Home Bangla Blog বঙ্গভাষী সমস্ত জনগোষ্ঠীই কি বাঙালি?

বঙ্গভাষী সমস্ত জনগোষ্ঠীই কি বাঙালি?

195

ইংরেজি বললেই ইংরেজ হয় না, জার্মান বললেই হয় না জার্মান। স্প্যানিশ যাদের মাতৃভাষা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠই স্প্যানিশ নয়। মেক্সিকান, আর্জেন্টিনিয়ান, কলম্বিয়ান, কিউবান প্রমুখ বিভিন্ন জাতি। ভাষা ও জাতি সমার্থক নয়। প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতি ইউরোপীয় সভ্যতার আঁতুরঘর। গ্রিকদের পরিচয় বা জাতিবোধ ছিল নগর রাষ্ট্র ভিত্তিক, আদৌ ভাষাভিত্তিক নয়। কিন্তু বঙ্গভাষী সমস্ত জনগোষ্ঠী বাঙালি জাতি এমন একটি ধারণা আমাদের মনের মধ্যে গেঁড়ে বসে আছে। চট্টগ্রাম থেকে মেদিনীপুর, বিশাল ভূখণ্ডে বাংলার যে বিভিন্ন উপভাষা প্রচলিত, সেগুলির ব্যবহারকারীরা এক এবং অভিন্ন জাতি, যে জাতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কূটনীতিতে ধর্মের বিভাজনে দ্বিখন্ডিত। যে খণ্ডের বঙ্গভাষীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদের ইদানীং বাঙালি জাতি পরিচয়টায় বড্ড লোভ।

জাতি আগাছা নয় যে মাটি ফুঁড়ে আপনি যত্রতত্র যখনতখন গজিয়ে উঠবে। একটি জনগোষ্ঠীর জাতি হয়ে ওঠা শতশত বছরের বিবর্তনের পরিণাম। কী হলে বা না হলে একটি মানব গোষ্ঠী জাতি হয় তার কোনও বাঁধাধরা সর্বজনীন সর্বকালীন নিয়ম বা ফরমুলা নেই। ভারতীয় ভাষায় ‘জাতি’ ও ইউরোপীয় ‘নেশান’ দুটিরই মূল জন্মবোধক শব্দ। অর্থাৎ যে ভূমিতে মানুষ ভূমিষ্ঠ হয় সেই মাটির সঙ্গে তার নাড়ির বন্ধন সর্বত্র। ভারতীয় উপমহাদেশে জাতিগুলি ভূমিভিত্তিক এবং তাদের লক্ষণ বহুমাত্রিক : পদবী, সামাজিক, ধর্মীয় আচারাচরণ, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতিচর্চা, চরিত্রলক্ষণ, জীবিকা নির্বাচন প্রভৃতি। বাঙালি মানে শুধু বঙ্গভাষী ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী নয়। বাঙালী তারা যাদের পদবী মুখার্জি, ব্যানার্জি, দত্ত, ঘোস, বোস, মিত্র, সেন, দাশগুপ্ত, সাহা ইত্যাদি। প্রধান উৎসব দুর্গা পূজা, বিবাহ অনুষ্ঠানে রীতি, মালাবদল, শাঁখাসিঁদুর, খাদ্যাভ্যাস সাহিত্য, শিল্প, ললিতকলায় বিশেষত কাব্যগীতিতে অনুরাগ, প্যাশান, রাজনীতি ও তর্ক, জীবিকা যোগ্যতাও মেধাভিত্তিক। এমনটিই ভারতে বাঙালি পরিচিতি। অন্য জাতিদের অন্য পদবী, ভিন্ন লক্ষণ। যেমন, দেশপাণ্ডে, কুলকার্নি বা কার যুক্ত পদবী মারাঠিদের, উৎসব গনেশ চতুর্থী, সংস্কৃতি চর্চা, নাটক, ধ্রুপদী সংগীত, চরিত্র লক্ষণ দাঢ্য, সামরিক চেতনা, মেয়েদের পরিধান- কাছাদেওয়া শাড়ি, বিবাহে মঙ্গল সূত্র। মহান্তি, পট্টনায়েক, মহাপাত্র প্রভৃতি ওড়িয়াদের পদবী, উৎসব- রথযাত্রা, সংস্কৃতি- ধ্রুপদী মন্দির শিল্প ও ওড়িশা নৃত্য, বিবাহে কাচের চুড়ি ও পায়ে রুপোর চুটকি। তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবি, কেরলি প্রমুখ প্রত্যেকটি জাতির এমনই বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্য ভারতে জাতিবোধের অনন্যতা।

কিন্তু কোনও জাতি নিঃসঙ্গ দ্বীপ নয়। পার্থক্যবোধের সঙ্গে আছে সার্বিক অন্তর্লীন ঐক্যের চেতনা, প্রত্যেক জাতি প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল। তাই দেবভাষা সংস্কৃত থেকে বিভিন্ন মাতৃভাষায় রামায়ণ, মহাভারতের অনুবাদ/পুনর্কথন হয়েছে যাতে দ্বাদশ শতক থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে তামিলরা, দক্ষিণের ভক্তি আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে প্রত্যেকটি জাতির অবয়ব সুস্পষ্ট করেছে। বৃহত্তর ঐক্যের পটভূমিতেই উপলব্ধি ভাষা ও স্থানভিত্তিক পার্থক্য।

দীর্ঘ ২৬ বছর পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আমর কর্ম ও সাংসারিক জীবন। বারবার দেখেছি ভারতীয় মানসে বাঙালি জাতির সসম্মান অবস্থানের কারণ তার ভাবমূর্তি। যার নির্মাতা হলেন কয়েকজন কালজয়ী প্রতিভা- শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষ, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র। এঁরা সকলেই হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের সন্তান। মৌলিক সৃজন মনন, ধর্মসংস্কার, সাহিত্য শিল্পকলা এমনকি গানবাজনার বিনোদন ক্ষেত্রে পর্যন্ত বিশিষ্ট অবদানকারীরা এ বঙ্গের। কারও কারও জন্ম বা পৈত্রিক ভিটা পদ্মার ওপারে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গে, কিন্তু তাদের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে। যে কারণে পাঁচশো বছর মুসলমান শাসনে একটিও বাংলা বর্ণপরিচয় লেখা হয়নি, একজন মুসলমানের নামেও জাতিপরিচয় নেই, সেই কারণেই শরৎচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত কাহিনী আরম্ভ করেন ‘বাঙালি এবং মুসলমানের’ মধ্যে ফুটবল খেলা দিয়ে। এটাই বাস্তব।

শুধু বাঙালি নয়, ওড়িয়া, অসমিয়া, তামিল, মারাঠি, পাঞ্জাবি প্রমুখ কোনও জাতিনির্মাণেই মুসলমানদের অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিজেতা তুর্কিদের বংশধররা ভারতে বাসিন্দা মাত্র। ইসলামে ধর্মান্তরিত দেশজ’রা পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন। ইউরোপে খ্রিস্টানরা প্রাকখ্রিস্টীয় পৌত্তলিক সভ্যতাকে স্বীকার করে, মান্যতা দিয়ে, দেশের মাটির সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে তবেই নিজ নিজ ধর্মোত্তর জাতীয় সত্ত্বা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। পরস্পর বিবাদমান জাতিরাও প্রাচীন গ্রিকোরোমান পৌত্তলিক ঐতিহ্যের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল। এমন কি তারা অন্য মহাদেশেও ধ্রুপদী গ্রিকরোমান সংস্কৃতি রোপন করেছেন।

যে ভূখণ্ডটি পূর্বপাকিস্তান/ বাংলাদেশ, সেটি স্বেচ্ছায় ভোট দিয়ে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ জিগির হেঁকে ইসলামের ভিত্তিতে ভারতবিভাজন ঘটিয়েছিল। তখনও রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গান ছিল, ছিল জীবনানন্দের ‘বংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ কবিতা। তাতে ৪৬-এর কলকাতার দাঙ্গা বা নোয়াখালির গণউৎসাদন আটকায়নি, আটকায়নি দেড় কোটির ওপর বঙ্গভাষী হিন্দু বিতাড়ন, যা আজও অব্যাহত। বাংলা ভাষাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করে পূর্বপাকিস্তান হল বাংলাদেশ। নাম বদলে চরিত্র বদলায় না। বাংলাদেশি শিশুরা বর্ণপরিচয় শেখে ইসলামের মাধ্যমে- (‘অযু করে মসজিদে যাই, আযান দেয় মুয়াযযিন ভাই, ইবাদত কর অন্তর থেকে ঈদের আনন্দ চারিদিকে’), দেশের ইতিহাস হিসাবে পড়ে ইসলামের ইতিহাস, তাদের যাবতীয় কার্যকলাপ, অনুষ্ঠান থেকে বিমান যাত্রা, ইসলামের নামে হয়, তাদের পরিচয়, পদবী, সব তুর্কি বিজেতাদের অনুকরণে।

বাঙালি কে প্রশ্নটি ভারতে নিরর্থক। বাঙালি জাতির পরিচিতি বাঙালি জনগণের, বাঙালি প্রতিভার ভারতীয় সভ্যতায় অনন্য অবদানে।


লিখিকা,এষা দে

%d bloggers like this: