(দ্বিতীয় কিস্তি) ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সুপারস্টার (২)
KANAN DEVI: THE FIRST SUPERSTAR OF INDIAN CINEMA
কানন দেবী লিখেছেন, ‘কে বাবা কে মা দিয়ে কী হবে! আমার কাননবালা পরিচয়ই যথেষ্ট’। এক সময় স্থান ছিল নিষিদ্ধ পাড়ায়, পরিচারিকার কাজও করেছেন জীবনে। 

তাঁর বাবার প্রকৃত পরিচয় জানেন না কেউ! কাননদেবীর শতবর্ষ স্মরণে সেই শিল্পীকে নিয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য যথার্থই লিখছেন, ‘কাননদেবীকে সুচিত্রা সেনের আগের জমানার ‘সুচিত্রা সেন’ বললে খুব একটা ভুল হয় না। সেই অপরূপ মুখশ্রী! মুহূর্তের পর মুহূর্ত আলো নেওয়া আর ক্যামেরার লেন্সে উদ্ভাসিত হয়ে থাকার ক্ষমতা! পরের পর ছবি হিট করানো, রুপোলি পর্দা ও পর্দার বাইরেও সমানভাবে নায়িকা থাকা, ইন্ডাস্ট্রির মাথাদের কব্জায় আনা, নিজেকে প্রায় একটা ব্র্যান্ডে গড়ে নেওয়া! এবং সর্বোপরি, কয়েক প্রজন্মের পুরুষের স্বপনচারিণী হয়ে ভেসে থাকা সুচিত্রার কেরিয়ারের নীল নকশাই যেন তৈরি করে গেছিলেন কানন দেবী। চাইলে সুচিত্রাকেও পরের যুগের কানন বললে সিনেমার মানহানি হয় না।’
বাংলা চলচ্চিত্রের এক মর্যাদাময় ব্যক্তিত্ব কানন দেবী। কাননবালা থেকে কাননদেবী। তখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের নিতান্তই শৈশব। কাননের জন্মের তিন বছর আগে সবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের পথচলা শুরু হয়েছে, ভারতীয় চলচ্চিত্রের পথিকৃত দাদা সাহেব ফালকের ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’-এর মুক্তির মধ্য দিয়ে ১৯১৩ সালে। কলকাতায় পার্শি ব্যবসায়ী জে.এফ. ম্যাডান গঠন করেছেন চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক প্রদর্শনের পথিকৃত প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাডান থিয়েটার’। এক সহৃদয় ব্যক্তির হাত ধরে ১০ বছরের কিশোরী কানন পা রাখলেন ম্যাডান থিয়েটারের স্টুডিওতে, সংস্পর্শে এলেন পরিচালক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেটা ১৯২৬ সালের কথা, তখনো চলচ্চিত্র শব্দহীন, নির্বাক যুগ চলছে। দশ বছরের কিশোরী কাননের প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত নির্বাক ছবি ‘জয়দেব’ এ ‘রাধা’ চরিত্রে। পারিশ্রমিক পেলেন পাঁচ টাকা। চলচ্চিত্রজীবনে কাননের প্রথম উপার্জন। এর পর ‘শঙ্করাচার্য’তে অভিনয় করলেন কানন, সেটিও নির্বাক ছবি। ১৯৩১ সালে বাংলা ছায়াছবি কথা বলতে শুরু করলো, ১৯৩১ সালের ১১ই এপ্রিল সবাক কাহিনিচিত্র অমর চৌধুরী পরিচালিত ‘জামাই ষষ্টি’ মুক্তি পেল। ঐ বছরেই কাননের প্রথম সবাক চিত্রে অভিনয় ম্যাডান থিয়েটারের ‘জোর বরাত’ ছবির নায়িকা চরিত্রে। মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩১ সালের ২৭শে জুন। এরপর ১৯৩৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শ্রী গৌরাঙ্গ’ চলচ্চিত্রে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ চরিত্রে অভিনয় ও গানে কানন শিল্পীর সম্মান ও প্রতিষ্ঠা পেলেন। ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ মুক্তি পাওয়ার পর কাননের গানের খ্যাতিও বিস্তৃত হলো, ডাক পেলেন গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে। কাননদেবী তার আত্মকথায় লিখেছেন ‘এই সময় স্টুডিও থেকে ক্রমশ গ্রামোফোন কোম্পানি অবধি কর্মক্ষেত্র প্রসারিত হোল…গান এসে আমার অভিনয়ের পাশে দাঁড়াতেই মনে হলো, আমার জীবনের এক পরম পাওয়ার সঙ্গে শুভদৃষ্টি ঘটল। … নিজেকে যেন নতুন করে চিনলাম” (‘সবারে আমি নমি’)।
তারপর কত ছবি, কত গান- কানন হয়ে উঠলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম সুপারস্টার, ‘মহা নায়িকা’। চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রের বাইরে গ্রামোফোন রেকর্ডে কানন দেবীর কণ্ঠের কিছু গান তো ‘লিজেন্ড’ হয়ে আছে শ্রোতাদের কাছে। ‘আমি বনফুল গো, ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে…’, ‘সাপুড়ে’ ছবিতে নজরুল ইসলামের সুরে ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’, ‘সাথী’ ছবিতে সায়গলের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে ‘বাবুল মোরা নৈহর ছুটল যায়’ এখনও তন্ময় সংগীতপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। কাননের আরো একটি গান ‘লিজেন্ডে’র মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৪৭ সালের অগস্ট মাসে লন্ডনের ‘ইন্ডিয়া হাউস’-এ তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে। ভি. কে. কৃষ্ণ মেনন তখন লন্ডনে ভারতের হাইকমিশনার। সেখানে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে কানন গেয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের যাত্রা হল শুরু, এখন ওগো কর্ণধার তোমারে করি নমস্কার’ গানটি।
১৯৩৬ সালে রবীন্দ্র-কাহিনী নয় এমন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্র সংগীতের প্রয়োগ করলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। ‘মুক্তি’ ছায়াছবিতে রবীন্দ্রনাথের অনুমোদন নিয়ে কানন দেবী গাইলেন ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’ এবং ‘আজ বিদায় বেলার মালাখানি’। এই সুবাদে কানন হয়ে গেলেন শান্তিনিকেতন ঘরানার বাইরে রবীন্দ্র-গানের প্রথম মহিলা-কণ্ঠ। তারপর অজস্র ছায়াছবি ও গ্রামফোন রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন কানন। সেকালে রবীন্দ্রনাথের গানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে পঙ্কজকুমার মল্লিকের মত কানন দেবীরও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। সংগীতপ্রধান ছবি ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৮)তে অভিনয় ও গায়িকা রূপে কানন খ্যাতির শিখর স্পর্শ করেছিলেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কানন না সংগীত শিল্পী কানন- কে বড় সে প্রশ্নের মীমাংসা হবার নয়। কাননের নিজের কথায় “আজ আমার অভিনেত্রী পরিচয়টাই সকলের কাছে বড়। কি আমার নিজের কাছে সবচেয়ে বেশি দামি আমার গানের মহল …” (‘সবারে আমি নমি’)। পণ্ডিত আল্লারাখার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। গান শিখেছেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, নজরুল ইসলাম ও পঙ্কজকুমার মল্লিকের কাছে। সাংবাদিক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য তাঁকে নিয়ে লিখেছেন, ‘কানন কিন্তু একাই এক নিখুঁত, অতুলনীয় প্যাকেজ। আর গান বলে গান! কার নয়? আর হায়, কী গান! কী বাংলায়, কী হিন্দিতে। রবীন্দ্রনাথ সিনেমায় তার গানের চিত্ররূপ অনুমোদন করলে সেই প্রথম গানটি ছিল কাননের ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতেহবে’। গান নিয়ে করা প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবি দুরন্ত হিট হওয়ার পর হিন্দুস্তান রেকর্ডজে কবিকে প্রথম দেখা কাননের। প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ আলাপ করাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‘এ হল কানন, তারকা অভিনেত্রী।’’ কানন প্রণাম করতে রবীন্দ্রনাথ ওঁর ঠোঁট ছুয়ে বলেছিলেন, ‘‘কী সুন্দর মুখ তোমার! গান করো?’’
(ক্রমশ)
Copy posted by Admin K C Chowdhury from Russia