কিংবদন্তী অভিনেতা :  ছবি বিশ্বাস
————————————————-
রাজা শশাঙ্ক দেবের উত্তর পুরুষ, শ্রী শচীন্দ্রনাথ দে বিশ্বাস কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯০২ সালের ১২ জুলাই। কাত্যায়নী দেবী ও ভূপতিনাথ দে-র এই পুত্র সন্তানটি দেখতে খুব সুন্দর হয়েছিল বলে, মা তাঁকে ‘ছবি’ বলে ডাকতেন। আর সেই ছবি নামটিই চলচ্চিত্র জগতে পরে ‘ছবি বিশ্বাস’ – নামে অবিস্মরণীয় হয়ে উঠেছিল।

১৬০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে দিল্লির সম্রাট আকবরের কাছ থেকে ‘বিশ্বাস’ উপাধি পেয়েছিলেন তিতুরাম দে। তাঁর উত্তরপুরুষ রামকান্তের পুত্র চণ্ডীচরণ দে বিশ্বাস ১৭০০ সালে বড় জাগুলিয়া থেকে ২৪ পরগনার বারাসতের ছোট জাগুলিয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। বসতবাড়িটির নাম দিলেন ‘কালীনিকেতন’। এর পর সামন্ততান্ত্রিক পরিচয়কে পিছনে ফেলে শিক্ষা ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারটি কলকাতায় চলে এল। জাগুলিয়ায় যাতায়াত রইল, তবে সে কেবল পুজো-পার্বণে।
কলকাতায় বিশ্বাস পরিবারের উত্তর প্রজন্ম কালীপ্রসন্ন বিশ্বাস থাকতেন বিডন স্ট্রিটে। অর্থে, প্রতিপত্তিতে, ঐতিহ্যে, অনুষ্ঠানে, দান-ধ্যানে, দয়া-দাক্ষিণ্যে বনেদি পরিবার হিসেবে বিডন স্ট্রিটের বিশ্বাস পরিবারের পরিচিতি ছিল। কালীপ্রসন্নের ছোট পুত্র ভূপতিনাথ ছিলেন প্রতিষ্ঠিত পাট ব্যবসায়ী। বিডন স্ট্রিটেরই প্রতাপচাঁদ মিত্রের কন্যা কাত্যায়নীদেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ভূপতি-কাত্যায়নী দম্পতির ছোট ছেলের নাম শচীন্দ্রনাথ দে বিশ্বাস। চিত্রজগতে তিনি নাম হিসেবে ‘ছবি’ ও ‘বিশ্বাস’ পদবি ব্যবহার করতেন।
ছবি’-র দশ মাস বয়সে মা কাত্যায়নী দেবীর মৃত্যু হয়। অসময়ে মা চলে যাওয়ায় মেজ জ্যাঠাইমার কাছে মানুষ হয়েছিলেন তিনি। ছবি বিশ্বাসের অভিনয় স্পৃহা ছিল ছোট থেকেই। যৌথ পরিবারে ভাই-বোন সবাই মিলে আবৃতি, গান, নাটক— এসব চলত। পাশাপাশি পড়াশোনাও চলত। মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। নয়ানচাঁদ স্ট্রিটের একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষাজীবন শুরু। পরে ক্ষুদিরাম বসু লেনের সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চমশ্রেণি পর্যন্ত পড়ে হিন্দু স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস। তবে বন্ধুদের সঙ্গলাভের আশায় প্রেসিডেন্সি ছেড়ে পরে বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।
বালক ছবিকে সকলে ভালবাসতেন। তাঁর বাবা ভূপতিনাথের পাটের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল ‘মরান অ্যান্ড কোম্পানি’। সেই সূত্রে প্রতিষ্ঠানের এক বিভাগীয় কর্তা জি এস আলেকজান্ডার প্রায়ই বিশ্বাস-বাড়ি আসতেন। নিঃসন্তান এই দম্পতি ছবিকে দত্তক নিতে চাইলেন। কিন্তু তাতে বাধ সেধেছিলেন মাতামহী। কাজেই আলেকজান্ডার পরিবারে আর যাওয়া হয়নি ‘ছবি’র।
গোপীমোহন লেনের বাসিন্দা শচীন্দ্রনাথ বসুর কন্যা নীহারবালাদেবী ওরফে সমীরাদেবীর সঙ্গে ছবি বিশ্বাসের বিয়ে হয়। তাঁদের দুই পুত্র – মলয় ও দিলীপ এবং একটিই কন্যা, মঞ্জুলা।
                              
মদন মিত্র লেনে নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের বাড়ির বৈঠকখানায় ছিল ‘বারবেলা বৈঠক ক্লাব’। এখানে হতো শখের অভিনয়। এই ক্লাবে যোগদানের মাধ্যমেই ছবি বিশ্বাসের অভিনয় জীবনের হাতেখড়ি। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউ হলে নানা সুধীজন আসতেন। সেখানেই ছবি বিশ্বাস পরিচিত হলেন শিশিরকুমার ভাদুড়ির সঙ্গে। নিয়মিত না শিখলেও নিজেকে মনে করতেন শিশিরকুমারের শিষ্য। এই ভালবাসা থেকেই জড়িয়ে পড়লেন ললিতচন্দ্র বসু পরিচালিত শিকদারবাগান বান্ধব সমাজের সঙ্গে। বান্ধবসমাজের ‘নদীয়া বিনোদ’ কীর্তনাভিনয় প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৩-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি। সেখানে ছবি বিশ্বাস নিমাই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। মোট ১৭৫ রজনী অভিনীত হয় ‘নদীয়া বিনোদ’। পরে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন রমেশচন্দ্র দত্তের সহযোগিতায় গঠিত কাঁকুড়গাছি নাট্য সমাজ ও হাওড়া নাট্য সমাজের সঙ্গে।
শৈশবে কিছু দিন সঙ্গীতচর্চা করেছিলেন তিনি। কৃষ্ণচন্দ্র দে এবং জমিরুদ্দীন খাঁ-এর শিষ্যত্ব লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু অভিনয়ের দুর্বার আকর্ষণে সঙ্গীত সাধনায় স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে।
নানা রাজনৈতিক ঘটনায় কলকাতা উত্তাল হয়ে উঠেছিল। ব্যবসায় ধাক্কা খেল বিশ্বাস পরিবার। ভূপতিবাবু বিডন স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে উঠে এলেন মোহনবাগান লেনে। এই সময় নাট্য পরিচালক সতু সেন ছবিবাবুকে মিনার্ভা থিয়েটারে ডেকে পাঠালেন। কিছু দিনের মধ্যে নাট্য নিকেতন মঞ্চে জ্যোতি বাচস্পতি রচিত ‘সমাজ’ নাটকে পেশাদার শিল্পী হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। সালটা ছিল ১৯৩৮। এরপর ‘পথের দাবী’, ‘পরিণীতা’, ‘দেবদাস’, ‘ধাত্রীপান্না’, ‘কাশীনাথ’, ‘চাঁদ সদাগর’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘গৈরিক পতাকা’, ‘বিজয়া’, ‘পরমারাধ্য শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ডাকবাংলো’-সহ ৩৯টি নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। অভিনয় করেছেন মিনার্ভা, স্টার, শ্রীরঙ্গম ও সুন্দরম-এ। ‘স্বামী’ নাটকটি সুন্দরমকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল আর সে সঙ্গেই নাট্যশিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন ছবি বিশ্বাস। এমন নাট্যশিক্ষক, যিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন নাটকে প্রম্পটারের কোনও স্থান নেই।
ছবি বিশ্বাস খুব ভাল আবৃত্তিকারও ছিলেন। রেডিওতে তিনি আবৃত্তির অনুষ্ঠান করতেন সে আমলে। বেতারে তাঁর নাটক সম্প্রচারিত হতো – ‘চাণক্য’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’।
সিনেমায় অভিনয় করাটা হঠাৎই। একদিন ছবি বিশ্বাস কর্নওয়ালিস ক্রাউন সিনেমার সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছিলেন। সেইসময় বুকিংয়ে বসেছিলেন প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি। তিনি ছিলেন ম্যাডন কোম্পানির মাইনে করা পরিচালক। দীর্ঘদেহী সুদর্শন ছবি বিশ্বাসকে দেখে তাঁর ভালো লেগে গেল। তিনি ডাকলেন ছবি বিশ্বাসকে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘সিনেমা করবেন’।
ছবি বিশ্বাস একপায়ে খাঁড়া। সম্মতি জানালেন। পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তী তখন করছিলেন ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’। কালী ফিল্মসের ব্যানারে নিরুপমা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ (১৯৩৬) সিনেমাটি হলো ছবি বিশ্বাসের প্রথম ছবি। সকলেই ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের প্রশংসা করলেন।
‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-এ ছবি বিশ্বাসের নাম হলেও নতুন কোনও ছবির অফার তাঁর কাছে আর আসে না। তিনি এ স্টুডিয়ো ও স্টুডিয়ো ঘুরে বেড়ান। একদিন একজন বললেন, ‘আপনি যতই ঘোরাঘুরি করুন কাজ আপনি পাবেন না। আপনার বদনাম করে বেড়াচ্ছেন কমেডিয়ান নৃপতি চাটুয্যে।’
নৃপতিকে চেনেন না ছবি বিশ্বাস।
একদিন স্টুডিয়োরই একজন চিনিয়ে দিলেন। বললেন, ‘ওই যে ঢাঙা মতো রোগা লোকটি যাচ্ছেন, উনিই নৃপতি।’
ছবি বিশ্বাস ডাকলেন, ‘ও মশাই শুনছেন।’
পিছন ফিরে নৃপতি বললেন, ‘আমাকে ডাকছেন?’
‘আপনাকে ছাড়া আর কাকে ডাকবো শুনি। আছেটা কে এখানে!’ ছবি বিশ্বাস তখন খেপে আছেন নৃপতির ওপর।
নৃপতি সামনে এসে বললেন, ‘বলুন। কি বলতে চান?’
ছবি বিশ্বাস অভিযোগের সুরে বললেন, ‘আপনি আমার বদনাম করছেন কেন? আমি আপনার পাকাধানে কী মইটা দিয়েছি বলুন তো!’
নৃপতি ততোধিক শান্ত। বললেন, ‘আপনি খারাপ অভিনয় করেছেন বলব না! আপনার এমন আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা। যে-চরিত্র করছেন তার চলনবলন, হাঁটাচলা শিখতে হবে তো! আপনি হাঁটাচলা, কথা বলা নিয়মিত প্র‍্যাকটিস করুন। শিখুন। দেখবেন একদিন আপনি অনেকদূর যাবেন।’
ছবি বিশ্বাস বুঝলেন ঠিকই বলছেন তিনি। পুরোপুরি নৃপতির কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে কী করতে হবে প্রভু?’
নৃপতির সঙ্গে সারা জীবনের সম্পর্ক তৈরি হল ছবি বিশ্বাসের। নৃপতি তাঁর বাড়ির একটা ঘরে ছবি বিশ্বাসের জন্য আলাদা একটা বিছানা করে রেখেছিলেন। ছবি বিশ্বাস এলে সেখানেই বিশ্রাম নিতেন। এমনকী ছবি বিশ্বাস মারা যাওয়ার পর ওই বিছানা পাতাই থাকত। নৃপতি কাউকে বসতে দিতেন না, নিজেও কোনওদিন বসেননি। এমনটাই শ্রদ্ধা ছিল ছবি বিশ্বাসের ওপর।
এরপর থেকে ছবি বিশ্বাসের কাছে ছবির অফার আসতে শুরু করল। ছবি বিশ্বাস নিজেকে বদলালেন। 
অভিনয়েও এল আমূল পরিবর্তন। প্রতিবছরই ছবির সংখ্যাও বাড়তে লাগল।
‘নদের নিমাই’, ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’, ‘সখের চোর’, ‘শিউলিবাড়ি’, ‘রাজা সাজা’, ‘আম্রপালী’, ‘বিচারক’, ‘সপ্তপদী’, ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’-সহ প্রায় ২৫৬টি বাংলা চলচ্চিত্র ও তিনটি হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
                           
১৯৪২ থেকে প্রতিবছর ১৩-১৪টি ছবি করতে লাগলেন ছবি বিশ্বাস। পরবর্তী কালে ‘দেবী’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ করেছিলেন তিনি। কীসব করে গেছেন তিনি। কতরকম চরিত্র তিনি যে করেছেন, ভাবনার বাইরে! তবে শম্ভু মিত্র এবং অমিত মৈত্র পরিচালিত ‘মানিক’ বোধহয় একেবারে ভিন্ন ছবি ছিল তাঁর অভিনয়জীবনে। এই ছবিতে ছবি বিশ্বাসের সংলাপ ছিল না। পুরো ছবিটাই ছিল শুয়ে শুয়ে। আজও বাংলা ছবির দর্শক মনে রেখেছেন ‘সপ্তপদী’র উত্তমকুমারের বাবার ভূমিকা, ‘দেবী’র চরিত্র। এমনভাবে বলতে গেলে বিশাল এক তালিকা তৈরি হবে। তবে ‘একদিন রাত্রে’র ছবি বিশ্বাসের কণ্ঠে মান্না দে’র গাওয়া ‘এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়, সব সত্যি’ গানের দৃশ্য আজও বর্ষীয়ান দর্শকের চোখে ভাসে। একেবারে ভিন্ন ধরনের চরিত্র করেছিলেন ‘ওরা থাকে ওধারে’ ছবিতে।
বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সত‍্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘জলসাঘর’ ও ‘দেবী’ – এই তিনটি ছবিতে অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস। ‘জলসাঘর’-এর জন্য ৫৫ বছরের প্রৌঢ়কে ঘোড়ায় চড়া রপ্ত করতে দিন সাতেক রাইডিং স্কুলে এক ঘণ্টা করে যেতে হয়েছিল। নিখুঁত অভিনেতা ছিলেন বলেই তা রপ্ত করতে পেরেছিলেন ছবিবাবু। 
ছবি বিশ্বাসের মতো আভিজাত্যপূর্ণ চেহারার অভিনেতা বাংলা সিনেমায় বিশেষ আসেননি। তিনি ছিলেন একটা যুগ। বাংলা ছবিতে চলনবলন, পোশাকে এনেছিলেন পরিবর্তন। তাঁর অভিনয় ছিল ভীষণই সিনেম্যাটিক। থিয়েটারি প্রভাবকে একেবারে ভেঙেচুরে দিয়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন একজন সফল মঞ্চ অভিনেতা।
                            
শেষের দিকে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল দিনে এক হাজার টাকা। তবে অনেক প্রযোজক ও পরিচালকের অনুরোধে তিনি দিনে ২৫০ টাকাতে কাজ করেছেন, এমন উদাহরণও আছে। অনেক ছবিতে তাঁর অভিনয় নায়ক-নায়িকাকেও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল। ক্রনিক হাঁপানি রোগকে অদ্ভুত ভাবে বশে এনে তিনি অসামান্য এক বাচনভঙ্গি তৈরি করেছিলেন। চলচ্চিত্র মাধ্যমে পোশাকে-চলনে-বলনে একটা পরিবর্তন এনেছিলেন ছবিবাবু। রহমতের আলখাল্লা থেকে বিশ্বম্ভরের বেনিয়ান, সাহেবি হ্যাট-কোট-স্যুট বা জরির জোব্বা – সবই যেন তাঁর শরীরে অন্য মাত্রা পেত। 
‘প্রতিকার’ (১৯৪৪) ও ‘যার যেথা ঘর’ (১৯৪৯) নামের দু’টি ছবি পরিচালনা করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া দু’টি ছবিতে নির্বাক অভিনয় করেন ছবিবাবু— বিজলীবরণ সেনের ‘মানিক’ ও সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’-এ। তিনটি ছবিতে গানে লিপ দিয়েছেন তিনি – ‘প্রতিকার’, ‘একদিন রাত্রে’ ও ‘দাদাঠাকুর’-এ।
ছোট জাগুলিয়ায় সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য ছবি বিশ্বাস প্রায় ১০ বিঘা জমি দান করেছিলেন। ১৯৪২-৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় জাগুলিয়া গ্রামের ঘরে ঘরে চাল-ডাল-জামা-কাপড় পৌঁছে গিয়েছিল তাঁরই বদান্যতায়।
১৯৫৯ সালে বসুশ্রীর একটি ঘরে ‘অভিনেতৃ সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সঙ্ঘের সভাপতি নটসূর্য অহীন্দ্র চৌধুরী আর সহ-সভাপতি ছিলেন ছবি বিশ্বাস। তিনি মনে করতেন অভিনয় শিল্পে কলাকুশলীদের ভূমিকাই মুখ্য। নিজে অভিনেতা হয়েও মনে করতেন, সিনেমার আয়ের অংশ কলাকুশলীদের মধ্যে আগে ভাগ করে দেওয়া উচিত, অভিনেতারা নেবেন সকলের শেষে। শিল্পীদের যে কোনও অধিকার আন্দোলনে তিনি থাকতেন সর্বাগ্রে। ‘রঙ্গসভা’ নামে একটি নাটকের দলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ছবি বিশ্বাস।
                               
খুব ভাল টেবিল টেনিস খেলতেন ছবি বিশ্বাস। ক্রিকেট খেলাতেও আগ্রহী ছিলেন। অন্য দিকে ছিলেন গানের খুব ভাল সমঝদার, বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। তবে এ সবের পাশে অবসর সময় শুধুই বাগান নিয়ে পড়ে থাকতেন। সেখানকার ফুল কখনও ছিঁড়তেন না, কাটিং করতেন। তোড়া সাজিয়ে উপহার দিতেন অতিথিকে। তাঁর বাঁশদ্রোণীর বাড়ির বাগানে ৬০ রকমের জবা ও ৩০ রকমের গোলাপের গাছ ছিল। নানা ধরনের হাতের কাজেও পারদর্শী ছিলেন তিনি। মাটির বা প্লাস্টিকের নানা পাত্রে রং দিয়ে আঁকতেন। বাটিকের কাজ করার পাশাপাশি শাড়িতে এমব্রয়ডারির কাজও করতেন। নিজের হাতে সাজিয়েছেন ছেলেমেয়ের বিয়ের ও দোলের তত্ত্ব। অতিথিপরায়ণ ছবি বিশ্বাস জাগুলিয়ার বাড়িতে একটি গেস্ট হাউস করেছিলেন।
‘প্রতিশ্রুতি’ ও ‘দিকশূল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছিলেন বিএফজেএ পুরস্কার। বার্লিন ও জাকার্তা চলচ্চিত্র উৎসবেও গিয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস। সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি অভিজ্ঞান ও রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী ১৯৬২ সালের ১১ই জুন জাগুলিয়া যাওয়ার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে ছবি বিশ্বাসের দেহ ময়নাতদন্ত হয়নি। তিনি বলেছিলেন, সবাই জানে এটা দুর্ঘটনা, আর শিল্পীর দেহে কাটাছেঁড়া চলে না। ছবিবাবুর মৃতদেহ কলকাতার সমস্ত নাট্যাঙ্গনগুলি ঘুরিয়ে টালিগঞ্জের বাড়ি হয়ে কেওড়াতলা শ্মশানে দাহ করা হয়েছিল। 
প্রখ্যাত কৌতুক অভিনেতা শ্রী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুর পর মন্তব্য করেছিলেন,
‘‘ছবিদা চলে গেলেন। এ বার থেকে ব্যারিস্টারের চরিত্রগুলো কেটে মোক্তারের চরিত্র করতে হবে।’’
                             
তথ্যসূত্র:
১- সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (প্রথম খণ্ড), সাহিত্য সংসদ
২- বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭