বৈদিক সাহিত্যের আলোকে আর্য্যরা বহিরাগত কি না তার আলোচনা।

Spread the love

বৈদিক সাহিত্যের আলোকে আর্য্যরা বহিরাগত কি না তার আলোচনা
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ

বৈদিক সাহিত্যে কি লেখা আছে সেটা না জানলে আর্য রা কি বহিরাগত দুস্যু জাতি ছিলো, না  এই পুন্য ভুমি ভারতের ই ভুমিপুত্র তা জানা বা বোঝা যাবে না।

বৈবসত্ব মনুর কথা শ্রী কৃষ্ণ গীতায় অর্জুনকে বলেছেন।
“ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম।
বিবস্বান মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীত।।”——

এই শ্লোকটি বলার আগে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাছে বুদ্ধি যোগ এবং নিষ্কাম কর্ম যোগের কথা বিস্তারিত বলেছে।  তারপর বলছেন, ” আমি যে যোগ ধর্মের কথা তোমাকে বললাম, এই জ্ঞান নতুন নয়। এই জ্ঞান এবং ধর্ম আরো পুরাকাল থেকেই প্রচলিত। আদি পুরুষ এই জ্ঞান দিয়েছিলেন সমস্ত রাজাদের আদি রাজা বিবস্বান কে। বিবস্বান ব্রহ্মার পুত্র মরীচীর পুত্র । সৃষ্টির আদি থেকে আজ অবধি ৬ টি মন্বন্তর চলে গেছে,বর্তমানে ৭ ম মন্বন্তর চলছে। এক এক মন্বন্তরে এক এক মনু (মনু রাজাদের বলা হতো। সেই হিসাবে ৭ জন মনুর কথা আমরা শাস্ত্রে পাই) থাকতেন। বিবস্বান মনুর পুত্র বৈবসত্ব মনু, যার কথা শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন। এই বৈবসত্ব মনুর পুত্র ‘ইক্ষাকু’। ইক্ষাকু থেকেই সুর্য্য বংশের রাজারা এসেছেন। রামচন্দ্র সেই সুর্য্যবংশী ( বিবস্বান মনুর অপর নাম ছিলো সুর্য্য)। বৈবসত্ব মনুর অপর নাম  শ্রাদ্ধদেব মনু। (উপরের বংশ তালিকা দ্রষ্টব্য)।

আর একটি বংশ তালিকা দেখুন——

নীচের একটি ছবি দেখুন।

বৈবসত্ব মনুর বংশ থেকে এসেছেন পুররবা, আয়ুষ, নহুষ, যযাতি। যযাতির পাচ পুত্র– যদু, তুর্বসু,দ্রুহু, অনু, পুরু ।  এই পুরু কিন্তু আলেকজান্ডারের সময়কার পুরু নন। পৌরব বংশীয় সব রাজাদের নাম ই পুরু রাখা হতো। আলেকজান্ডারের সংগে যুদ্ধ করা পুরুর দুই পুত্রের নাম ও ছিলো পুরু এবং তারা দুজনেই সেই যুদ্ধে মারা যান। সেই বৈদিক পুরুর অনেক অধঃস্তন পুরুষ রাজা রন্তিনাভ। রাজা রন্তিনাভের এক পুত্র নাম ‘সুমতি’। সুমতির নাতি রাজা ‘দুস্মন্ত’। রাজা দুস্মন্ত এবং শকুন্তলার পুত্র ‘ভারত’। সেই নামে ভারতবর্ষ।

আমরা ঋকবেদেই পাই (৩ মন্ডলে) ভরত বংশীয় রাজা এবং বিশ্বামিত্রের নাম। তার রাজত্ব ছিলো সিন্দু নদীর এক নদী “রাভি’ তীরে (বর্তমান পাঞ্জাব অঞ্চল। আজ অনেক পন্ডিতই বলেন এই ভারতীয়রা (রাজা ভরতের বংশ ধরেরা) খ্রীষ্ট পুর্ব ২০০০ বছর (আজ থেকে ৪১১৭ বছর আগে) আগেই ঐ পাঞ্জাব অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। এই বংশ সুত্র ধরে একথা অনুমান করা যায় যে, যযাতির বংশ ধরেরাই উত্তর পশ্চিম অঞ্চল, আফগানিস্তান, সোয়াট, ব্যাক্ট্রিয়া,  মধ্য এশিয়া অঞ্চল শাসন করতেন।

কালের চক্রে এই যযাতির বংশ ধরেরা ছোট বড়ো নানা রাজ্যের রাজা হন। এক গোত্র বা এক বংশীয় হলেও নানা রাজনৈতিক কারনে এক সময় তারা একে অপরের সংগে মতান্তর এবং যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হয়ে পড়েন। রাজা দ্রহুর সময় রাজা ভরত এর সংগে অন্য দশজন রাজার এক প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। War of the 10 kings”  নামে এই যুদ্ধ পরিচিত।

যুদ্ধ মহাভারতের যুদ্ধ নয়। এটা ঘটেছিলো কমপক্ষে ৬০০০ -৮০০০ হাজার বছর আগে। সেই সময় বৈদিক সভ্যতা আর হিন্দুকুশের উত্তর এবং উত্তর পশ্চিমে সীমাবদ্ধ ছিলো না। ভারতবর্ষের পুর্ব দিকে , সিন্ধুর অববাহিকা ছাড়িয়ে সেই সভ্যতা সরস্বতী নদীর অববাহিকা অঞ্চলে প্রসার লাভ করে।

ঋক বেদের ৭ম মন্ডলে পাই,  রাজা ভারতের সংগে আশ পাশের ১০ জন রাজার যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ভরত জয় লাভ করেন।  এই যুদ্ধ জয়ের ফলে রাজা ভারত প্রায় সমগ্র  উত্তর পশ্চিম অঞ্চল ( ভারতবর্ষের) নিজের রাজ্য ভুক্ত করেন। পরে কুরুক্ষেত্র অঞ্চলে তার বংশ ধরেরা বসবাস করতে শুরু করে। রাজা ভারতের বংশ পরবর্তিতে পৌরবদের (পুরু বংশের) সংগে রাজনৈতিক ভাবে সম্পৃক্ত বা যুক্ত হয়ে সমগ্র ভারতবর্ষ শাসন করে।
উপরে যে বংশ তালিকা আছে, সেটা শুধুমাত্র ঋক বেদে আছে তাই নয়, ১২০ খানা পুরানে, রামায়নে ,মহাভারতে অনেক স্থানে লেখা আছে। এই গুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করলেই সব পাবেন । তাহলে সেই বংশ তালিকা হিসাবে দেখলে, ভারতের বৈদিক সভ্যতা কবে থেকে শুরু হয়???? কে তার হিসাব করবে??? ৩০০০ বছর ? ৪০০০ – ৫০০০ হাজার বছর ?? ৫০০০-৮০০০ বছর???? না তারো আগে ?????? মিশরের পিরামিডে সবচেয়ে যেটা বড়ো এবংবর্তমানে অনুমান করা হচ্ছে সেই পিরামিড প্রায় ১০০০০ বছর আগের শেষ তুষার যুগের পরে এবং মহাপ্লাবনের পরে বানানো। সেই পিরামিডে এক স্তম্ভে গীতার একটি বানী খোদাই করা আছে।

• An Egyptian Pyramid, dated 3000 BCE, has the following verse from the Bhagavad Geeta:
vasanvsi jeernani yatha vihaya, navani
ghrunnati naro parani
– Nava Bharat Times, 18-4-1967 [6] —- ( এর সত্য মিথ্যা আমার দ্বায় নয়) এই  বক্তব্য মানলেও গীতা ৫০১৭ বছর আগে হয়। তা গীতা রচনা হয়েই তো মিশরে চলে যায়নি। তাহলে এগুলি কি। ভাববার কিছুই কি নেই????????

বর্তমান আফগানিস্তানের হীরাট প্রদেশের ‘হরি নদীর অববাহিকা অঞ্চল বৈদিক যুগে নাম ছিলো “কেকয় রাজ্য”। কেকয় থেকে রাজা দশরথ তার  (রঘুপুত্র= রঘুবংশ) মধ্যমা স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন। দশরথের রাজ্য সেই সময়ই বর্তমান উত্তর প্রদেশ অবধি বিসতৃত ছিলো। সেই অঞ্চলের কোশল থেকে এসেছিলেন শ্রী রামের মাতা কৌশল্যা। আমরা জানি, রাজা কনিষ্কের দুটো  রাজধানী ছিলো। তাহলে রাজা দশরথের দুটো রাজধানী,একটি উওরাপথ অঞ্চলে একটি গাংগেয় অঞ্চলে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো দুই স্ত্রী দুই অঞ্চলের থেকে আসা বলেই ক্ষমতার দন্ধ হয়েছিলো। রামচন্দ্র চলে যান দক্ষিনে আর ভরত এবং তার দুই পুত্র ( তক্ষক এবং পুষ্কল)  উত্তরাপথ অঞ্চলে রাজত্ব করেন। তক্ষশীলা, পুষ্কলাবতী, তাসখন্দ এই বিসতৃত অঞ্চল রাজা তক্ষক এবং রাজা পুষ্কলের অধীনে ছিলো। তক্ষক নামের অপভ্রংশ আজ হয়ে গেছে ‘তক্ষক খন্ড= তাসখন্দ’ এবং তক্ষক থেকে তুকারা জাতি= তুর্কি , যারা আরবীদের দাস হিসাবে ভারতে এসে দাস বংশ (সুলতানী আমলে} প্রতিষ্ঠা করে। কুতুবুদ্দিন সেই প্রথম তুর্কি দাস।
 

আর একটি ম্যাপটি দেখুন। হলুদ মার্ক করা অঞ্চল গুলি থেকে বৈদিক সভ্যতার উদ্ভব স্থল এবং সবুজ রঙ্গয়ের অঞ্চল গুলিও এই বৈদিক সভ্যতার দেশ।

রামায়নের যুগ ছেড়ে আসি মহাভারতের যুগে। সেখানেও দেখি মহারানী কুন্তীর পাঁচ বোনের বিয়ে হয়েছিলো পাঁচ কেকয় রাজপুত্রের সংগে। তারা যুদ্ধ করেছিলেন পান্ডবদের পক্ষে। প্রায় এক অক্ষৌইনী সৈন্য নিয়ে কেকয় রাজপুত্ররা অর্জুনের রথের দুই পাশ রক্ষা করেছিলেন (মহাভারত পড়ুন)। গান্ধারীকে তো পাচ্ছি কৌরব দেরর মাতা হিসাবে। তক্ষশীলাকে রাজধানী করে গান্ধার রাজ্যের বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রাচীন গান্ধার সংষ্কৃতির সংগ্রহশালা (মিউজিয়াম) তো পাকিস্তানে আছে।

তাহলে, ঋক বেদ, রামায়ন , মহাভারত এবং পুরান (ইতিহাস) যদি আমরা বিশ্বাস করি তাহলে সেই সব পুস্তকে যা আছে তা বিশ্বাস করতে হয়।  তর্ক,অবিশ্বাস তো চলছেই। শ্রী রামচন্দ্র, শ্রী কৃষ্ণ কে নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ কেউ এদের অস্তিত্বকেই উড়িয়ে দেন। বিশেষ করে বামপন্থী এবং যারা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন না বা হিন্দুদের গালাগাল দেওয়া যাদের একমাত্র কর্তব্য এবং বুদ্ধিজীবী হিসাবে প্রচার পেতে মরিয়া তারা অবশ্যই বলবেন “গাজাখুরী গল্প”। বিশ্বাস, আজো ভারতে অনেক মানুষ আছেন যারা বেদ, রামায়ন ,মহাভারত এবং বৈদিক ইতিহাস বিশ্বাস করেন। তারা নিশ্চয়ই বুঝবেন “ভারতের হিন্দুদের ভুল এবং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলা হয়েছে এবং হচ্ছে।