সুমিত মিত্রের ‘হিন্দুত্ববাদীদের বিজ্ঞান গবেষণা’ (১৭ জানুয়ারি ২০১৫)
শীর্ষক নিবন্ধ প্রসঙ্গে এই চিঠি।

তিনি প্রাচীন ভারতের আবিষ্কারগুলির প্রতি
কটাক্ষ করতে গিয়ে প্রাচীন ভারতের গণিতের উল্লেখ করেছেন। দেশের বিজ্ঞান ও
গণিত চর্চার উজ্জ্বল ইতিহাস যদি স্বীকৃতি পায়, তাতে আনন্দ হওয়াটা
স্বাভাবিক। তবে সত্যের অপলাপ, উন্মাদনা ও আবেগ অবশ্যই দূরে রেখেপ্রকৃতপক্ষে ভারতীয় গণিত ও বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগের সন্ধানে আমাদের বৈদিক
যুগ (১৫০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) কেন, আরও পিছিয়ে যেতে হবে। সিন্ধু সভ্যতার
যুগের (২৫০০-১৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) নিদর্শনগুলিতে তার ছাপ স্পষ্ট, নানা
ট্যাবলেট থেকে ব্যাবিলনীয়দের পাটিগণিত বীজগণিতের কথা জানা যায়।
বিভিন্ন
প্যাপিরাসের মাধ্যমে (Rhind, Ahmes ইত্যাদি) সমসাময়িক মিশরীয়দের উন্নতির
কথা জানা যায়। কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় গণিতচর্চার তেমন কোনও প্রত্যক্ষ
প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইতিহাসের ধারা সংরক্ষণে ভারতীয়রা কখনওই সচেতন ছিল না।
পরবর্তী সময়েও ঐতিহাসিক প্রমাণ, অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও গবেষণাতেও ভারতবাসীর
আলস্য দেখা গেছে। বাখশালি পাণ্ডুলিপির (Bakshali Manuscript) কথা উল্লেখ
করা যেতে পারে (আনুমানিক ৭০০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ), যেটির যথাযথ মূল্যায়ন
বিদেশিদের হাতে হয়নি বলে মনে হয়। ১৮৮১ সালে আবিষ্কৃত পাণ্ডুলিপিটির (মূল
পাণ্ডুলিপিটি অক্সফোর্ডে রয়েছে) পাঠযোগ্য মাত্র ১৬টি পাতায় ত্রৈরাশিক,
প্রগতি, শ্রেণি, সমীকরণের আভাস পাওয়া যায় (সূত্র: ‘প্রাচীন ভারতে গণিত ও
বিজ্ঞান-চর্চা’ নলিনীকান্ত চক্রবর্তী)।নিবন্ধে বৌধায়ন শুল্বসূত্রের কথা বলা হয়েছে। শুধু সেখানেই নয়, আপস্তম্ব,
কাত্যায়ন শুল্বসূত্রেও বর্তমান পিথাগোরাসের উপপাদ্যের উদাহরণ ও প্রয়োগ
দেখা যায়। এই উপপাদ্যের অসংখ্য প্রমাণের (১৯৪০ পর্যন্ত ৩৭০টি) একটিও কি ওই
স্বর্ণযুগে ভাবতে পারেননি কেউ! যদি উপপাদ্যটির প্রমাণ না-ই হয়ে থাকে, সে
যুগে এরকম যুগান্তকারী ধারণার চর্চা ও প্রয়োগ কি কম বিস্ময়ের? তাছাড়া দশমিক
পদ্ধতিতে শূন্য (০) অন্তর্ভুক্তির লিখিত প্রমাণ ভারতীয়দের কাছে আছে বলে
মনে হয় না। তবে হারানো ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে যদি আর্যভট্ট, বরাহমিহির,
শ্রীধর, মহাবীর, শ্রীপতি, ভাস্করাচার্য, রামানুজনদের মনে পড়ে, তবে আশা করা
যায় ‘ভবিষ্যত্‌’ খুশিই হবেন। আর পাশ্চাত্য ইতিহাসের সবটাই কি কষ্টিপাথরে
যাচাই করা? স্বামী বিবেকানন্দও প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্য স্মরণ করিয়েছেন
বারবার। আমরা বাঙালিরা বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের কথাই মনে রাখি না।
রামানুজন, ভাস্করাচার্য, আর্যভট্টরা তো দূরের কথা।নিবন্ধকারের লেখায় ‘হিটলারের ভাবাদর্শ অনুসারী’- বীর সাভারকরের এরকম
বিশেষণ মানতে কষ্ট হচ্ছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের বহু নায়ক আজ বিস্মৃতপ্রায়।
স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে তাঁদের ভূমিকার প্রকৃত মূল্যায়ন কতটুকু হয়েছে জানি
না। মোদী বরং সেইসব বিস্মৃতপ্রায় নায়কদের স্মরণে আনতে চাইছেন। অন্যান্য ভাল
কাজের সঙ্গে তাঁর ওই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানানো উচিত।সোমনাথ দে, ডায়মন্ড হারবার, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা