জয়দেব শীল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র ভয়েজ অব আমেরিকার ফেইসবুক পেইজে একটি কমেন্টে লিখেছিলো, ‘পৃথিবীর সকল মুসলমান সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করে, যা হযরত মুহাম্মদ (স) শিখিয়েছেন’। এই মন্তব্য করায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তার সহপাঠীদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লেগেছে। জয়দেবের বিরুদ্ধে তারা মানববন্ধন করেছে। তার নামে মামলা করেছে কুখ্যাত আইসিটি আইনে। অথচ জাকির নায়েক বরাবরই বলে এসেছেন, একজন প্রকৃত মুসলমানকে অবশ্যই সন্ত্রাসী হতে হবে। ২০০৬ সালে একটা ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যায় যেখানে জাকির নায়েককে বিন লাদেন সম্পর্কে এক তরুণ প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি জানিনা তিনি (লাদেন) কী করছেন৷ আমি তাঁর সংস্পর্শে নেই৷ ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে চিনি না৷ আমি শুধু খবরের কাগজ পড়ি৷ তিনি যদি সন্ত্রাসীদের সন্ত্রস্ত করেন, তিনি যদি সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী অ্যামেরিকাকে সন্ত্রস্ত করে থাকেন, আমি তার পক্ষে আছি৷ প্রত্যেক মুসলমানেরই সন্ত্রাসী হওয়া উচিত৷ ব্যাপারটা হলো, তিনি (লাদেন) যদি সন্ত্রাসীদের মনে ত্রাস ছড়িয়ে থাকেন, তিনি তাহলে ইসলামই অনুসরণ করছেন’।

বিন লাদেনের মত একটা জঙ্গি গডফাদারকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে, সমস্ত মুসলামনকে সন্ত্রাসী হতে বলেও জাকির নায়েক মুসলমানদের কাছে হিরো হয়ে থাকেন! রাজ্জ্বাক বিন ইউসুফ, তারিক মুনায়েরসহ শত শত মুফতি জিহাদের জন্য অস্ত্র হাতে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ওয়াজ করার পর যদি কেউ বলে মুসলমানরা সব সন্ত্রাসী আর এটা এসেছে তাদের নবীর কাছ থেকে- তাহলে মিথ্যেটা সে কোথায় বলল? কুরআনে জিহাদ কতলের আয়াত ৪৫০টি! ইসলামের চার ইমাম ও মাহযাব প্রত্যেকে একমত ইসলামে তলোয়ারের মাধ্যমে কাফরদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে আল্লার আইন কায়েম করতে হবে। এ হচ্ছে কুরআন ও সুন্নার কথা। তাহলে মুসলমানদের, অন্তত একজন গোড়া মুসলমানের সন্ত্রাসী হবার চান্স ৯৯ ভাগ। আর এগুলো সে করবে তার নবীর আদর্শকে মান্য করে। তাহলে জয়দেব শীল মিথ্যে বলেছে কোথায়?

খেয়াল করুন, কয়েক লক্ষ্য ওয়াজের ভিডিও ইউটিউব-ফেইসবুকে আছে যেখানে মাওলানা মুফতিরা অন্য ধর্মের দেবতা ঈশ্বরকে নিয়ে নোংরা ভাষায় কথা বলেছে, যেখানে মুসলমানদের অবিশ্বাসীদের ঘৃণা করতে বলছে, অমুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করছে, অমুসলিমদের নেতা বানাতে নিষেধ করছে, কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করে ইসলাম কায়েম করতে বলছে- তাদের বিরুদ্ধে কেউ ধর্মানুভূতিতে আঘাতের দাবী করে মামলা করেনি। কোন ধর্ম বিশ্বাসী মুসলমান এইসব মুফতি শায়খদের সন্ত্রাসী বলেনি। যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জয়দেব শীলকে আজ ইসলাম নিয়ে কটুক্তির অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলো, দেখা যাবে তার সহপাঠীদের ফেইসবুকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে অন্য ধর্ম সম্প্রদায় নিয়ে কটুক্তি করার মত পোস্টের অভাব নেই। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কেউ মানববন্ধন করেনি। তাদের কারোর ছাত্রত্ব বাতিল হয়নি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবীর চৌধুরী বলেন, `অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা খুবই নিন্দনীয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ঘটনার কোনো ক্ষমা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আপাতত অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করার পাশাপাশি তদন্ত কমিটির রিপোর্টের প্রেক্ষিতে পরবর্তী সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে’।

তার মানে জয়দেব শীলের আগে বাংলাদেশে ওয়াজ মাহফিলে, মসজিদে, ইসলামিক জলসায় যা চলেছে তার সবটাই ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে’ চলতে পারে! কিন্তু জয়দেবের কোন ক্ষমা নেই! কারণ জয়দেব হিন্দু। এদেশটা মুসলমানদের। এদেশে ধর্ম হিসেবে একমাত্র ইসলামকে ধরা হয়। ইংরেজ আমলে হিন্দুরা সর্ব সাধারণের জন্য ইংরেজি স্কুল না খুললে মুসলমানরা এখনো অশিক্ষিত থেকে যেতো। কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরীদের প্রজন্ম ছিলো প্রথম শিক্ষিত বাঙালী মুসলমান প্রজন্ম। কিন্তু দু:খজনক হলো, ৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন পূর্ববঙ্গ নিরঙ্কশভাবে ‘মুসলিম’ হয়ে উঠল তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই শিক্ষিত মুসলমানদের হাতেই মাদ্রাসা হয়ে উঠেছে…। একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসলামের পক্ষ নিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, কুখ্যাত আইসিটি আইনের দাড়স্ত হওয়া প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার চিহ্ন বহন করে না সত্য, কিন্তু ‘বিশ্বমাদ্রাসা’ চরিত্রের সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়!