্র পৃথ্বীই যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তা তিনি যতই অন্ধ হন। বোকা মেলছ ঘোরী এটাই জানত না যে , এটা আমার কত বড় চাল ছিল….

গজনীর ওই দিন আমার ও পৃথ্বী র জীবনের সব থেকে গুরুত্ব পূর্ন দিন ছিল। ওইদিন রাজা পৃথ্বীরাজ কে তার সূর বীরতার প্রমান দিতে হত, আর আমার শব্দের শুদ্ধতার । একজন বিশাল দেহী কালো পোষাক পড়া , অনেকটা সাদা বরাহের মত দেখতে আফগানী সেনা এসে পৃথ্বীর হাতে গান্ডিব তুলে দিল।

প্রচন্ড উত্তপ্ত আবহাওয়া। তপ্ত বালুকা রাশি। মাথার উপর মার্কণ্ডেয় তার রোষ দিবস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বারিয়ে চলেছেন। আমি আজ গৈরিক বেশ ধরেছি। এখানে দীর্ঘ কাল ব্যাপী মেলছ আক্রমণের পরেও  কিছু বৌদ্ধ ও হিন্দু জীবিত। সবাই এসেছে বধ্য ভূমিতে রঙ্গ দেখতে। মহিলা নেই।সব পুরুষ । কেউ খাইবার পাখতুয়ান দের মত পোশাক পড়েছে , কেউ বা আফগানী পাঠান দের মত, তো কেউ রাজস্থানি ,কেউ বালোচ দের মত। এরা সবাই সনাতন বা বৌদ্ধ ছিল। এখন অধিকাংশই মেলছ যবন হয়েছে। কেউ ভয়ে, কাউকে জোর করে…

অন্ধ পৃথ্বীর হাতে গাণ্ডীব তুলে টঙ্কার নিল। এত অত্যাচারের পরেও তার দেহে কি প্রচন্ড শক্তি , কি অসম্ভব মানসিক শক্তি….পৃথ্বী হাসল…তার শর সংযোজন করলেন।

আমি পৃথ্বীর দিকে তাকিয়ে বললাম

” চার বাঁশ , চব্বিশ গজ, অঙ্গুলস্ট প্রমান
মাথার উপর সুলতান আছে, ভ্রম করনা চৌহান”

পৃথ্বী হেসে উঠল। যন্ত্রনায় বিধস্ত মুখে তার দাঁতের সারি রোদের আলোয় ঝলসে উঠল। এবার আমার এটাই দেখার ছিল যে ছোট থেকে আমাদের প্রিয় খেলা আজ এই ম্লেছ ভূমিতে কেমন খেলা দেখায়?

আমি সম্রাট পৃথ্বীরাজ চৌহানের সভাকবি এবং বাল্যবন্ধু চাঁদ বারদাই ।  আমি তাঁর আত্মার সংগী। আমি দিল্লির অন্তিম হিন্দু সম্রাটের প্রায় প্রতিটা যুদ্ধ যাত্রায় তাঁর ছায়াসঙ্গী।

আমি পৃথ্বী র জীবন নিয়ে মহাকাব্য লিখছি । জানি শেষ করতে পারব না। কারন আজ কে র পর আমি জীবিত থাকব কিনা জানি না। যদি না পারি আমার উত্তরসূরি করবে।আমার কথায় , আমার লেখায় হিন্দু সম্রাট অমর হয়ে থাকবেন। আর থাকবে তারঁ অমর প্রেম কথা পৃথ্বীরাজ ও সংযুক্তা। আজ পৃথ্বী কে জিত তেই হবে।

জানি সে জিতবে। তাকে আমি বাল্যকাল থেকে দেখেছি। তাকে আমি হৃদয় দিয়ে চিনেছি। সে পারবে।

পৃথ্বী আর আমার জন্ম একদিন, এক সময়, এক তারিখ, সালে হয়ে ছিল। হয়ত পরমেস্বর সেই মুহূর্তের থেকেই আমার আর পৃথ্বী র জীবনকে এক বিনিসুতোর মালায় গেঁথে দিয়েছিলেন।আমি পৃথ্বী কে খুব নিকট থেকে দেখেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম পৃথ্বীর মত একজন শুর বীর রাজা এই ভারতের পবিত্র মাটিতে জন্মেছে তা পৃথিবীর মানুষ জানুক। তার নাম খ্যাত হোক বিশ্ব জুড়ে যে সে নেপলিয়ন , আলেকজান্ডারের থেকেও এক মহান বীর যোদ্ধা ছিলেন।

ক্রমশঃ

তথ্যঃ

Cynthia Talbot (2015). The Last Hindu Emperor: Prithviraj Cauhan and the Indian Past, 1200–2000