দেশভাগের আগে সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু এভাবে গোটা উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমান চিহিৃত হতো না। দেশভাগের আগে হিন্দু মুসলমান বিভেদ, অসন্তুষ্ট, কখনো কখনো ছোটখাটো দাঙ্গা (যেমন ১৯২৬ সালে) হতো, কিন্তু নিজ দেশে পরবাসী এমনটা অনুভব কখনই কোন সম্প্রদায়ের মনে হবার মত রাজনৈতিক পরিবেশ ছিলো না। কাজেই গোটা উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বর্তমান যে সমস্যা তার মূলে দেশভাগ- দ্বিজাতিতত্ত্ব। এই তত্ত্বই ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমানকে সংখ্যালঘু বানিয়েছে। পাকিস্তান বাংলাদেশকে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ এরকম ধর্মীয় খৎনা দেশভাগের পূর্বে কল্পনাই করা যেতো না। অখন্ড ভারতবর্ষে মুসলমানরা অনেক প্রদেশেই ছিলো সংখ্যায় বেশি। সেখানে ধর্মীয় আধিপত্যবাদ কখনই সংখ্যায় কম সম্প্রদায়ের উপর চলতে পারেনি। তাই আপনি নিজেকে সেক্যুলার অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল মনে করলে দ্বিজাতিত্ত্বকে ইনিয়ে বিনিয়ে দূরে থাক এই তত্ত্বর জন্য অপরকে দোষ দিয়েও এই তত্ত্ব থেকে ফায়দা লুটবেন না।

সেই কাজটাই করেছে কথিত প্রগতিশীল শিবির বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের একাংশ। স্বাধীন বাংলাদেশে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, যা ছিলো আসলে ‘মুসলিম বাঙালী জাতীয়তাবাদ’, যিনি লেখা দিয়ে আলোচনা দিয়ে বুদ্ধিভিত্তিকভাবে তা প্রচার করেছিলেন তিনি আহমদ ছফা। তিনি ব্যবসা, দেশপ্রেমের ধোঁয়া তুলে দুই বাংলার বাঙালীদের সাংস্কৃতিক বিভাজনে নিয়োজিত ছিলেন। আপাত তার এইসব কাজকে দেশপ্রেম বলে দাবী করা হলেও তা ছিলো পরিস্কার অন্ধ ভারত বিদ্বেষ। আর এটা অস্বীকার করতে পারা কঠিন ঐতিহাসিকভাবে ভারত বিদ্বেষের সঙ্গে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক নীতি চলে আসেই। খুব কম ব্যক্তিই বস্তুনিষ্ঠভাবে বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ভারতকে মূল্যায়ন করতে পারেন। ভারতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় চুক্তি নিয়ে যত আলাপ আলোচনা, বিশ্লেষণ সন্দেহ তোলা হয় চীনের সঙ্গে এক বসাতেই এক-দুইশো চুক্তি স্বাক্ষরে জাতি জানতে চায় না চুক্তিতে ‘দেশ বিক্রি’ করে দেয়া হয়েছে কিনা। ছফার নানা লেখা এবং সাক্ষাৎকার থেকে তার পশ্চিমবঙ্গ বিরোধীতায় তার জাতীয়তাবাদ, দেশভাগ, হিন্দু-মুসলমান ইস্যু যে প্রভাব রেখেছে তা স্পষ্ট হয়েছে। বলা যেতে পারে তাই, স্বাধীন বাংলাদেশে আহমদ ছফা বাংলাদেশকে তার মূল সাহিত্য সংস্কৃতিতে যেতে দ্বিধাগ্রস্ত করেছিলেন। ২৩ বছর পাকিস্তানের সঙ্গে থেকে বাঙালী মুসলমানের যে সাংস্কৃতিক ক্ষতি হয়ে গিয়েছিলো দেশ স্বাধীন হবার পর কৌশলগতভাবেই তাই আমাদের কোলকাতার সঙ্গে দীর্ঘ একটা সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক সম্পর্ক দৃঢ় করার প্রয়োজন ছিলো। তাহলে আজকের বাংলাদেশের যে চরম ইসলামীকরণ ঘটে গেছে জনগণের মধ্যে তা ঘটত না বলেই মনে হয়। কেননা দেশ স্বাধীন হবার পর ওয়াজকারী নছিয়তকারীরা কোণঠাসা ছিলেন যুদ্ধের পরাজয় কারণ বশত। ছফা সেই সময়টায় নিজেদের মুসলমানিত্বটা বেশি করে সাহিত্যে ইতিহাসে বড় করে দেখতে চেয়েছেন।

ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার একটি ভৌগলিক দিক ছিলো। ঐতিহাসিকভাবে দুই বাংলার বাঙালীরা একই ভাষা ও সাহিত্যের উত্তরাধিকার। বাঙালীদের হাজার হাজার বছরের অভিন্ন ঐক্য, একই জাতিসত্ত্বা হবার কারণে রাজনৈতিকভাবে দেশভাগ হলেও দুই পারের সম্পর্ক ছিন্ন হবার নয়। আধুনিককালে রবীন্দ্রনাথ তার সেতু হিসেবে কাজ করেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টিকর্তারা শুরু থেকেই চেয়েছিলেন পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের মধ্যে কোন রকম যোগাযোগই রাখা যাবে না। রাজনৈতিকভাবে ভিসা পাসপোর্ট দিয়ে বিষয়টা কঠিন করে তুললেও পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল জয়ন্ত্রী পালন এক্ষত্রে যোগসূত্র একই তানপুরার দুটি তারের মতই বাজবে- এটি বুঝতে পেরেই পূর্ব পাকিস্তানে শুরুতেই পশ্চিম বাংলার বই পুস্তক দুষ্পাপ্য করে তুলে, রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ করে, জোর পূর্বক আরবী-উর্দু শব্দ বাংলা ভাষায় বসানো, নজরুলসহ অন্যান্য মুসলিম পরিচয়ের কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় শশ্মানসহ এরকম ‘হিন্দু শব্দ’ তুলে দিয়ে সেস্থলে ‘গোরস্থান’ করা হয়েছিলো। ছায়ানট, উদীচী’র মত সংগঠনগুলো রবীন্দ্রনাথকে, অভিন্ন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে। ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান ভাষা কি হবে এই প্রশ্নে এক পর্যায়ে আরবী রাখার প্রস্তাব করেছিলেন। বাংলা অভিন্ন ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীরা যাতে পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের সঙ্গে একই দিনে একই সময় অভিন্ন বাঙালী সংস্কৃতি ও প্রথা পালন করতে না পারে, অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐক্য যাতে দুই পারে না গড়ে উঠে তার জন্য পাকিস্তান আমলে কবি গোলাম মুস্তফা, ফরুখ আহমদদের মত বুদ্ধিজীবীরা চেষ্টা করেছিলেন। বলতে গেলে ছায়ানট, উদীচী ছিলো এইসব ডাকসাইটে কবি-সাহিত্যিকদের অগ্রাহ্য করে গড়ে উঠা সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। সেই থেকে প্রগতিশীল লেখক-কবি শিবির আলাদাভাবে চিহিৃত হতে থাকে।

স্বাধীনতার পর আহমদ ছফা সেই একই প্রচেষ্টা ভিন্ন আঙ্গিকে, দেশপ্রেমের খোলসে তীব্র গতিতে চালু করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে গোলাম মুস্তফা, ফরুখ আহমদের মত বুদ্ধিজীবীরা সংগতকারণেই ছিলেন নিস্প্রভ। পাকিস্তানে থাকার সময় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীরা বুঝেছিলো সংস্কৃতিহীনতা একটা জাতিকে কতখানি আত্মপরিচয় সংকটে ভোগায়। এ কারণেই পাকিস্তান সৃষ্টির কালে দুই বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে তিক্ততা ছিলো, তা রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দিয়ে ফের একসূত্রে আসার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেছিলো। দেশ স্বাধীন হবার পর পাকিস্তান অখন্ড চাওয়া শক্তি স্বাভাবিকভাবেই ছিলো ব্যাকফুটে। যে সময় এই জাতিকে আরো বেশি করে নিজ আত্মপরিচয় এবং সংস্কৃতি ভাষা সাহিত্যে তার শেকড়ে নেবার কথা ছিলো সেসময় আহমদ ছফা ভারতীয় বই, পত্রিকা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করার জন্য আদাজল খেয়ে নামেন। তিনি শওকত ওসমানকে বলেন (অনেকেই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের নাম বলেন এটি সঠিক নয়) ঢাকার রাস্তায় ভারতের বই বেচার জন্য বাল ফেলতে দেশ স্বাধীন করেছিলাম…!
৭৩-৭৫ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানের কাছাকাছি আসার যে চেষ্টা, সৌদি আরব তথা আরব বিশ্বকে ‘ভাই’ সম্বধন করে যে ‘মুসলিম বিশ্বে’ বাংলাদেশের প্রবেশের আপ্রাণ দৌড়ঝাপ, সেই সঙ্গে সোভিয়েত-ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়া, রাষ্ট্রীয়ভাবে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যে ইসলামের বন্ধু, বিরোধী নয়, এই ম্যাসেজটি মুসলিম বিশ্বে দেবার তখনকার সরকারের যে সব পদক্ষেপ সেসময় আহমদ ছফার দেশপ্রেম আর ব্যবসার দোহাই দিয়ে প্রচন্ড ভারত বিরোধীতা পালে কি অনুকূল বাতাস দেয়নি? দেশভাগের জন্য হিন্দুরা দায়ী- এরকম বলার পর দ্বিজাতি তত্ত্বের দায় নিজেদের গা থেকে ঝরে ফেলে দিয়ে পরক্ষণে পশ্চিমবঙ্গের কারণে বাংলাদেশের বিকাশ বাধাগ্রস্ত’ বলা কি পরোক্ষভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বকে সমর্থন করা নয়?

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের বড় সর্বনাশটি করেছেন এইসব প্রগতিশীল বলে চিহিৃত বা দাবীদার বুদ্ধিজীবীরাই। বাংলাদেশের ভিত দুর্বল করে দিয়েছিলেন তারাই।

Susupto Pathok