(তৃতীয় কিস্তি) ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সুপারস্টার (৩)
KANAN DEVI: THE FIRST SUPERSTAR OF INDIAN CINEMA
অথচ মাত্র নয় বছর বয়সে কানন দেবীর পিতা মারা যান। অসহায় মাতা দুই কন্যাকে নিয়ে এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িত আশ্রয় নিয়ে ঝিয়ের কাজ করেন।

সেখান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর মা-মেয়েতে মিলে বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করেন। তার আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’ গ্রন্থে তাঁর বড় হয়ে ওঠার এসব কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ছোটবেলায় পরের বাড়িতে লাথি-ঝাঁটা খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে হয়েছে। খাবার জুটত না দু’বেলা। বাবা রতনচন্দ্র দাস মার্চেন্ট অফিসে কাজ করতেন। একটা ছোটখাটো সোনা-রূপার দোকানও ছিল। কিন্তু নানান কুঅভ্যাসের জন্যে আয়ের চেয়ে ব্যয়ই ছিল বেশি। ফলে, প্রচুর ধারদেনা রেখে যখন অকালে মারা গেলেন রতনচন্দ্র। সামাজিক স্বীকৃত বিবাহিত স্ত্রী না হলেও তখন সেই ঋণ শোধ করতে ছোট্ট কাননের মাকে সর্বস্ব বিক্রি করে পথে নামতে হয়েছিল। সেই কাননই পরবর্তীকালের বাংলা সিনেমা ও বাংলা সিনেমা ও গানের কাননবালা থেকে অদ্বিতীয়া কানন দেবী হয়ে ওঠেন। জীবনের এইসব অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করেননি কানন দেবী। বরং সেই কঠিন অভিজ্ঞতার আগুনে পুড়ে আরও বেশি খাঁটি, আরও বেশি সহৃদয় মানবিক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তবে, সেইসব কথা স্বীকার করার মতো তেজ ও সততা তার ছিল। তাই, এমন কথাও তিনি স্বীকার করেছেন, বড় হয়ে তিনি কারও কারও কাছে শুনেছেন, বাবার বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন না তার মা। এর উল্টো কথাও শুনেছেন। কিন্তু, নিজের আত্মকথায় তিনি বলেছেন, ‘এ নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। আমি ‘মানুষ’, সেই পরিচয়টাই আমার কাছে যথেষ্ট। শুধু দেখেছি, বাবার প্রতি তার আনুগত্য ও ভালবাসা কোনও বিবাহিত পত্নীর চেয়ে বেশি ছাড়া কোনও অংশে কম ছিল না। হয়তোবা সেই ভালবাসা-জাত কর্তব্যবোধের দায়িত্বেই বাবার সমস্ত ঋণভার অম্লানবদনে মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। তাই দরিদ্রের সংসারের যা কিছু সোনা-দানা এবং বিক্রয়যোগ্য জিনিসপত্র ছিল, সব বিক্রি করে বাবার ঋণ শোধ করলেন।’ 
‘এরপরই শুরু হল চরম দুরবস্থা। একবেলা আহার সব দিন জুটত না। জীর্ণতম বস্ত্র মায়ের অঙ্গে, আমার অবস্থাও একইরকম।’ 
এই সবই কানন দেবীর নিজের কথা।
তারপর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে কাকুতি-মিনতি করে আশ্রয় জোটানো। কিন্তু, কানন আর তার মা আশ্রয় নেওয়ার পর সেই আশ্রয়দাতা বাড়ির ঝি, রাঁধুনি দু’জনকেই ছাড়িয়ে ছিলেন। সেই বাড়ির সমস্ত কাজ করতে হতো কানন আর তার মা-কে। এবং প্রতি মুহূর্তে অপমান, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা শুনতে হতো তাঁদের। একদিন মায়ের হাত থেকে চায়ের প্লেট পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। তখন বাড়িসুদ্ধ সবাই তেড়ে মারতে গেল মা-কে। দশ বছরের কানন মায়ের হাত ধরে বোনকে সাথে নিয়ে সেদিন আবার রাস্তায় নেমে আসে। এর চেয়ে উপোস করে মরাও ভালো, এটাই মা-কে বলেছিল সেই ১০ বছরের মেয়েটা। এরপর বারো ঘর এক উঠোনের এক বাড়িতে ঠাঁই। তখনই পরিচিত এক ভদ্রলোক তুলসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা। তাকে কাকাবাবু বলে ডাকতেন ছোট্ট কানন। কাননের মিষ্টি মুখ, মায়াবী চোখ দেখে ছবিতে কাজ করার জন্যে তিনি নিয়ে যান বিখ্যাত পরিচালক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। বাংলা চলচ্চিত্রের তখন শৈশব অবস্থা। বুলি ফোটেনি। নির্বাক ছবি ‘জয়দেব’-এ সুযোগ হলো রাধার চরিত্রে অভিনয় করার। ম্যাডান থিয়েটার্স লিমিটেডের সেই ছবিতেই প্রথম ফুল ফুটল কাননের অভিনয়ের। সেটা ১৯২৬ সাল। এই ছবির পর চার বছর ছিল কাননের প্রস্তুতি পর্ব। ম্যাডান কোম্পানির ব্যানারেই ১৯৩১ সালে তৈরি হলো বাংলার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ‘ঋষির প্রেম’। এই ছবিতে উৎপলার ভূমিকায় অভিনয় করলেন এবং গানও গাইলেন কাননদেবী। 
অভিনয় ছাড়াও দশকের পর দশক তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও বাংলা সংগীতজগতে অসামান্য অবদান রাখেন। সুকণ্ঠের জন্য তিনি শৈশব থেকেই সুনাম পেয়ে এসেছেন। কিন্তু আর্থিক দুরবস্থার জন্য তার মা তাকে ভালো শিক্ষকের কাছে গান শেখানোর ব্যবস্থা করতে পারেননি। তার সহজাত সংগীত প্রতিভার বদৌলতে তিনি ছায়াছবিতে কণ্ঠদান করতে পেরেছিলেন। পরে অবশ্য কাননদেবী ওস্তাদ আল্লা রাখার কাছে তালিম নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি এবং আধুনিক বাংলা গানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। সেকালের বিখ্যাত গায়ক, সুরকার এবং সংগীত শিক্ষক রাইচাঁদ বড়াল, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, অনাদি কুমার দস্তিদার, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র প্রমুখের কাছে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গান শিখেছিলেন। তার গাওয়া ‘আমি বনফুল গো’ এক সময়ে যেমন অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, তা আজো রসিক শ্রোতার মনে সমান দোলা দেয়। তার গাওয়া জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীতগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের’, ‘তার বিদায় বেলার মালা খানি’, ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’,  ‘তোমার সুরের ধারা’ আমার বেলা যে যায়’, ‘বারে বারে চেয়েছি, পেয়েছি যে তারে’, ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’, ‘সেই ভালো সেই ভালো’, ’একদিন চিনে নেবে তারে’, ‘কাছে যবে ছিল হলোনা যাওয়া’, ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’, ‘এত দিন যে বসে ছিলেম পথ চেয়ে’ ইত্যাদি।
(ক্রমশ)
Posted by Admin K C Chowdhury from Russia