প্রসঙ্গঃ একজন মৌলবাদী তথা হিপোক্রিট চিত্রনায়িকা শাবানার রাজনৈতিক অভিলাষের গল্প

একসময়ে বাংলাদেশের সস্তা ও বস্তাপচা চলচ্চিত্রের প্রধান নায়িকা শাবানা অভিনয় ছাড়ার পরে এখন কালো বোরকা পরে সুন্নতে বিবি তথা ধার্মিক মুসলিমাহ হয়েছেন এবং মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিদেশ গমন করেছেন। এজন্য তিনি অবশ্য তার প্রাণপ্রিয় নবীর দেশ তথা ইসলামের পীঠস্থান সৌদি আরবকে বেছে নেননি বরং নিয়েছেন ক্রমশ নাস্তিকতা বৃদ্ধি পাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যেখানে খ্রিষ্টান, ইহুদী নাসারা আর নাস্তিকেরা সংখ্যায় ব্যাপক। আদতে লোভী ও স্বার্থবাদী শাবানা হিশেবে কিন্তু ভুল করেননি, ইনি মুখে যতই ইসলাম ইসলাম বলে ফ্যানা তুলে ফেলুন না কেন, ইনি ভালো করেই জানেন – অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা লাভ তথা আরাম আয়েশে বসবাসের জন্য দরকার অমুসলিম অধ্যুষিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত উন্নত দেশ, মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ কিংবা সৌদি আরব নয়। 

অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত আমজনতার কাছে জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শাবানার কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। বিদেশী কোন চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে যদি তার নামটি বলা হয়, কেউই শাবানাকে চিনবেন কী ? হ্যা, শাবানার কৃতিত্ব শুধুমাত্রই একটি বিশেষ দৃশ্যে, সেটি হচ্ছে কান্নাকাটির দৃশ্য। শাবানা অভিনীত সকল চলচ্চিত্রে শাবানা যেই পরিমাণ অশ্রুবর্ষণ করেছেন, সেটি পৃথিবীর আর কোন নায়িকা করেছেন কিনা সন্দেহ আছে !

গত পনের বছরে ধারাবাহিক বিরতিতে মাঝে মাঝেই খবরের শিরোনাম হয়েছেন শাবানা। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে আমেরিকায় এক ঘরোয়া আড্ডায় শাবানা বলেছেন, নিউ ইয়র্কের স্থানীয় টিভি চ্যানেলে ও বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোতে রমজান মাসে তাঁর সিনেমা যেন না প্রচার করা হয়। এমনকি কখনোই যেন তাঁর আর কোনো ছবিই না চালায় সেই অনুরোধও করেন টিভি চ্যানেলগুলোর কাছে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে খবর হন তিনি। সেবার, যশোরের কেশবপুরে স্বামীর নাম অনুসারে বসতবাড়ি ‘সাদিকভিলা’র উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে ২০ শতক জমির ওপর ছাত্রনিবাসসহ একটি আধুনিক মাদ্রাসা নির্মাণের কাজও শুরু করেন তিনি। কোনো ফিল্ম ইনস্টিটিউট দূরে থাক, এমনকি স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিও নয়, আবাসিক মাদ্রাসা বানাচ্ছেন শাবানা! দেশে যেখানে বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল একটি সুশিক্ষিত ও সচেতন যুবসমাজের প্রয়োজন, সেখানে তিনি মহাসমারোহে একটি জঙ্গিবাদী গণ্ডমূর্খ বিজ্ঞান ও প্রগতিবিমুখ প্রজন্ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন । এক হিশেবে ঠিকই আছে, যেই শাবানার শিক্ষাজীবনের ইতি মাত্র ৯ বছর বয়সে, সেই অশিক্ষিত শাবানা বিজ্ঞান ও প্রগতিশীলতা তথা শিক্ষার মর্ম বুঝবেন কী করে ?

শাবানা যে কত বড় অকৃতজ্ঞ ও স্ববিরোধী তার প্রমাণ হচ্ছে যেই চলচ্চিত্র তার অর্থবিত্ত, পরিচিতি ও খ্যাতি এনে দিল, সেই চলচ্চিত্রের প্রতিই আজ তার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দৃষ্টিভঙ্গি।

চলচ্চিত্রকে যেই বর্তমান শাবানা অপছন্দ করেন, সেই শাবানাই আবার স্ববিরোধীভাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার ২০১৫ এর অনুষ্ঠানে যোগদান করেন এবং বলেন –

“আমি যাদের জন্য শাবানা, আজকের এ পুরস্কার তাদের। আমাদের চলচ্চিত্র আজ সংকটে। কিন্তু যেকোনও সংকটের মাঝে লুকিয়ে থাকে সমাধান। যখন আামাদের পাশে সবার প্রিয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আছেন তখন কোনও সংকটই থাকতে পারে না। প্রবাসে থাকলেও আমি জ্ঞাত হয়েছি। তিনি বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট করেছেন। বিপুল অর্থের মাধ্যমে বিএফডিসি আধুনিকায়ন করেছেন। জানতে পারি, তিনি ফোর-কে রেজুলেশনের প্রজেক্টরের ব্যবস্থা করছেন। যেখানে বিশ্বের অনেক দেশে এখনও টু-কে রেজুলেশন ব্যবহার করা হয়। আমি তাকে সাধুবাদ জানাই।”

এখানে তার চলচ্চিত্রবিরোধী মুসলিমাহ-ত্ব কোথায় যায় – সেটিই সচেতন মানসে প্রশ্নের উদ্রেক করে।

কেন এই স্ববিরোধিতা ? এর পেছনে কারণ হলো – শাবানা ও তার স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের এই মুহূর্তে বড়ই অভিলাষ রাজনীতিতে আসার। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তেল মারতে হবে তো ! শেখ হাসিনাকে তৈলমর্দনের মাধ্যমে যদি সামনের বার ইলেকশনের টিকেট হাতে পাওয়া যায় – তাহলে তো যশোর-৬ এর কেশবপুর এলাকাটি নিজেদের দখলে আনা যাবে ! এজন্য শাবানা ধর্মমন্ত্রী আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন যেই ধর্মমন্ত্রী ২০১৭ সালে ৭৯ জনকে জনগণের টাকায় হজ্বে পাঠিয়েছেন যারা তার আত্মীয় ও ব্যক্তিগত কর্মচারী। উনি ২০০৯ এ ময়মনসিংহ ৪ আসনের এমপি নির্বাচিত (??) হয়েছিলেন । এর আগে ‘হজ্ব অ্যাসিস্টেন্স ডেলিগেশনের’  নামে ধর্মমন্ত্রী  ১৭১ জনকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৭১ জনই ছিলেন সরকারী স্টাফ।  আরো ছিলেন মন্ত্রীর দুজন গানম্যান এবং একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী। এই ফ্রি হজ্ব লিস্টে  ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতা, ৩ জন এমপি, ১৫ জন বঙ্গভবনের কর্মচারী, ২৪ জন গণভবনের এবং প্রধানমন্ত্রীর অফিসের  কর্মচারীও পাওয়া গেছে। এখন প্রশ্ন একজন মন্ত্রী (ধর্মমন্ত্রী) কী করে তার নির্বাচনী এলাকায়  ৮০ জনকে পাবলিকের টাকায় হজ্বে পাঠাতে পারেন ? প্রধানমন্ত্রীও কি পারেন তার তাবৎ কর্মচারীদের এভাবে বিশেষ সুবিধাভোগী করে রাখতে?  দেশ সেবার জন্য যারা সরকারে থাকেন তারা যদি নিজেদের সেবায় ব্যস্ত থাকেন তাহলে জনগণকে দেখবে কে?  যারা এই ফ্রি হজ্ব  লিস্টে ছিলেন তাদের ৯৫% ই  শুধু ধনী নন বরং অসম্ভব রকমের ধনী। রাষ্ট্র কর্তৃক এদেরকে  বিশেষ সুবিধাভোগী বানানোর মানেই হচ্ছে সাধারণকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যে তোমাদের অবস্থান অনেক নীচে আর তোমাদের যদি ওপরে উঠতে হয় তাহলে শাসকের কাছের লোক হতে হবে। এখানে কী নৈতিকতার ছিটেফোঁটাও বর্তমান?

শাবানা এই মন্ত্রীকে ব্যবহার করেই তার ও তার স্বামীর রাজনৈতিক অভিলাষ বাস্তবায়িত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। আগে তিনি পরপুরুষকে আলিঙ্গন করে, কোমর বাকিয়ে হেলে দুলে নেচে আর গ্লিসারিনে চোখ অশ্রুসজল করে বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন তথা পাপ কামাতেন, এখন সেই পাপ মোচন করতে কালো বোরকায় আপাতমস্তক ঢেকে নামাজ-রোজা-হজ্ব করে বেড়াচ্ছেন, মসজিদ মাদ্রাসা বানাচ্ছেন আর রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিপুল অংকের টাকা ও ক্ষমতা হাসিল করার জন্য ক্রমশ সামনে পা বাড়াচ্ছেন। এটাকে অবশ্য তিনি ‘পাপ’ বলবেন না কারণ এখানে যে বিশাল স্বার্থ লুকিয়ে রয়েছে ! একদিকে আল্লাহ-বিল্লাহ করা, আরেকদিকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা – বাহ, কী চমৎকার !

কী দরকার দেশে এত মসজিদ মাদ্রাসা বানিয়ে যেখানে এই মসজিদ্গুলোর খুৎবা শুনে শুনে এদেশের তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছে, হাতে তুলে নিচ্ছে বিভিন্ন অস্ত্র – দাঁ, কুড়াল, চাপাতি কিংবা বোমা, হচ্ছে জিহাদী জঙ্গিবাদী, মানুষ মারছে নির্বিচারে আর অন্য দশজনের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা, ঘৃণা, হিংসা, হিংস্রতা, বর্বরতা ও নির্মমতা, নৃশংসতার বিষবাষ্প ! পত্রিকায় প্রায়ই নিউজ আসে – মাদ্রাসা মক্তব থেকে ধরা পড়লো নারী, শিশু ধর্ষক হুজুর কিংবা সমকামী হুজুর। এসব মাদ্রাসা মসজিদের মাধ্যমে দেশে তৈরি হচ্ছে অশিক্ষিত, অসুস্থ, রুগ্ন, পঙ্গু, দুর্বল, মস্তিষ্কবিকৃত, নারীবিদ্বেষী, পরজাত ও পরধর্মবিদ্বেষী অর্বাচীন একটি লোভী, স্বার্থপর ও উন্মাদ প্রজন্ম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অষ্টরম্ভা মাদ্রাসায় পড়া প্রজন্ম কী পারবে বাংলাদেশকে সুখী, সমৃদ্ধিশীল ও আত্মনির্ভরশীল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র হিশেবে গড়ে তুলতে ?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকার রুচি ও চিন্তাধারা যে এতটা নিম্নমানের, সেটি ভাবতে খুব কষ্ট হয়। জামাতের প্রতিষ্ঠাতাও আবুল আলা মওদূদী মুখে ইসলাম ইসলাম করতেন কিন্তু তার ছেলেমেয়েদের প্রত্যেককে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। শাবানাও সেই একই হিপোক্রিসি করছেন – নিজের ছেলেমেয়েদের প্রত্যেককে বিদেশী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে এখন বাংলাদেশী ছেলেমেয়দের মাদ্রাসায় ঢোকাতে চাচ্ছেন। এ যে কী নিদারুন হিপোক্রিসি ! শাবানা, আপনার কী এই ডাবল-স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বিচারিতামূলক অবস্থান নিতে বিন্দুমাত্র লজ্জা করে না ? আপনার স্বামীর আপন বড় ভাই এএসএইচকে সাদেকের স্ত্রী  ইসমত আরা সাদেক এই মুহূর্তে যশোর-৬ এর এমপি। নির্লজ্জের মত তাকে হটিয়ে আপনি কিভাবে আপনার স্বামীকে ইলেকশনে এমপি পদপ্রার্থী বানাতে চান যার দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা তথা ন্যূনতম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই ?

আমরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল একটি প্রজন্ম চাই। আর সেই প্রজন্ম সৃষ্টির পথে মাদ্রাসা মক্তবপ্রেমী এই শাবানারা অন্যতম প্রতিবন্ধক। জনপ্রিয় নায়িকা হলে চলবে না, আমাদের দরকার সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আর শাবানারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক নন বলেই বছরের পর বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়ে থাকেন আর এখন স্বার্থের জন্য বাংলাদেশে ফেরেন ! পরিশেষে, রাজনীতিতে শীতের স্বার্থান্বেষী অতিথি পাখীরা নয় বরং সত্যিকারের নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আসুন, সেটাই জাতি কামনা করে। সকলকে ধন্যবাদ।

writer
DR.Mushfique Imtiaz Chowdhury