পূর্ব পাকিস্তানের কেন অসাম্প্রদায়িকতার প্রয়োজন হয়েছিলো?

পূর্ব পাকিস্তানের কিছু মানুষ অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাষ্ট্রের জন্য আকাঙ্খা করতেন। ষাটের দশকে এই আকাঙ্খা সাংস্কৃতিক চর্চা, সাহিত্য, সিনেমার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠতে দেখা যেতো। মূলত এই চাওয়া ছিলো বাঙালী মুসলমানের নিজের জন্য। দেশভাগের আগে ১৯৪৩ সালে পাকিস্তান প্রস্তাব পাস হবার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব বাংলার সাহিত্যিকরা গঠন করেছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সমিতি’ যার লক্ষ্যই ছিলো বাংলা ভাষায় ‘মুসলমানি সাহিত্য’ সৃষ্টি করা! এই সিমিতিতে আলোচনা করা হতো পাকিস্তান যে চিন্তা ও আদর্শকে লালন করে প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সাহিত্যিকরা তাদের গল্প উপন্যাস নাটক কবিতায় সেটাই ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করবেন। পশ্চিমবঙ্গের ভাষা থেকে বিকল্প ভাষা হিসেবে পূর্ববঙ্গের মানুষের মুখের ভাষাকে (বিক্রমপুরের আঞ্চলিক ভাষাকে বেছে নেয়া হয়) সাহিত্যের সংলাপ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। সাহিত্য হিসেবে যেন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা যেন পশ্চিম থেকে আলাদা হয়…। আপাত দৃষ্টিতে আপনার কাছে এর মধ্যে কোন সাম্প্রদায়িকতা চোখে পড়বে না জানি। বরং পূর্ববঙ্গে মানুষের জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে সাহিত্য গড়ে উঠাই উচিত বলে রায় দিবেন। বস্তুত ৪৩ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সমিতির উদ্দেশ্য এমনটা ছিলো না। কেমন ছিলো তা সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদের লেখা থেকে পরিস্কার হওয়া যায়। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য কেমন হবে তা বলতে গিয়ে লেখেন, ‘আমাদের মুসলিম অধিবাসী এবং হিন্দু অধিবাসীদের ভেতরে সাংস্খৃতিক ঐক্য রয়েছে কিন্তু বিভেদও রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে, আমাদের মুসলিম সংস্কৃতি ও কৃষ্টির চর্চা করা প্রয়োজন, সে মুসলিম সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই আমাদের নামাজ, কালেমা, তমুদ্দীন, আন্ডা, পানি, মাংস ইত্যাদি লবজ গ্রহন করা প্রয়োজনীয়…( পাক বাংলার কালচার/ বাংলাদেশ হবার পর এই বইয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশের কালচার’)।

আবুল মনসুর আহমদ বাংলাদেশে প্রগতিশীল একজন লেখক হিসেবে স্বীকৃত। পাকিস্তান হবার পর এই সাহিত্যিকদের বড় একটা অংশ ষাটের দশকে প্রগতিশীলতার পক্ষে কথা বলেছেন। অথচ তারা ছিলেন কট্টর পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে। দেশভাগের আগে পূর্ব বাংলায় হিন্দু জনগোষ্ঠি ছিলো ৩০ শতাংশ। দেশভাগের মাধ্যমে তাদের নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত করে চাকরি ব্যবসা সাহিত্য রাজনীতি সিনেমা গান বাজনা জমিদারী মহাজনী সব কিছুতেই মুসলমানদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলে। আবুল মনসুর আহমদের মত মানুষরা যে সমস্ত হিন্দুদের জন্য নিজেদের অস্তিত্ব হুমকি মনে করতেন মূলত দেশভাগ তাদের ওপাড়ে পাঠিয়ে দেয়। বাকী থেকে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশই দরিদ্র অশিক্ষিত এবং ধর্মীয়ভাবে শ্রমবিভাজনে নিমজ্জিত। নাপিত ধোপা মুচি না হলে তো বাঙালী মুসলমানেরও চলবে না। এরাই পাকিস্তানের পতাকার সাদা অংশ অর্থ্যাৎ মাইনরিটি। এরা পাকিস্তানে কোনদিনই মুসলমানদের প্রতিদ্বন্দ্বি হতে পারবে না। ধারে ভারে তারা এতটাই নগন্য যে রাষ্ট্রের মূলনীতি ভাবার সময় তাদের কথা বলার মত কোন রাজনীতিবিদই রাজনৈতিক ফয়দা অনুভব করতেন না। তাই ষাটের দশকে সেক্যুলার প্রগতিশীল পাকিস্তান কোন মাইনরিটির মৌলিক অধিকার রাক্ষার্থে অনুভূত হয়নি।

মূলত সে সময়টায় ক্ষীর্ণমান শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত যতটুকু পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে গিয়েছিলো তাদের বড় একটা অংশ ছিলো বাম রাজনীতিতে সক্রিয়। নিজের গা থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটা বাদ দিয়ে জন্ম নেয়া আওয়ামী লীগেরও পাকিস্তানের হিন্দুরা কোন হিসেবের মধ্যেই ছিলো না। ছয় দফার পর বাংলাদেশের গরীব দরিদ্র নিন্মপেশার হিন্দুরা একটু একটু করে আওয়ামী লীগকে আস্থায় নিতে থাকে। কারণ ৬৫ সালেই হিন্দুদের অবশিষ্ঠ ভরসা শিক্ষিত শ্রেণী ও রাজনৈতিক নেতারা দেশছাড়তে বাধ্য হন। অগণিত হিন্দু সম্পত্তি তখন পাকিস্তান সরকার এনিমি বা শত্রু সম্পত্তি হিসেবে জবরদখল করে নেয়।

সাম্প্রদায়িকতাকে বাদ দিলে পাকিস্তানের অস্তিত্বই থাকে না। পাকিস্তান চাওয়ার অর্থই ছিলো সেক্যুলারিজম ভ্রান্ত অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে মেনে নেয়া। মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র করতে না পারলে মুসলমানদের ভাগ্য বদলাবে না- এটি স্থান কালের বিচারেও সাম্প্রদায়িক বিবেচনা এবং তাতে আস্থা রাখার অর্থ সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতা আছে এটি আপনি মেনে নিলেন। তারপরও আপনি অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলার প্রগতিশীল হলে সেক্যুলারিমজের সংজ্ঞাই বদলাতে হয়।