পাশের বাড়ির ছেলেটি ফেল করেছে শুনলে বাঙালী যতটা আনন্দিত হয় ততটা নিজের ছেলে পাশ করলেও হয় না। মদিনার ঘরে ঘরে তাই ঈদের আনন্দ আজ…।

এরকম বাঙালী কাম বাংলাদেশীদের ভারতীয় চন্দ্রযান ব্যর্থ হওয়ায় খুশি হয়ে উঠা, ফেইসবুকে বা নিউজ সাইটগুলোতে ট্রল করাটার একটাই অর্থ প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগলে জাতিগতভাবে যে খুশি হয়ে উঠার জিন নিয়ে বেড়ে উঠা এটা তারই প্রতিক্রিয়া। কিন্তু টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলা চলার সময় পশ্চিমবঙ্গের একটা ফুট ওভারব্রিজ ধসে গিযে অনেক মানুষ মারা যাবার ঘটনার পর বাংলাদেশী নিউজ সাইটগুলোর কমেন্টে ‘ঠিক হয়েছে. ‘উচিত হয়েছে’ ‘শিক্ষা হয়েছে’ বলা বাংলাদেশীদের রোষের কমেন্টগুলো যারা করেছে তাদের হিসাব মাথায় থাকলে নিছক বাঙালী পরশ্রীকাতরা বলে একে চালানো যায় না। ভারতের যে কোন খারাপ খবরে ‘ঈদের আনন্দ’ লাভ করে বাংলাদেশের মানুষ। কেন করে? হাজারটা কারণ থাকতে পারে। সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য ঘাটতি… এ পর্যন্ত ভারতের সীমান্ত রক্ষির গুলিতে কতজন বাংলাদেশী মারা গেছে? এটাই কি কারণ ভারত বিদ্বেষের? তাহলে ইজরাইল বাংলাদেশের কার পাকাধানে মই দিয়েছিলো? বাংলাদেশী পাসপোর্ট স্পষ্ট করে ইজরাইলের নাম লিখে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের কথা ভাবুন, মাত্র নয় মাসে যারা ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিলো, দুই লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছিলো, ১ কোটি মানুষকে পাশের দেশ ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য করেছিলো তাদের প্রতি কি একই রকম বিদ্বেষ কোনদিন বাংলাদেশে ছিলো? জাভেদ মিয়াদাদ শারজায় শেষ বলে ৬ মেরে জেতানোর ম্যাচে আমাদের পাড়ায় একমাত্র আমি ভারত সমর্থক ছিলাম! আমাদের পাড়াটা ছিলো আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলে খ্যাত। ১৬ ডিসেম্বর সেই এরশাদের আমলে ৭ মার্চের ভাষণ মাইকে, বাসাবাড়িতে টেপ রেকডারে নিজ উদ্যোগে মানুষ বাজাতো। এলাকার সব বড় ভাই ছিলো লীগের কট্টর সমর্থক নতুবা কর্মী। কিন্তু ইনারা সবাই ক্রিকেট খেলায় পাকিস্তানের পাগল! রাজাকার আবদুল মান্নানের ইনকিলাবের গ্রাহক। এসব কথা বলছি কারণ জেলা থানা পর্যায়ের একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক বা পার্টির কর্মীর কাছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কখনই স্পষ্ট ছিলো না। খোদ আওয়ামী লীগের কাছেই কি স্পষ্ট ছিলো কোনদিন? জাহানারা ইমাম যদি যুদ্ধাপরাধী আন্দোলন নিয়ে রাস্তায় না নামতেন তাহলে একটা প্রজন্ম দারুণভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা সম্পর্কে সজাগই হতে পারত না।

দেশভাগের পর যখন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানে রূপ নিয়েছিলো তখন এদেশের মানুষ দারুণভাবে ভারতকে ঘৃণা করত। ভারত আমাদের দখল করে নিবে, ভারতের স্পাইরা সবাই দেয়ালে কান পেতে আছে আমরা কি বলি শোনার জন্য… এরকমই ছিলো এদেশের মানুষের অবস্থান। সেই ভারত মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করে গোদের উপর বিষফোড়া হয়ে উঠল। এক গ্রুপ বাংলাদেশীদের কাছে তাই ভারতের কোন ক্ষমা নেই। আরেক দল ভারতের সমর্থনের জন্য ‘কৃতজ্ঞ’ তাই বলে ভারতের যে কোন জবরদখল দাদাগিরি বাংলাদেশ সহ্য করবে না বলে হুমকি দিয়ে রাখে। বলতে চাইছি ভারতের প্রতি মুসলমানদের সহজাত বিরাগ আছে দেশভাগ তথা দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে। মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই হিন্দু বাঙালী ছিলো। কারণ হিন্দু হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোন রেহাই ছিলো না। মুসলমানরা কিন্তু বাংলাদেশেই ছিলো। ধর্ষিত নারীদের বড় সংখ্যাটাও হিন্দু নারী। এখানে অন্য হিসেব কাজ করেছিলো। ‘গণিমতের মাল’ ঘোষণা করা হয়েছিলো কাফের হিন্দু নারীদের। বলছি না মুক্তিযুদ্ধে মুসলমানদের কোন ক্ষতি হয়নি। হয়েছে তবে সেটা তাদের আওয়ামী লীগ করার সন্দেহে। এসব কারণেই কি বাংলাদেশীরা দ্রুত পাকিস্তানের বর্বরতা ভুলে যেতে চেয়েছে?

যাক চন্দ্রযানের কথা শুরু করে কোথায় চলে এলাম…। ভারতের গুণমুগ্ধ হতেই হবে, তাদের সব সময় ভালোবাসতেই হবে এমন কোন কথা আমি কখনই আমার লেখায় বলি না। যদিও লোকজন সেভাবেই আমার বক্তব্যকে জেনারালাইজ করে ফেলেন। আমি যেটা বলতে চাই, ভারত এদেশে একটা ফ্যাক্ট। দ্বিজাতি তত্ত্ব বারবার ফিরে আসে ভারতকে কেন্দ্র করেই। এদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, মুসলিম জাতীয়তাবাদ বারবার ফিরে আসে ভারতকে কেন্দ্র করে। ভারত হচ্ছে একটা উছিলা। কারণ পাকিস্তান এতবড় অপরাধ করেও বাংলাদেশের পাসপোর্টে পাকিস্তান নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু ইজরাইলের কি দোষ? কতজন সীমান্তে মারা গেছে যে সেই শোক পাকিস্তানের হাতে জেনোসাইডের চেয়ে তীব্র হয়ে উঠল? এমন তো না দুই দেশের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। রোজ শত শত বাংলাদেশী চিকিৎসা করতে ভারত যাচ্ছে। ভ্রমণ ব্যবসা করতে ভারত গমণে বাংলাদেশীদের স্রোত দিনকে দিন বাড়ছে। এমনকি মুসলিম পীরের দরগা, মাজার গমণ করতে ধার্মীক বাংলাদেশীদের দলবদ্ধ হয়ে ভারতে যাওয়া নিয়মিত ব্যাপার। এরকম একটি প্রতিবেশী দেশের চন্দ্রযান ব্যর্থ হওয়ায় উল্লাসটা কি ধর্মনিরপেক্ষ?