নরম মাটির স্বাদ পাইলেই তথাকথিত বিধি “বাম” কুক্কুটরাজি [চলতি বাংলায় মুরগির পাল] যে অতিশয় সক্রিয় হইয়া উঠিবে বিগত কয়েকটি দশকের ধারাবাহিক চালচিত্র অবলোকন করিলেই পরিষ্কার হইয়া যাইবে। দুর্গাপূজার মত একটি মহোৎসবের সূচনা ঘটিলেই উপরিউক্ত চুলকানিই সহস্র গুণ বর্ধিত হইয়া মহা দাদের দাদখানিতে পরিণত হইবে এবং সেই চাল হাঁড়িবন্দী হইয়া সোচ্চারে টগবগ টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠিবে তাহা বলাই বাহুল্য। “প্রগতিশীল” “উদারপন্থী”, “ধর্মনিরপেক্ষ”[প্রকৃত অর্থে আত্মঘাতী] বলিয়া আত্মপরিচয় প্রদান করা এই সকল সিউডো ইন্টেলেকচুয়াল লোহিতবর্ণ কুক্কুট মাহেন্দ্রক্ষণটিকে কাজে লাগাইয়া দুর্গাকে বেশ্যা, নষ্টা নারী বলিয়া কোঁকর কোঁ করিয়া উঠিবে, কতিপয় পশু বলির অমানবিকতা ইহাদিগের হৃদয় বিদীর্ণ করিয়া ঝাঁঝরা করিয়া দিবে , ঢাক ঢোল, মিউজিক বক্সের তুমুল শব্দে উহাদিগের কোমল কর্ণকুহর ফাটিয়া যাইবার উপক্রম হইবে, কুমারী পুজাকে উহাদের নারী নিপীড়ন, নারী অবদমনের প্রতীক বলিয়া মনে হইবে, তদোপরি হিন্দুদিগের এই সকল পূজা অর্চনা আচার বিচার যে কত বড় ঢপ তাহা উপলব্ধি করিয়া ইহাদের চিৎকার  নভোমণ্ডল এফোঁড় ওফোঁড় করিয়া ছাড়িবে। 

ধর্মকে জনগণের আফিম বলিয়া গণ্য করা এই সকল ঘোষিত অঘোষিত ‘কমরেডকুল’ তাত্ত্বিকরূপে ধর্মহীন এবং সকল প্রকার ধর্ম পালন হইতেই সম দূরত্ব বজায় রাখার পক্ষপাতী [ যদিও এই সকল বাম, বামাগণ পূজা উপলক্ষে শপিং, বিউটি পার্লার, সাজুগুজু, পূজামণ্ডপের সেলফি, সুখাদ্যের চাকুম চুকুমে ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ, শারদ/ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত স্বরচিত গদ্য পদ্যের পাতা উল্টাইয়া স্বমেহনের ঢেকুরও তুলিয়া থাকেন ]।

জনৈক “বিধি বাম” লেখককে সবিনয়ে প্রশ্নটি করিয়াই ফেলিলাম—

হে মহান প্রগতিশীল “বাম” অগ্রজ আপনি বলির বিরুদ্ধে হালুম করিয়া ওঠেন, কিন্তু কোরবানির সময় উপস্থিত হইলে কুঁইকুঁই করিয়া ঘেয়ো ল্যাজটিকে নাচাইয়া তৃপ্তি অনুভব করেন কেন ? কীর্তনকারীদিগের মস্তক কর্তনের স্বাদ জাগিলেও নামাজীদিগকে স্বীয় মুণ্ডটিকে নৃত্যালয় বানাইবার অনুমতি প্রদান করেন কেন ?

উত্তর আসিল “প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ ধর্মের সমালোচনা করা।অন্যের ধর্ম নিয়ে কিছু বলার আগে নিজের ধর্মের কুপ্রথা নিয়ে বলা উচিত !” 
সবিনয়ে বলিলাম—কেলো করেছে ! নিজের ধর্ম মানে ? তার মানে আপনি নিজেকে হিন্দু বলে পরিচয় দিচ্ছেন। এদিকে দিন রাত বুলি ঝাড়েন ধর্ম জনগণের আফিম। সব ধর্ম থকেই নাকি সমান দূরত্ব বজায় রাখেন। তবে ইসলাম থেকে আপনার যতটা দূরত্ব, হিন্দু আচার বিশ্বাস থেকেও ঠিক ততটাই ব্যবধান। তবে আপনার নেক নজরটি বারবার একই লক্ষ্যে ধাবিত হয় কেন ! পরিষ্কার করে জানান আপনি হিন্দু না বস্তুবাদী নাস্তিক। ইয়ে মানে আপনার dialectical materialism আমিও কিঞ্চিৎ পড়েছি কিনা !

এর পর অবশ্য আমার বিধি বাম অগ্রজটি নিরাপদ দূরত্ব নির্বাচন করিয়া সরিয়া পড়িলেন।

অদ্য মহানবমী । কুমারী পুজার দিন। অন্যান্য অনেক পূজামণ্ডপের ন্যায় বেলুড় মঠেও ইহার প্রচলন আছে। স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ ইহার প্রচলন করিয়াছিলেন। কেন করিয়াছিলেন, কি উদ্দেশ্যে করিয়াছিলেন, ওঁর মত একজন আধুনিক মনস্ক মনুষ্যও কোন লক্ষ্য গ্রহন করিয়া ইহার লালন করিয়াছিলেন তাহা “বিবেকানন্দের চোখে ইসলাম” শীর্ষক আলোচনাটিতে বিশদ উল্লেখ করিয়াছি। নির্দিষ্ট একটি সংস্কৃতি, বিশ্বাসকে কেন্দ্র করিয়াই একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয় । পরস্পরের সঙ্গে আত্মিক যোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে এই বোধ যে কত গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপ ভ্রমণকালে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করিয়াছি। ভোগবাদী আধুনিকতা এবং অত্যধিক উদারতার আহ্বানে নিজের আইডেন্টিটি বিসর্জন দিলে যে কীরূপ একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা একটি জাতিকে গ্রাস করে সমগ্র স্ক্যানডিনেভিয়া তথা ইউরোপ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ঐক্যবদ্ধ ইসলামী শরণার্থীর সম্মুখে দিশেহারা হইয়া পড়া জনগোষ্ঠীটি এখন গুদাম ঘরের আবর্জনা হইতে মরিচা ধরা ক্রসটিকে টানিয়া বাহির করিতেছে। জাতি কাহাকে বলে ? রাষ্ট্রবিজ্ঞান পুস্তকে ইহার উপর বিশেষজ্ঞ গার্নারের একটি সংজ্ঞা আছে। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটিই হইল একটি অভিন্ন সংস্কৃতি, বিশ্বাস [common culture and creed] । ইহা ব্যতীত কোনো জাতিরই অস্তিত্ব অসম্ভব। ছত্রভঙ্গ জাতির বিলোপ  অনিবার্য। কুপ্রথা, কুসংস্কারের সমালোচনা আর স্বীয় সংস্কৃতির শেকড় উৎপাটন এক বিষয় নয়। প্রথমটি জাতিকে শক্তিশালী করে, দ্বিতীয়টি জাতিকে নির্মূল করে। একটি সীমারেখা টানা অত্যন্ত জরুরী। নহিলে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াইতে ছাড়াইতে সমগ্র পেঁয়াজটিই অদৃশ্য হইয়া যাবে। ইসলামী মৌলবাদের মদতদাতা এই সকল “বাম, বামাদিগের” উদ্দেশ্যই হইল হিন্দু সংস্কৃতির এই পেঁয়াজটিকে হাপিশ করিয়া দেওয়া।

ম্রিয়মান হইয়া পড়া পেঁয়াজটি ইদানীং তাহার হারাইয়া যাওয়া ঝাঁজ অন্বেষণে ব্রতী হইয়াছে। বলাই বাহুল্য ইহার ঝাঁজ যত বাড়িবে কমরেডকুলের চক্ষু ততই জ্বলিতে থাকিবে।

দেবাশিস লাহা।