সম্প্রতি রাহুল গান্ধী সাভারকার সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করেছেন। এই গণ্ডমূর্খ রাজনীতিবীদ মূলত ইতর-বাটপাড় কমিউনিস্টদের শেখানো বুলি আওড়িয়েছন। নেপথ্যে পেট্রোডলার।
————————————————

বিনায়ক দামোদর সাভারকর তার নিজের সময়ে জাতীয়তাবাদী মানসিকতার বহু নেতাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। নেতাদের মধ্যে ভারতীয় কমিউনিস্টদের আদিপুরুষ এম এন রায়, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, এস এ ডাঙ্গে প্রমুখও ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর নব্য কমিউনিস্ট নেতারা পূর্বসূরিদের দৃষ্টিভঙ্গি বাতিল করে সাভারকরের ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে সচেষ্ট হন।
আজ একথা সবাই জানেন, সাভারকরের বিরুদ্ধে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ হলো, তিনি আন্দামানের সেলুলার জেলে থাকার সময় ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে মুক্তিলাভ করেছিলেন। জরুরি অবস্থার সময় এই নিয়ে প্রথম বিতর্ক সৃষ্টি হয়। 
সে সময়, জরুরি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদী শক্তির পায়ের নীচের জমি শক্ত হচ্ছিল। কোণঠাসা বামপন্থীরা সেই কারণে সাভারকরকে সফট টার্গেট বানিয়ে ফেললেন এবং তিনিই ‘হিন্দুত্ববাদ’ নামক বিষবৃক্ষের গোড়া বলে প্রচার শুরু করলেন। যার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ল ‘নিত্যনতুন তথ্যানুসন্ধানের’। সাভারকরের জীবনের প্রকৃত সত্য ও তার সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ধারণা পাল্টে ফেলার জন্য তৈরি করা হলো কৃত্রিম ইতিহাস।
শুনতে খুবই আশ্চর্য লাগবে, ভারতীয় কমিউনিস্টদের প্রথম যুগের নেতারা এম এন রায়, ই এস এম নাম্বুদ্রিপাদ প্রমুখ— যারা সাভারকরের সমসাময়িক ছিলেন তারা তাঁকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। হিন্দুত্বের প্রতি এইসব কমিউনিস্ট নেতার চিরাচরিত বিরূপ মনোভাব তাদের শ্রদ্ধার পথে অন্তরায় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কমিউনিস্টরা তাদের রাজনৈতিক বাবুদের তৈরি করে দেওয়া নকশা অনুযায়ী সাভারকরকে জনমানসে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নানারকম মনগড়া তত্ত্ব সাজিয়ে খিচুড়ি ইতিহাস রচনা করার কাজে আদাজল খেয়ে লেগে পড়েছিলেন।
সাভারকর সম্পর্কিত নব্য-বাম প্রোপাগান্ডা এবং সাভারকরের জীবন ও জীবনকালের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত সত্য ঘটনাবলী নিয়ে বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এইসব গ্রন্থ মোটেই দুপ্রাপ্য নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, নব্য-বাম লেখকদের উত্থাপিত সাভারকর-সম্পর্কিত ‘নতুন’ তথ্যাবলী কি সত্যিই নতুন ? যদি সত্যিই নতুন হয় তাহলে আমাদের আর একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। সাভারকরের সমসময়িক বাম নেতারা কেন এসব কথা বললেন না? তারা অকপটে স্বীকার করেছেন – সাভারকর ছিলেন অকুতোভয় দেশপ্রেমিক, প্রচণ্ড সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এবং অসমসাহসী এক যোদ্ধা।
জরুরি অবস্থার সময় নব্য বামেরা ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণ লোপাট করে তাদের মিথ্যে প্রোপাগান্ডাকে প্রমাণ করার জন্য, মহাত্মা গান্ধীকে সাভারকরের কট্টর সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া সাভারকরের তথাকথিত মুচলেকা ছিল সেইসময় একটি রাজনৈতিক কৌশল। এই কৌশল অবলম্বন করার জন্যই পরবর্তীকালে সাভারকর তার বৈপ্লবিক কাজকর্ম এগিয়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হন। 
বামেদের অভিযোগ, সাভারকরের মুচলেকা দেবার কথা তার সমসাময়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা কেউ জানতেন না। এবং এভাবে মুচলেকা দিয়ে কারামুক্তির আবেদন করা ছিল সে সময় চুড়ান্ত ব্যতিক্রমী। বলা বাহুল্য,মহাত্মা গান্ধীর লেখা পত্রে এর বিপরীত তথ্য মেলে।
সাভারকরকে কট্টর গান্ধী-বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও, গান্ধী সাভারকর সম্বন্ধে কী ভাবতেন বা কী লিখেছেন— সে ব্যাপারে বাম লেখকেরা কখনও আলোকপাত করেননি। যদিও আদি যুগের ভারতীয় কমিউনিস্ট এম. এন. রায়, নাম্বুদ্রিপাদ, ডাঙ্গে প্রমুখের সাভারকর-সম্পর্কিত মতামত এবং লেখালেখি প্রকাশিত হবার পর নব্য-বাম প্রোপাগান্ডা ইতোমধ্যেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে আশ্রয় নিয়েছে। তবুও, মহাত্মা গান্ধীর এযাবৎ চেপে রাখা রচনা থেকে আমরা সাভারকর সম্পর্কে তার ধারণা আরও স্পষ্টভাবে পেতে পারি।
সাভারকরের আত্মজীবনী এবং আত্মজীবনীমূলক লেখা থেকে বোঝা যায় তার জীবন ছিল দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত এবং বীরত্বব্যঞ্জক। এ এমন এক জীবন, যার গভীরতা মাপার সাহস কমিউনিস্টদের হবে না। এমন একটি জীবন যাপন করা তো অনেক দূরের ব্যাপার – সাভারকরের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড সামগ্রিক ভাবে ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি উৎসর্গীকৃত। 
দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার প্রশ্নে সমমনস্ক না হলেও মহাত্মা গান্ধী সাভারকর ভাইদের (বিনায়ক দামোদর ও গণেশ দামোদর সাভারকর) সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। এই সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। আপাতদৃষ্টিতে জটিল, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব ছিল না। শত খণ্ডে প্রকাশিত মহাত্মা গান্ধী রচনাসমগ্রে এই তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যাবে।
দেশে দীর্ঘদিন কংগ্রেসি শাসন বহাল থাকার রাজনৈতিক লাভ ঘরে তোলার জন্য, বাম ঐতিহাসিকেরা বীর সাভারকরের দেশপ্রেমিক ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার অপপ্রয়াস শুরু করেন। এ কাজে তারা হাতিয়ার করেন সাভারকরের তথাকথিত মুচলেকা দেবার ঘটনাটিকে। 
এ ব্যাপারে মহাত্মা গান্ধীর ব্যাখ্যা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। গান্ধীজী লিখেছেন, সেই সময় সব রাজনৈতিক বন্দিকে মুচলেকা দিয়ে কারামুক্তির সুযোগ দেওয়া হলেও সাভারকর ভাইদের দেওয়া হয়নি।গান্ধীজীর এই বক্তব্য প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে মাইলফলক স্বরূপ। 
মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে সাভারকর বিরূপ মনোভাবাপন্ন হলেও, তাঁর সম্বন্ধে গান্ধীজীর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গীটি বুঝে নেওয়া দরকার।
গান্ধীজী লিখছেন: 
‘ভারত সরকার এবং প্রাদেশিক সরকারগুলিকে ধন্যবাদ। কারণ এখন যারা রাজনৈতিক কারণে কারান্তরালে দিনাতিপাত করছেন, তাদের প্রায় সকলকে মুচলেকা প্রদান করে কারামুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েকজন বিখ্যাত রাজনৈতিক বন্দি এখনও মুক্তি পাননি। তাদের মধ্যে আমি সাভারকর ভাইদের কথা বিশেষ করে বলতে চাই। আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, পঞ্জাবে যেসব রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি পেয়েছেন তাদের সঙ্গে সাভারকর ভাইদের কোনও পার্থক্য নেই। অথচ সরকারি ঘোষণার পর পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও সাভারকর ভাইয়েরা এখনও মুক্তি পাননি।’ 
গান্ধীজীর ‘সাভারকর ব্রাদার্স’ – শিরোনামাঙ্কিত একটি প্রবন্ধে রয়েছে এসব কথা। প্রবন্ধটি ২৬.৫.১৯২০ তারিখে ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। (দি কমপ্লিট ওয়ার্কস অব মহাত্মা গান্ধী; খণ্ড ২০. ৩৬৮ পৃ.)।
শর্তসাপেক্ষে শাস্তি রদ করার জন্য আবেদন করা সে সময় রাজনৈতিক বন্দিদের ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাপার বলে বিবেচিত হতো। গান্ধীজীর রচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি সাভারকর ভাইদের শাস্তি রদ করার আবেদন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। 
আগেই বলেছি, সে সময় এই ঘটনা ছিল বহুল প্রচলিত এবং সব রাজনৈতিক বন্দি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বার্থে সাভারকর ভাইয়েরাও শাস্তি রদের আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীকালে নব্য-বামেরা এই ঘটনাকে ক্ষমার অযোগ্য এবং ‘অভূতপূর্ব’ বলে চিহ্নিত করে।
উল্লেখিত প্রবন্ধটিতে গান্ধীজী গণেশ দামোদর সাভারকরের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেছেন। 
তিনি লিখেছেন: 
‘শ্রীগণেশ দামোদর, সাভারকর ভাইদের মধ্যে বড়ো। ওর জন্ম ১৮৭৯ সালে। অতি সাধারণ মানের শিক্ষা লাভ করার পর তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯০৮ সালে মহারাষ্ট্রের নাসিকে সংঘটিত স্বদেশি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বদেশি আন্দোলন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। ৯.৬.১৯০৯ তারিখে ১২১, ১২১ক, ১২৪ক। এবং ১৫৩ক ধারায় গণেশ দামোদর সাভারকরের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের শাস্তি ঘোষিত হয়। এখনও তিনি আন্দামানেই আছেন। এগারো বছর ধরে শাস্তিভোগ করছেন। আইনের ১২১ ধারা খুবই বিখ্যাত। পাঞ্জাবের বন্দিদের ক্ষেত্রে এই ধারা প্রয়োগ করতে হয়েছিল। রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগ থাকলে এই ধারা প্রয়োগ করা হয়। সর্বনিম্ন শাক্তি সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। দেশদ্রোহিতার অভিযোগ থাকলে ১২৪ক ধারা প্রয়োগ করা হয়। মৌখিক ভাবে বা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখালেখির মাধ্যমে (বা অন্য কোনও ভাবে) সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করার অভিযোগ থাকলে ১৫৩ক ধারা প্রয়োগ করা হয়। সুতরাং এটা স্পষ্ট, যেসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে সেগুলির প্রকৃতি বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে দেশকল্যাণমূলক। তিনি কোনও অন্যায় করেননি। গণেশ দামোদর সাভারকর বিবাহিত। তার দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। যদিও আজ আর তারা কেউ ইহজগতে নেই। তার স্ত্রীও আঠারো মাস আগে পরলোকগমন করেছেন।’
গণেশ দামোদর সাভারকর সম্বন্ধে বলার পর গান্ধীজী বীর সাভারকর সম্বন্ধেও তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন: 
‘গণেশ দামোদর সাভারকরের ছোটো ভাইয়ের (বীর সাভারকর) জন্ম ১৮৮৪ সালে। তিনি পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। পুলিশি হেফাজত থেকে তার পালানোর প্রয়াস এবং ফ্রান্সের উপকূলবর্তী সমুদ্র সাঁতরে পার হবার অসম-সাহসী প্রয়াসের কারণে সাধারণ মানুষ এখনও তাকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। পুনের ফাগুসন কলেজ থেকে পাশ করে বিনায়ক দামোদর সাভারকর লন্ডনে গিয়ে ব্যারিস্টার হন। ১৮৫৭ সালে সংঘটিত মহাসংগ্রামের প্রথম বিধিবদ্ধ ইতিহাস রচনা তার অনন্য কীর্তি। ১৯১০ সালে ব্রিটিশ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ওই বছরেরই ২৪ ডিসেম্বর বড় ভাই গণেশ দামোদর সাভারকরের মতো তাকেও যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের শাস্তি দেওয়া হয়। পরে, ১৯১১ সালে তার বিরুদ্ধে আনা হয় হত্যার অভিযোগ। যদিও সেই অভিযোগ ব্রিটিশ পুলিশ আদালতে প্রমাণ করতে পারেনি। বিনায়ক দামোদর সাভারকর বিবাহিত। ১৯০৯ সালে একটি পুত্রসন্তানের বাবা হয়েছেন। তার স্ত্রীও জীবিত রয়েছেন।’
গান্ধীজী আরও লিখেছেন: 
‘সাভারকর ভাইয়েরা তাদের রাজনৈতিক মতামত খোলাখুলি ব্যক্ত করেছেন। জানিয়েছেন, তারা কোনওরকম হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস করেন না। সুতরাং যদি তাদের শাস্তি রদ করা হয় তাহলে তারা ভারত শাসন আইন, ১৯১৯ মেনে চলবেন। তারা মনে করেন কোনও মানুষের পূর্ণ সংস্কার হলে তার পক্ষে দেশের আইন মেনে জীবনযাপন করা কঠিন নয়। এমনকী দেশের আইন দেশের প্রতি রাজনৈতিক কর্তব্য পালন করাও সম্ভব। শাস্তি মওকুফ করার আবেদনপত্রে সাভারকর ভাইয়েরা ঠিক কী কারণ দেখিয়েছিলেন, গান্ধীজীর চিঠিতে সে কথা জানার পর বামেদের মিথ্যাচার সম্পূর্ণ ধরা পড়ে গেছে। বাম লেখকেরা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, সাভারকর ভাইয়েরা কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে রেহাই পান। কিন্তু গান্ধীজীর চিঠিতে দেখা যাচ্ছে শাস্তি মওকুফের আবেদন পত্রে সাভারকর ভাইয়েরা কী লিখেছেন, সে সম্বন্ধে তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি সাভারকর ভাইদের ভারতের বিশ্বস্ত এবং বীর সন্তান বলে উল্লেখ করেন। তার বিবেচনায় সাভারকর ভাইয়েরা, বিশেষ করে বিনায়ক দামোদর সাভারকর ছিলেন সুচতুর এবং অতুলনীয় বুদ্ধিমান। সেই সময় ব্রিটিশ সরকার দেশব্যাপী রাজনৈতিক বন্দিদের যে সুবিধা প্রদান করেছিল, সাভারকর ভাইয়েরা সেই সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন মাত্র।’
গান্ধীজী লিখেছেন: 
‘উপরন্তু আমার মনে হয়, চরমপন্থী রাজনীতিতে মানুষের আস্থা এই মুহূর্তে ঠিক ততটা নেই। ওদিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভাইসরয়কে শর্তসাপেক্ষে সব রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেবার নির্দেশ দিয়েছে। এই অবস্থায় সাভারকর ভাইদের আটকে রাখা হলে তা সাধারণ ভারতীয়দের উম্মার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাতে সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়াও অসম্ভব নয়।’
‘যেহেতু সাভারকর ভাইয়েরা ইতিমধ্যেই দীর্ঘসময় জেলে কাটিয়েছে’, ওদের স্বাস্থ্য দৃষ্টিকটুভাবে ভেঙে পড়েছে—সুতরাং পুরো বিষয়টি অন্যভাবে দেখা দরকার। তাছাড়া, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, তাও ওরা ব্যক্ত করেছেন। এরপরও যদি ওদের মুক্তি দেওয়া না হয় তা হলে তা রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ফলত ভাইসরয় ওদের মুক্তি দিতে বাধ্য। বিষয়টা ভাইসরয়ের এক্তিয়ারের মধ্যেও পড়ে। বিচারক যেমন তার নিজস্ব এক্তিয়ার বলে দুই ভাইকে শাস্তি দিয়েছিলেন ভাইসরয় তার নিজের এক্তিয়ার বলে তাদের মুক্তি দিতে পারেন। ভাইসরয় যদি তা না করতে চান, তাহলে তাকে জানাতে হবে কেন তিনি সাভারকর ভাইদের মুক্তি দিতে অপারগ।’
গান্ধীজী লিখেছেন: 
‘সাভারকর ভাইদের মামলাটি পাঞ্জাবের ভাই পরমানন্দের মামলার থেকে ভালোও নয় খারাপও নয়। এ ব্যাপারে আমি পাঞ্জাব সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই। কারণ সরকারের জন্যই ভাই পরমানন্দ দীর্ঘদিন জেলবন্দি থাকার পর অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন। আবার ভাই পরমানন্দ নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে দাবি করে শাস্তি লাঘবের আবেদন করেছেন, তার জন্য সাভারকর ভাইদের মামলাটিকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজনও এখানে নেই। কারণ একবার কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে সরকারের চোখে সব ব্যক্তিই সমান। এবং গণমুক্তির সুযোগ শুধু সন্দেহজনক বন্দিদের জন্য নয়, সব বন্দিদের জন্যেই। শর্ত এটাই হওয়া উচিত সব বন্দি যেন রাজনৈতিক বন্দি হন। এবং ভাইসরয় যা বলেছেন, তার সঙ্গে একমত হয়ে আমিও বলতে চাই, এই ঢালাও বন্দি মুক্তি যেন মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে না দাঁড়ায়। একথা অনস্বীকার্য, সাভারকর ভাইয়েরা রাজনৈতিক অপরাধী। ওদের মুক্তি দিলে গণনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবারও কোনও আশঙ্কা নেই। ভাইসরিগ্যাল কাউন্সিলে উত্থাপিত একটি প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়েছে, সাভারকর ভাইদের মুক্তির বিষয়টি কাউন্সিলের বিবেচনাধীন। অথচ বম্বে প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে। সাভারকর পরিবারকে জানানো হয়েছে এ ব্যাপারে তারা কিছু জানেন না।’
‘ওদিকে ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সে মি. মন্টেগুও বিবৃতি দিয়েছেন, ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী না কি সাভারকর ভাইদের মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয় ! এই বিষয়টিকে এত সহজে ঝেড়ে ফেলা যাবে । সরকারের সার্বিক বন্দিমুক্তির ঘোষণার পরেও কোন যুক্তিতে সাভারকর ভাইদের কারান্তরালে রাখা হচ্ছে, সে কথা জানতে চাওয়ার অধিকার ভারতের মানুষের আছে।’
ব্রিটিশ সরকারের প্রতি উষ্ম প্রকাশ করে প্রবন্ধ শেষ করেছেন গান্ধী।
গান্ধীর রচনাসমগ্রের ২৩ তম খণ্ডে (পৃ. ১৫৬) আমরা আরও একটা রচনা পেয়েছি, যার শিরোনাম হরনিম্যান (বি. জি. হরনিম্যান। বম্বে ক্রনিক্যালের সম্পাদক। ভারতবন্ধু ভূমিকার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে এবং শাস্তি স্বরূপ ইংলন্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়– স্ব. স.) অ্যান্ড কোম্পানি। 
লেখাটি শুরু হয়েছে গান্ধীর ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্য দিয়ে।তিনি স্বীকার করেছেন, সাভারকর ভাইদের নিয়ে বিশেষ কিছু না লেখার জন্য অনেকেই তাকে দোষারোপ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই উঠে এসেছে বি.জি. হরনিম্যানের প্রসঙ্গটি। 
গান্ধী লিখেছেন, “মি. হরনিম্যান সম্বন্ধে আমার উদাসীনতার জন্য বন্ধুরা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। কেউ কেউ আবার জানতে চায়, সাভারকর ভাইদের নিয়ে কেন আমি নিয়মিত লিখি না? আমি যদি হরনিম্যানের কথা উল্লেখ করি, কিংবা সাভারকর ভাইদের কথা—তাহলে তা অবশ্যই সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য করব না। বরং, অসহযোগ আন্দোলনকে আরও উজ্জীবিত করার জন্যই করব। মি. হরনিম্যান আগে যেমন ছিলেন— একজন সক্রিয় এবং সাহসী কমরেড— ঠিক সেভাবেই যদি ফিরে আসেন আমি অত্যন্ত আনন্দিত হব। আমি জানি তাকে অন্যায় ভাবে দেশ থেকে তাড়ানো হয়েছিল।’
‘সাভারকর ভাইদের প্রসঙ্গে বলি, ওদের প্রতিভা দেশের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত। দেশ যদি জেগে না ওঠে তাহলে আমরা খুব শীঘ্র দেশের দুই চিরবিশ্বস্ত সন্তানকে হারিয়ে ফেলব। ওদের এক ভাইকে (বিনায়ক দামোদর সাভারকর) আমি খুব ভালো ভাবেই চিনি। লন্ডনে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। উনি সাহসী, বুদ্ধিমান এবং দেশপ্রেমিক। এক কথায়, উনি একজন বিপ্লবী। ব্রিটিশ শাসনের কদর্য দিকগুলি সম্বন্ধে উনি আমার অনেক আগেই অবহিত হয়েছিলেন। দেশের সরকার যদি সদাচারী হতো তাহলে তিনি দেশের পক্ষে কল্যাণকর কোনও কর্মে আত্মনিয়োগ করতে পারতেন। ওর এবং ওর বড়োভাইয়ের কথা ভাবলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়।’
সাভারকর সম্বন্ধে গান্ধীজীর এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের ইতিহাসে এক ‘নতুন আবিষ্কার হিসেবে গণ্য হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ চেপে দেওয়ার এক ঘৃণ্য প্রয়াস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। 
বস্তুত, বিগত কয়েক দশক ধরে বাম লেখকেরা সাভারকর সম্বন্ধে যে কুৎসা এবং অপপ্রচার রটিয়ে চলেছেন গান্ধীজীর উল্লেখিত প্রবন্ধটি তার সারবত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে এবং মিথ্যা প্রমাণ করতে সক্ষম। কমিউনিস্টদের কাছে ইতিহাস নিজেদের মতাদর্শের পক্ষে সুবিধাজনক গালগল্প তৈরি করার যন্ত্রই শুধু নয়, মানুষকে প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার যন্ত্রও বটে। সেই কারণে আমাদের আগামী দিনগুলো টালমাটাল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। কেননা আমরা যত আমাদের স্বাধীনতা সেনানীদের জীবনেতিহাস সম্বন্ধে সচেতন হব, ততই ভেঙে পড়বে বাম লেখকদের গড়া একটার পর একটা অচলায়তন এবং ব‍্যর্থ হয়ে যাবে রাহুল গান্ধী ও পেট্রোডলারের মিলিত ষড়যন্ত্র।